‘জোরে শ্বাস নাও’ ছিল কবি মনজুরে মওলার শেষ কাব্যগ্রন্থ। গ্রন্থটি মাত্র দু-মাস আগেই অর্থাৎ প্যানডেমিক করোনাকালেই প্রকাশিত। সদ্য তিনি প্রয়াত হলেন আশি বছর পেরিয়ে। করোনার থাবায় পড়ে আরও অনেকের মতো মনজুরে মওলাও চলে গেলেন। কর্মময় বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ছিলেন মনজুরে মওলা। সেই প্রাচীন প্রবাদের কথাই আজ মনে পড়ছে সমাজ থেকে যখন এখন বয়স্ক নাগরিক চলে যান, তখন যেন একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি পুড়ে গেল। কবি-অনুবাদক মনজুরে মওলার প্রয়াণেও সে কথা প্রণিধানযোগ্য। আমলাতন্ত্রের চাকরির বাইরে তিনি কবি, অনুবাদক। মানুষ হিসেবে অসাধারণ রসবোধের ব্যক্তিত্ব তার। আমাদের মনে থাকবে তার দীর্ঘ জীবনের ইতিবৃত্ত।
একসময় মনজুরে মওলা সম্পাদনা করতেন ‘শ্রাবণ’ নামের উঁচু মানের সাহিত্যপত্র; যেন সে সম্পাদনা-কৃতিত্বেরই উত্তরকালীন নিদর্শন ধরা রইল তাঁর সম্পাদিত পঁচিশ বছরের প্রেমের কবিতা (মূর্ধন্য, ২০১৭) এবং বাংলাদেশের কবিতা ১৯৪৭-২০১৭-তে (মূর্ধন্য, ২০১৮)। একসময় গোয়েন্দা-গল্পের ইতিহাস লেখায়ও মনযোগ দিয়েছিলেন মনজুরে মওলা। গত ১ অক্টোবর ৮০তম জন্মবার্ষিকী ছিল কীর্তিমান এই ব্যক্তির। বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন মনজুরে মওলা। করোনা সন্দেহে নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট পজিটিভ আসায় গত ৫ ডিসেম্বর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। সেখানেই চিকিৎসা চলছিল।
মনজুরে মওলা কর্মজীবনে সচিব ছিলেন। কখনো ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক থাকাকালীন তার নির্দেশনায় প্রকাশিত হয় সুদৃশ্য ‘ভাষা শহীদ গ্রন্থমালা’। কী অসাধারণ কাজ। ‘একুশ আমাদের পরিচয়’ প্রত্যয়ে সে সময়েই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় অমর একুশে গ্রন্থমেলা, আজ যা বিশ্বের দীর্ঘ সময়ব্যাপী চলা বই উৎসব। ঐতিহাসিক বর্ধমান ভবন সংস্কার, প্রথম জাতীয় ফোকলোর কর্মশালা আয়োজন, আরজ আলী মাতুব্বর বা খোদা বক্স সাঁইয়ের মতো লোকমনীষাকে ফেলোশিপ প্রদান, ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’, ‘ডেভিডসনের চিকিৎসাবিজ্ঞান’ কিংবা আনিসুজ্জামানের ‘পুরোনো বাংলা গদ্য’-এর মতো বই প্রকাশে উদ্যোগী হয়েছেন তিনি।
বাংলা একাডেমিতে তার অসামান্য কীর্তি ‘ভাষাশহীদ গ্রন্থমালা’র ১০১টি বই। এমন অনেক বই এই সিরিজে প্রকাশিত হয়েছে, যা বিষয় হিসেবে ছিল নতুন। এমন অনেকে এই সিরিজে লিখেছেন, যারা পরে সে বিষয়ে অর্জন করেছেন বিশেষ পরিচিতি।
প্রশাসক-গবেষক-সম্পাদক-অনুবাদক-কবি মনজুরে মওলা লিখেছেন দুটো কাব্যনাট্য-‘আমি নই’ ও ‘জালিয়ানওয়ালাবাগ’। রবীন্দ্র-বিষয়ে তার অসাধারণ এক কীর্তি গ্রন্থমালা সম্পাদক হিসেবে তারই পরিকল্পনায় রবীন্দ্রসার্ধশতবর্ষে রবীন্দ্রবিষয়ক ১৫১টি বই প্রকাশ। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘দশমী’ বইটিকে কেন্দ্র করে ‘নষ্ট নীড়’ নামে বই লিখেছেন মনজুরে মওলা। অনুবাদ করেছেন ইবসেনের নাটক ‘ব্র্যান্ড’, এলিয়টের ‘সুইনি’ ও ‘দ্য রক’, ‘গির্জায় খুন’। এলিয়ট অনুবাদের পাশাপাশি তার ব্যাখ্যাভাষ্যও করেছেন সমান গুরুত্বে। একাডেমির কর্মকর্তা/কর্মচারীদের অবসরভাতা নিশ্চিতকরণ-সহ নানা যুগান্তকারী কর্মসূচির বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলা একাডেমির ইতিহাসে তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন। তিনি সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ও বাংলা একাডেমি রবীন্দ্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
একাডেমির প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশনার বাইরেও শ্রাবণ নামে একটি ত্রৈমাসিক সাহিত্য জার্নাল সম্পাদনা করেছেন তিনি। সম্পাদনা করেছেন বাংলা কবিতার দু-দুটি আকর সংকলন। মূর্ধন্য পাবলিকেশন্সের ব্যানারে মনজুরে মওলা আরও একটি বৃহৎ কাজের নেতৃত্ব দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতজন্মবার্ষিকী উপলক্ষে মূর্ধন্য থেকে প্রকাশিত হয়েছে একশ একান্নটি বই। একশ একান্নজন লেখক। বিষয় রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের একশ একান্নটি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। তিনি একদা ছিলেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিরও মহাপরিচালক। এক দিন কথায় কথায় বললেন, ‘তখনকার প্রেসিডেন্ট এক দিন আমাকে তার অফিসে ডাকলেন, আমি গেলাম। আমাকে বললেন, দায়িত্ব নিতে। নিয়েছি। আমলার কাজ কামলা খাটা। আর কী করতে পারি আমি?’
খুব আড্ডাবাজ ছিলেন কবি মনজুরে মওলা। বয়সের শেষের দিনগুলোতে বাসায় তাকে চলাফেরা করতে হতো হুইলচেয়ারে। আড্ডা চলছে। মনজুরে মওলাকে হুইলচেয়ার থেকে তার জন্য নির্ধারিত চেয়ারে বসানো হচ্ছে। ঠিক সে অবস্থায় আমাদের কথা চলছে। তিনি বলছেন ‘জানো তো, শহীদ, শহীদুল জহির আমার মিনিস্ট্রিতে ছিল। যার গল্প নিয়ে তুমি সিনেমা বানাচ্ছো। আমাকে একটু অভিনয়ের সুযোগ দেবে?’
বললাম, বৃদ্ধ মহল্লাবাসী ছাড়া তো আপনার জন্য চরিত্র নেই। মনজুরে মওলা হা হা করে হেসে ঘর ভরে তুললেন শব্দে। তারপর বললেন, ‘কাঁটা সিনেমায় টারজান চরিত্র নেই? আমি টারজান চরিত্রে অভিনয় করব।’ যে সময় তিনি হুইলচেয়ারে, সে সময় তিনি টারজান চরিত্র করতে চাচ্ছেন। জীবনের এই এক অপূর্ণতা, যা দরকার, তা যেন কাছে নেই। যাকে খুঁজছি, তার দেখা পাচ্ছি না। যেমন, মনজুরে মওলার সঙ্গে এখন আমার দেখা করতে ইচ্ছে করছে, খুব আড্ডা দিতে ইচ্ছে করছে। তার রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে, এলিয়ট ও শেকসপিয়ার বিষয়ে বোঝাপড়া শুনতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু তা আর হবে না। তিনি চলে গেছেন। তার কবিতা, অনুবাদ, স্বজনদের কাছে একটু-আধটু স্মৃতিচিহ্ন রয়ে গেছে। অসীম শ্রদ্ধা আপনাকে, কবি মনজুরে মওলা।
লেখক : কবি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা