৪২ নাগরিকের চিঠিকে সরকার বিরোধীদের সাধুবাদ

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ‘অনিয়ম-দুর্নীতি’ তুলে ধরে তার বিচারে রাষ্ট্রপতির কাছে ৪২ নাগরিকের চিঠি দেওয়াকে সাধুবাদ জানিয়েছে সরকারবিরোধী একাধিক রাজনৈতিক দল। গতকাল সোমবার এ নিয়ে কথা বলেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় পার্টি মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, বাম জোটের নেতৃবৃন্দ ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব। তারা বলেছেন, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর দিনের ভোট রাতে করা এবং সেই ভোটকে বৈধতা প্রদান করার মধ্য দিয়ে বর্তমান নির্বাচন কমিশনার একেএম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন ইসি তার সব ধরনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও বৈধতা হারিয়েছে। এই ইসি শুধু সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়নি। তারা নানা রকম অনিয়ম, দুর্নীতি, অসদাচরণ ও নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে।

এদিকে গতকাল রাজধানী ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘বিএনপি সর্বক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়ে এখন ইসিকে বিতর্কিত করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। নেতিবাচক রাজনীতির কারণে জনগণ বিএনপিকে বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে। ভোটের দিন জনরায় প্রত্যাখ্যান করা তাদের অপকৌশলের অংশ। নানান অনিয়ম ও অসদাচরণের অভিযোগ এনে মূলত বিএনপি নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়, তাদের এ চেষ্টা হালে পানি পাবে না।’

ইসির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া ৪২ বিশিষ্ট নাগরিককে চিঠির বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার শাহাদাত হোসেন চৌধুরী গত রবিবার বলেছেন, এটা হয়তো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এগুলো কোনোটার ভিত্তি আছে বলে আমি মনে করি না। এরকম একটা বিষয় উত্থাপন করা সুধীজনদের জন্য বিবেচনাপ্রসূত নয়।

ইসির বিরুদ্ধে ৪২ নাগরিক রাষ্ট্রপতির কাছে যে চিঠি দিয়েছেন তাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ‘আমরা ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিককে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই যে, এতদিন পর তারা জনগণের যে মূল কথা, সেটা নিয়ে এসেছেন, কথা বলেছেন। তাদের যে দায়িত্ব আছে সেই দায়িত্ব তারা পালন করেছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, এটাকে সব বুদ্ধিজীবী যারা আছেন তাদের সমর্থন করা উচিত। ইটস নট ফর বিএনপি, নট ফর পলিটিক্যাল পার্টি। এটা দেশের জন্য, জাতির জন্য প্রয়োজন।’

ইসির গুরুতর অসদাচরণ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতিকে ৪২ বিশিষ্ট নাগরিকের চিঠি দেওয়ার প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার শাহাদাত হোসেন ভিত্তিহীন বলেছেন এ বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘চোর কি কখনো স্বীকার করে যে আমি চুরি করেছি।’

‘৪২ নাগরিকের দেওয়া বিবৃতির খসড়া বিএনপির তৈরি করা তথ্যমন্ত্রীর এ বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, ‘যারা বিবৃতি দিয়েছেন, তারা একজনও বিএনপি করেন না। বরং বিভিন্ন সময়ে তারা বিএনপির সমালোচনা করেছেন। প্রকৃত সত্য যখনই সামনে আসে এবং জনগণ যখন সত্য কথা বলতে চায়, নাগরিকরা সত্য কথা বলতে চায়, তখনই আপনারা তাদের বিএনপি বানিয়ে ফেলেন। এটা হচ্ছে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার আরেক জঘন্যতম কৌশল।’

গত ১৪ ডিসেম্বর ৪২ জন নাগরিকের পক্ষে ওই চিঠি পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহদীন মালিক, যিনি নিজে একসময় ইসির আইনজীবী ছিলেন। চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সাবেক উপদেষ্টা ও সচিব আকবর আলি খান, সাবেক মহাহিসাব-নিরীক্ষক এম হাফিজউদ্দিন খান, মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল, শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধূরী।

নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষের আস্থা নেই জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু : গতকাল জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যানের বনানী কার্যালয়ে পার্টি চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদেরের সভাপতিত্বে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়ামের এক সভা হয়। সভা শেষে জাতীয় পার্টি মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, ‘দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ও ইসির ওপর মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। এজন্য ইসিসহ সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। জাতীয় পার্টি চায় ইসি যেন প্রতিটি নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষতা, গ্রহণযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক করতে পারে। স্বাধীন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যেন ইসি প্রভাব ও হস্তক্ষেপমুক্তভাবে কাজ করতে পারে। কারণ জাতীয় পার্টি কোনো প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন চায় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ধানমন্ডি এলাকায় উপনির্বাচনে মাত্র শতকরা ২ ভাগ ভোট পড়েছে এবং ডেমরা এলাকায় ভোট পড়েছে শতকরা ১০ ভাগ। অথচ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দাবি করে তাদের কারও ৩৫ আবার কারও ৪০ ভাগ ভোট রয়েছে। এতে প্রমাণ হয় ইসি ও নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নেই। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন ছাড়া স্বচ্ছ নির্বাচন সম্ভব নয়।

৪২ বিশিষ্ট নাগরিকের উদ্যোগে একাত্মতা আ স ম আবদুর রবের : গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ইসির বিচার দাবিতে ৪২ বিশিষ্ট নাগরিকের উদ্যোগে একাত্মতা প্রকাশ করে আ স ম আবদুর রব বলেছেন, বর্তমান ইসি জনগণের ভোটাধিকার প্রশ্নে সাংবিধানিক দায়িত্ব ও নৈতিক কর্তব্য পালন না করে ‘সংবিধান লঙ্ঘন’ করার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে। ইসি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্নকে ‘বধ্যভূমি’তে পরিণত করেছে, নির্বাচনী ব্যবস্থাকে বড় ধরনের কৌতুকে রূপান্তর করেছে।

তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অর্জন। এগুলোকে কোনোভাবেই ধ্বংস করা যায় না। এ ইসি রক্তরঞ্জিত বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না।’ রব বলেন, ‘একটি স্বাধীন দেশের ইসি সাংবিধানিক দায়িত্ব লঙ্ঘন করে গুরুতর অসদাচরণ, অনিয়মসহ আর্থিক দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়লে তদন্তের মাধমে কমিশনকে অপসারণ করা রাষ্ট্রের নৈতিক কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান যদি সংবিধান লঙ্ঘন করার ‘ধৃষ্টতা’ প্রদর্শন করতে থাকে তাহলে প্রজাতন্ত্র বিলুপ্ত হওয়ার পথে ধাবিত হবে।’

তিনি বলেন, ‘ইসি প্রশ্নে দেশের ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক রাষ্ট্রপতির কাছে যে চিঠি পাঠিয়েছেন তা সমগ্র জাতির “বিবেকের প্রতিনিধিত্ব” নিশ্চিত করেছে। বিবেক বিক্রির প্রতিযোগিতার মধ্যেও ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক বিবেকের যে বার্তা নিয়ে জাতির সামনে হাজির হয়েছেন তা গণতান্ত্রিক ও শাসনতান্ত্রিক সংকট নিরসনে আলোকবর্তিকা হিসেবে ভূমিকা রাখবে। সরকার ও ইসির যৌথ আক্রমণে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি ধ্বংসের শেষ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। এখনো যদি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা না যায় তাহলে বড় ধরনের প্রলয়ংকরী ঘটনা আমাদের অস্তিত্বকেই সংকটাপন্ন করে তুলবে।’

রব বলেন, ‘আমরা বহুদিন ধরেই সাংবিধানিক জটিলতার প্রশ্নে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সাত সদস্যবিশিষ্ট “সাংবিধানিক আদালত” গঠনের দাবি উত্থাপন করে আসছি। এ “সাংবিধানিক আদালত” সাংবিধানিক বিষয়সহ নির্বাচন সংক্রান্ত প্রশ্নে সর্বোচ্চ স্থায়ী সংস্থা হিসেবে ভূমিকা রাখবে।’

নির্বাচন কমিশনকে বরখাস্ত করার আহ্বান বাম গণতান্ত্রিক জোটের : বাম জোটের কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিবৃতি অনিয়ম, দুর্নীতি, নিয়োগবাণিজ্য ও অসদাচরণের অপরাধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে ইসিকে বরখাস্ত করার আহ্বান জানিয়েছে।

বিবৃতিতে নেতারা বলেন, ‘২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর দিনের ভোট রাতে করা এবং সেই ভোটকে বৈধতা প্রদান করার মধ্য দিয়ে বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন ইসি তার সব ধরনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও বৈধতা হারিয়েছে।’ তারা আরও বলেন, ‘এ ইসি শুধু তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়নি। তারা নানারকম অনিয়ম, দুর্নীতি, অসদাচরণ ও নিয়োগবাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে যা ইতিমধ্যে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে।’

বিবৃতিতে বলা হয়, এ কমিশন নৈতিকভাবে স্খলিত। এরা ইতিমধ্যে অবাধ নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এরা ক্ষমতাসীনদের হয়ে ভোট ডাকাতির নির্বাচন আয়োজন করেছে। এ  নির্বাচন কমিশনের আর কোনো নির্বাচন পরিচালনার বৈধ নৈতিক কর্তৃত্ব অবশিষ্ট নেই। তাই সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে অবিলম্বে বর্তমান ইসিকে বরখাস্ত করার জন্য রাষ্ট্রপতির প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

বিবৃতিদাতারা হলেন বাম জোটের সমন্বয়ক আবদুল্লাহ কাফী রতন, সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহ আলম, বাসদ সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বাসদের (মার্কসবাদী) সাধারণ সম্পাদক মোবিনুল হায়দার চৌধুরী, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, ইউসিএলবির সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন নান্নু, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, ওয়ার্কার্স পার্টির (মার্কসবাদী) সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সভাপতি হামিদুল হক।