করোনাকালে রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানায় চাকরি হারানো শ্রমিকদের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও জার্মান সরকার ১১৩ মিলিয়ন ইউরো (১ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা) প্রণোদনা ঘোষণা করে। ১০ লাখ শ্রমিকের জন্য জনপ্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে ৩ মাস এই টাকা দেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করেছিল শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। ১৫ ডিসম্বের কমিটির বৈঠকে ৭ হাজার ৩৯০ জন শ্রমিকের প্রাথমিক তালিকা করা হয়েছিল। কিন্তু টাকা দেওয়ার যোগ্য ১ হাজার ৭০০ জনের কিছু বেশি শ্রমিক খুঁজে পেয়েছে কমিটি। গতকাল সোমবার রাত সাড়ে ৯টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তালিকা চূড়ান্তের কাজ চলছিল। আজ মঙ্গলবার শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ানের উপস্থিতিতে প্রথম কিস্তির টাকা পরিশোধের কার্যক্রম শুরু হবে।
এ বিষয়ে শ্রম অধিদপ্তরের পরিচালক আবু আশরীফ মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা আমাদের প্রথম কিস্তি। মূলত ইইউর বাধ্যবাধকতা ছিল ডিসেম্বরের মধ্যে দুটি কিস্তি দিতে হবে। তাই আমরা আগামীকাল (আজ মঙ্গলবার) প্রথম কিস্তি দিতে যাচ্ছি। পরের কিস্তিতে শ্রমিকের সংখ্যা আরও বাড়বে।’
শ্রমিক সংখ্যা কম হওয়ার কারণ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যাচাই করতে গিয়ে তথ্যবিভ্রাটের কারণে অনেক নাম বাদ পড়েছে। দেখা গেছে, অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ভুল। অনেকের আইডি নম্বর ভুল। কারখানাগুলো তালিকা দেওয়ার সময় এসব ভুল করেছে। তবে সংশোধনের মাধ্যমে বাদ পড়াদের মধ্য থেকে অনেকেই আবার পরবর্তী কিস্তিতে যুক্ত হবেন।’
তবে এই তালিকার ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না খোদ শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ান। তিনি গত শনিবার সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, ‘করোনায় অনেক মানুষের চাকরি গেছে। কিন্তু মালিকদের গড়িমসির কারণে তালিকায় তাদের নাম দেওয়া সম্ভব হয়নি। যে কটি নাম এসেছে এটা তো বিশ^াসযোগ্য নয়। আমি কারখানার মালিকদের কাছে হাজিরা খাতা চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা সেটা দেননি। আমিও তাদের ছাড় দেব না। আমার কাছে গোয়েন্দা প্রতিবেদন আছে। এক লাখের বেশি চাকরি হারানোর তথ্য আমার কাছে আছে। আমি এদের প্রত্যেককে ধরব।’
বিশ^ব্যাপী করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর বাংলাদেশের রপ্তানিতে ধস নামে। ওই সময়ে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় কারখানাগুলো সাধারণ ছুটি বা লে-অফ ঘোষণা করা হয়। অনেক শ্রমিকের চাকরি চলে যায়। সরকারের সিদ্ধান্তে মালিকরা কারখানা বন্ধ থাকাকালে শ্রমিকদের ৬৫ শতাংশ হারে বেতন দেন। এরই মধ্যে গত জুনে সামাজিক সুরক্ষার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের পোশাক কারখানার শ্রমিকদের জন্য ১১৩ মিলিয়ন ইউরো প্রণোদনার ঘোষণা দেয় ইইউ ও জার্মানি।
এ বিষয়ে গত জুলাইয়ে সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) চিঠি দেয় ইইউ ও জার্মানি। কিন্তু কারখানার মালিকদের অনীহার পাশাপাশি অর্থ গ্রহণ ও বণ্টনের বিষয়ে কোনো রূপরেখা না থাকায় এত দিন এই টাকা আটকে ছিল। এভাবে কয়েক মাস চলার পর গত ১৮ নভেম্বর রপ্তানিমুখী পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকাশিল্পের কর্মহীন হয়ে পড়া ও দুস্থ শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নে একটি কমিটি গঠন করে সরকার। ১১ সদস্যের ওই কমিটিতে শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে সভাপতি করা হয়।
কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, মালিকদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই প্রণোদনার যোগ্যদের নির্বাচিত করা হয়েছে। প্রণোদনাযোগ্য বিবেচিত হওয়ার জন্য কিছু শর্ত নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শ্রমিককে অবশ্যই গত ফেব্রুয়ারিতে চাকরিরত অবস্থায় থাকতে হবে, করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর চাকরি হারিয়েছেন এমন শ্রমিক হতে হবে। এক কারখানা থেকে চাকরি হারিয়ে অন্য কারখানায় চাকরি করছেন এমন শ্রমিক প্রণোদনার জন্য বিবেচিত হবেন না। কারখানা মালিকদের পাঠানো তালিকার ভিত্তিতেই প্রণোদনা দেওয়া হবে।