পর্যাপ্ত আইসিইউ স্থাপনের বিকল্প নেই

করোনার প্রথম ঢেউয়ের ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই দ্বিতীয় ঢেউয়ের ছোবলে বিশ্বের অনেক দেশই এখন বিপর্যস্ত। এই ঢেউ মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলো। মহামারীর ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, উনিশ শতকের গোড়ার দিকে স্প্যানিশ ফ্লুর মোট তিনটি ঢেউ বা ওয়েভ দেখা গিয়েছিল। এর মধ্যে দ্বিতীয় ঢেউ ছিল প্রথমটির তুলনায় মারাত্মক। তাই করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউকে কোনোভাবে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। পাশাপাশি, বাংলাদেশেও দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে এবং প্রথম ঢেউয়ের তুলনায় এবারের করোনাভাইরাস আরও শক্তিশালী। এক মাস ধরে দেশে করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। এটাকেই স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন দ্বিতীয় ঢেউ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক মাস ধরে প্রতিদিন গড়ে ৩১ জনের বেশি মানুষ করোনায় মারা যাচ্ছে। অথচ এর আগের এক মাসে দৈনিক মৃত্যু ছিল ২০ জনের নিচে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, করোনা আক্রান্তদের জন্য সময়মতো আইসিইউ সাপোর্ট এবং পর্যাপ্ত অক্সিজেন সাপোর্ট এখনো নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এক মাসে করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ষাটোর্ধ্ব প্রায় ৬৫ শতাংশ। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, করোনা আক্রান্তের পর সময়মতো আইসিইউ সাপোর্ট এবং পর্যাপ্ত অক্সিজেন সাপোর্ট না পাওয়ার কারণেই বেশিরভাগ রোগী মারা গেছে। অথচ প্রতিদিন সরকারের স্বাস্থ্য বুলেটিনে বলা হচ্ছে, রোগীর তুলনায় আইসিইউ বেড ফাঁকা রয়েছে। কিন্তু রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে অনুসন্ধান করে জানা গেছে, প্রতিদিন অনেক রোগী আইসিইউ না পেয়ে ফেরত যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, করোনা রোগীদের শতকরা ৮০ ভাগের মধ্যে মৃদু লক্ষণ দেখা দেয়। তাদের হাসপাতালে যেতে হয় না। বাকি ২০ শতাংশের মধ্যে ১৫ শতাংশের উপসর্গ তীব্র হয়, যাদের হাসপাতালে যেতে হয়। বাকি ৫ শতাংশের অবস্থা থাকে বেশি জটিল, তাদের জন্য আইসিইউ বেডের পাশাপাশি দরকার হয় ভেন্টিলেটর।

জানা গেছে, সারা দেশে করোনা রোগীদের জন্য আইসিইউ বেড আছে ৫৭০টি।  স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমারজেন্সি অ্যান্ড অপারেশন সেন্টার ও নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সূত্রে জানা যায়, এক সপ্তাহ আগেও রাজধানীতে নির্ধারিত নয়টি সরকারি হাসপাতালের মধ্যে কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সরকারি কর্মচারী হাসপাতালে কোনো আইসিইউ খালি ছিল না। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২৪টির মধ্যে ২২টি, রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ১৫টির মধ্যে ১১টি ও শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে ১৬টির মধ্যে নয়টিতে করোনার জটিল রোগীরা ভর্তি রয়েছেন।  স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬টি আইসিইউর সবগুলো পূর্ণ ছিল। সরকারি নয়টি হাসপাতালের মধ্যে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য কোনো আইসিইউ নেই। এদিকে নয়টি বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে ইবনে সিনা ও বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে কোনো আইসিইউ খালি নেই।  অন্যান্য হাসপাতালের মধ্যে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০টির মধ্যে নয়টি, আসগর আলী হাসপাতালে ৩১টির মধ্যে ২৬টি, স্কয়ার হাসপাতালে ২৫টির মধ্যে ১৮টি, ইউনাইটেড হাসপাতালে ২২টির মধ্যে ১৪টি, এভার কেয়ার হাসপাতালে ২০টির মধ্যে ১৯টি, ইমপালস হাসপাতালে ৫৬টির মধ্যে ২১টি, এ এম জেড হাসপাতালে ২১টির মধ্যে ১৯টিতে জটিল রোগীরা ভর্তি রয়েছেন।

এমনিতেই বাংলাদেশে বহুদিন থেকেই আইসিইউ শয্যার মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে।  চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের এক গবেষণার বরাত দিয়ে সংবাদ মাধ্যম বিবিসি জানায়, জনসংখ্যার অনুপাতে আইসিইউ শয্যার সংখ্যা দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম বাংলাদেশে। নেপালে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য আইসিইউ আছে ২.৮টি, ভারত ও শ্রীলঙ্কায় ২.৩টি, পাকিস্তানে ১.৫টি, মিয়ানমারে ১.১টি আর বাংলাদেশে আছে দশমিক ৭টি। অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য একটি আইসিইউ-ও নেই।  আবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেরই তথ্য বলছে, শতকরা দেশের ৯০ ভাগ আইসিইউ-ই আসলে যথোপযুক্ত মানের যন্ত্রপাতি ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন নয়।  এছাড়া আইসিইউ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক মেডিকেল টেকনিশিয়ান বা দক্ষ জনবলেরও অভাব রয়েছে হাসপাতালগুলোতে। এমতাবস্থায় বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনার মতো মারাত্মক পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অক্সিজেন সিলিন্ডার ও মাঝারি ফ্লো ও জেলায় হাইফ্লো নেজাল ক্যানোলার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা এবং দেশে প্রথম ঢেউ পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, রোগীদের মধ্যে শতকরা ১০ ভাগের ভেন্টিলেটর বা আইসিইউ সেবার প্রয়োজন হয়। তাই ক্রিটিক্যাল রোগীদের শুরুতেই বিভিন্ন পর্যায়ে অক্সিজেন সেবা নিশ্চিত করতে পারলে আইসিইউর সংকট মেটানো যাবে। এই বাস্তবতায় করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা এবং হাসপাতাল সেবা কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন বিবেচনায় সরকারের উচিত হবে দ্রুততম সময়ে সব জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক আইসিইউ স্থাপনের পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।