১৯৮৩ সালের ১১ জানুয়ারি ছাত্র বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেওয়ার অপরাধে সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী ১৩ জানুয়ারি ইস্কাটন থেকে অস্ত্রের মুখে চোখ-হাত বেঁধে আমাকে তুলে নিয়ে যায়। ২১ দিন গুম করে আমার ওপর চালায় নির্মম নির্যাতন। সিরাজুল আলম খানের বাসা থেকে ফেরার পথে আমাকে তুলে নেওয়ার সময় সঙ্গে ছিলেন বন্ধু সলিমুল্লাহ খান, নাজমুল হক প্রধান এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জাসদ ছাত্রলীগের নেতা মনিরুজ্জামান। সেই দিনই ঢাকা ত্যাগ করে যার যার গ্রামের বাড়ি চলে যেতে বাধ্য হয় তারা।
সামরিক কয়েদ থেকে মুক্তির পরপরই সারাদেশের কর্মীদের চাওয়ায়, মাসব্যাপী সাংগঠনিক সফরে যেতে হয় আমাকে। প্রথমে আমি পঞ্চগড়ে যাই, প্রধানকে গ্রামের বাড়ি থেকে নিয়ে সফর শুরু করি। এরপর যাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা শাহজাহান সিরাজের দিনাজপুরের গ্রামের বাড়ি। আমরা যখন তার বাড়িতে পৌঁছাই, তখন বেলা প্রায় দুপুর। সে তখন বাড়িতে ছিল না। গ্রামের ভেতরেই কোথায় গেছে। তাকে খুঁজে আনতে তার ছোট ভাইকে পাঠাই, নিজেদের পরিচয় না দিয়েই। লুঙ্গিপরা, খালি গা, হালকা পাতলা শাহজাহান সিরাজ কিছুক্ষণের মধ্যে বাড়িতে ফিরে এসে আমাদের দেখে হতবাক! বাঁশের কঞ্চির মতন চিকন তার ওপর খালি গা, লুঙ্গিপরা শাহজাহান লজ্জায় বেঁকে যাচ্ছিল। অনেক খুশি হয়েছিল আমাদের পেয়ে। তাড়াতাড়ি বাড়ির ভেতর গিয়ে সার্ট পরে কাঠের চেয়ার এনে বসতে দিল। বাবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। আমরা আমাদের আসার উদ্দেশ্য এবং আজই আমাদের সঙ্গে রাজশাহী যাওয়ার কথা জানালাম। সানন্দে রাজি হলো সে। কিছুক্ষণের মধ্যেই রেডি হয়ে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল আমাদের। তার মা পরম যত্নে আমাদের দুপুরের খাবার খাওয়ালেন।
আজও মনে আছে, সদ্য জবাই করা মুরগির মাংস, লাউশাক, ডিম ভাজি আর আমার অতি প্রিয় মাশকলাইয়ের ডাল দিয়ে আমি, প্রধান আর শাহজাহান চৌকির ওপর বসে পরম তৃপ্তির সাথে খেয়েছিলাম। খাওয়া-দাওয়া শেষ করেই আমরা রাজশাহীর উদ্দেশ্য রওনা হই।
১৯৮০ সালে জাসদ ভেঙে বাসদ হলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনিরুজ্জামান, আনিসুর রহমান কামাল, আক্তারুজ্জামান ছাড়া আজিজ সরকারসহ সব নেতা বাসদে যোগ দেয়। এতে জাসদ ছাত্রলীগ সেখানে দুর্বল হয়ে পড়ে।
শাহজাহান সিরাজকে নিয়ে আমরা রাজশাহী পৌঁছাই রাতে। পরদিন শাহজাহান সিরাজ- আরিফ, রুপম, ছদরুল, সাফি, এজাজ, ওহিদুলসহ আরো কয়েকজনকে নিয়ে সাবাস বাংলাদেশের সামনের মাঠে ছোট্ট একটি কর্মী সভার আয়োজন করে।
অল্পদিনের মধ্যেই শাহজাহান সিরাজের নেতৃত্বে জাসদ ছাত্রলীগ আবার ঘুরে দাঁড়ায় এবং ক্যাম্পাসে শক্তিশালী ছাত্র সংগঠন হিসেবে আপসহীন নেতৃত্বের প্রধান ভূমিকায় অবর্তীর্ণ হয়। সেই থেকে শাহজাহান সিরাজের সঙ্গে আন্তরিকতা ও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। চিঠি-পত্রেরও যোগাযোগ হতো। তার দু'একখানা চিঠি এখনো রয়েছে আমার কাছে। ঢাকায় এলে ৩২৪ মোহসীন হলে আমার রুমে উঠত শাহজাহান। 'মোহনদা' বলে কী মধুর আন্তরিকতায় ডাকতো আমাকে।
এর বছর খানেক পর, ৮৪ সালের ২২ ডিসেম্বর শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের ধর্মঘটের পিকেটিংয়ের পর ডা. মুশতাক হোসেন, শফি আহমেদসহ আমরা কয়েকজন মোহসীন হলে আসি। মুশতাক হোসেন মোহসীন হলের কয়েন টেলিফোন বক্স থেকে শিরিন আখতারকে ফোন করলেন। পাশে আমরা কয়েকজন দাঁড়িয়ে। কথা বলতে বলতে হঠাৎ মুশতাক হোসেন ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন, তার চোখ গড়িয়ে অশ্রু ঝরছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কী হয়েছে মুশতাক ভাই? উনি কথা বলতে পারছিলেন না। আমি তার হাত থেকে রিসিভার নিয়ে হ্যালো, শিরিন আপা, আমি মোহন, কী হয়েছে? বাকরুদ্ধ কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বললেন, 'রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিডিআরের গুলিতে শাহজাহান সিরাজ মারা গেছে।' আমিও আর কথা বলতে পারলাম না। আমরা সবাই শফির রুমে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লাম। খবর পেয়ে আরো অনেকে শফির রুমে ছুটে এলো। আমরা পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করে বেরিয়ে পড়লাম।
সন্ধ্যায় আমি হলে না ফিরে শেখ সাহেব বাজারে বন্ধু আমিনের বাসায় সেলটারিংয়ে চলে গেলাম। যাবার আগে মুশতাক হোসেন বললেন, 'একটা স্লোগান ঠিক করো, আগামীকাল ব্যানার লেখার জন্য।' যতদূর মনে পড়ে সে রাতে সামরিকজান্তা কারফিউ জারি করেছিল।
সহযোদ্ধার বুকের তাজা রক্তঢালা পাহাড়সম প্রগাঢ় অসীম বেদনাভারাক্রান্ত সন্ধ্যার রক্তাক্ত কুয়াশা ভেদ করে একটি স্নিগ্ধ সরল হাসিমাখা শ্যামল মুখ বারবার চোখে ভেসে উঠছিল আমার। কান্নায় ঝাপসা হয়ে আসছিল চোখ। কংক্রিটে আছড়ে ফেলা ঝাড়বাতির মতন টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিল হৃদয়। ক্রোধে, ঘৃণায়, প্রচণ্ড আক্রোশে অবৈধ জান্তা সরকারের মর্মমূলে দুনিয়া কাঁপানো বিস্ফোরণে ফেটে পড়তে ইচ্ছা করছিল, শাহজাহান সিরাজের হত্যার প্রতিশোধ নিতে। ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসা শেখ সাহেব বাজারের সুনসান গলিতে হাঁটতে হাঁটতে, বিড়বিড় করতে করতে কষ্ট-কান্না-ক্রোধ-রক্ত-বারুদে মানসক্যানভাসে অংকিত হয়ে গেল- 'শোক নয় প্রতিশোধ নেব আজ/ ঘুমাও শান্তিতে শাহজাহান সিরাজ।'
এই পঙক্তি দিয়েই ব্যাকড্রপ করে টিএসসির সোপার্জিত স্বাধীনতার সামনে শাহজাহান সিরাজের স্মরণ সভা হয়।
সেদিন সারারাত ঘুমাতে পারিনি আমি। ভোর পর্যন্ত জেগে শাহজাহান সিরাজকে নিয়ে লেখা কবিতা- 'আর হলো না বাড়ি ফেরা'। ২৯ ডিসেম্বরের স্মরণ সভায় কবিতাটি পাঠ করি। ওই নামেই ২১ ফেব্রুয়ারির বইমেলায় প্রকাশিত হয় আমার কবিতার বই। হু হু করে বিক্রি হয়ে যায় শাহজাহান সিরাজকে উৎসর্গিত কাব্যগ্রন্থটি।
ফিরে এলো সেই ঐতিহাসিক ২২ ডিসেম্বর। শাহজাহান সিরাজসহ অসংখ্য শহীদের জীবন উৎসর্গের ৩৬ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু যে উদ্দেশে আমরা জীবন বাজি রেখে লড়াই-সংগ্রাম-কারাবরণ- নির্যাতন সহ্য করেছিলাম, বারবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলাম, আর শাহজাহান সিরাজেরা জীবন বলি দিয়েছেন, সেই শোষণ- নিপীড়নমুক্ত, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, বাংলাদেশ কেন কায়েম হলো না আজও?
কাউকে না কাউকে তো জবাব দিতেই হবে। ইতিহাস বড় নির্মোহ। কাউকেই সে ক্ষমা করে না। সে যত শক্তিশালী, দাম্ভিক, অহংকারীই হোক না কেন। চেঙ্গিস, হালাকু, হিটলার, মুসোলিনী, জার, সালাজার, বাতিস্তা, ফ্রাংক, পলপট, ফ্রাঁসোয়া, পিনাশো, আইয়ু্ব, ইয়াহিয়া, এরশাদ কেউই জোর করে আজীবন ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে পারেনি। কারণ ক্ষমতা সব সময়ই পরিবর্তনশীল।
ক্ষমতা, কারাগার আর ফাঁসির মঞ্চের দূরত্ব মুহূর্তের মাত্র! অতএব আজকের পৃথিবীর সমস্ত অবৈধ ক্ষমতাদখলকারী, স্বৈরশাসক, খুনি, গণতন্ত্র হন্তারক প্রস্তুত থাকো, তোমাদের পূর্বসূরিদের অভাবনীয় ভয়াবহ পরিণতির জন্য।