প্রথম ধাপের পৌরসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী মেয়র প্রার্থীদের অধিকাংশই ব্যবসায়ী। শিক্ষাগত যোগ্যতায় ‘স্বশিক্ষিত’ ও ‘সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন’ থেকে পিএইচডি ডিগ্রিধারী প্রার্থীও রয়েছেন। বিএসএসি পাস করা এক স্বতন্ত্র প্রার্থী পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন কৃষিকাজ, গোসেবা ও ভক্তসেবা। এছাড়া দলিল লেখক থেকে শুরু করে রয়েছেন শিক্ষক প্রার্থীও। তবে মামলার সংখ্যা বিবেচনায় এগিয়ে বিএনপির প্রার্থীরা। আওয়ামী লীগের দুয়েকজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে আছে মামলা। প্রার্থীদের অনেকেই অঢেল সম্পদের মালিক। তবে এ ক্ষেত্রে যে প্রবণতা লক্ষ করা গেছে তা হলো নিজ নামের চেয়ে স্ত্রী-সন্তানের নামেই বেশি সম্পদ দেখিয়েছেন তারা। নির্বাচন কমিশনে (ইসি) মেয়র প্রার্থীদের জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
২৫ পৌরসভায় ভোট হবে ২৮ ডিসেম্বর। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ বিভিন্ন দল এবং স্বতন্ত্র মিলিয়ে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৯৩ জন। কুষ্টিয়ার খোকসা পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী মো. তারিকুল ইসলাম এমএ পাস। পেশায় শিক্ষক হলেও তার রয়েছে পাটের ব্যবসা। কৃষি ও ব্যবসা থেকে তার বার্ষিক আয় আড়াই লাখ টাকা। শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে দেখালেও হলফনামায় চাকরি থেকে কোনো আয় দেখাননি তিনি। তবে তার ওপর নির্ভরশীলদের চাকরি থেকে আয় দেখিয়েছেন ২ লাখ ২০ হাজার টাকা। আর্থিকপ্রতিষ্ঠানে স্ত্রীর নামে জমা রয়েছে ৩৬ লাখ টাকা। স্ত্রীর রয়েছে ৬ ভরি স্বর্ণালংকার। তারিকুলের নামে রয়েছে ডিপিএস। টিনশেড বাড়ি রয়েছে একটি; কৃষিজমি ৫৫ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং অকৃষি জমি ৮ শতাংশ। সিসি ঋণ রয়েছে ২০ লাখ টাকার।
এ পৌরসভায় বিএনপির মেয়র প্রার্থী রাজু আহম্মেদ বিএ পাস। পেশায় ব্যবসায়ী। তার নামে মামলা রয়েছে আটটি। আগে ছয়টি মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। ব্যবসা থেকে তার বার্ষিক আয় ২ লাখ টাকা।
চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড পৌরসভায় নৌকা মার্কার প্রার্থী বদিউল আলম এইচএসসি পাস। তার পেশা ব্যবসা। তিনি হলফনামায় বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ১০ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪৪ টাকা। এর মধ্যে কৃষি খাতে আয় ৩ হাজার টাকা, ব্যবসা থেকে ৫ লাখ ১০ হাজার ৪৩০ টাকা, মেয়র পদের সম্মানী ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা ও ব্যাংক সুদ ৪১ হাজার ১৪ টাকা রয়েছে। তার সম্পদের মধ্যে নগদ ২ লাখ ৯৫ হাজার ৮০৩ টাকা, ব্যাংকে জমা ৪ লাখ ৭ হাজার ২৯৭ টাকা, বিভিন্ন মেয়াদে জমা ৮ লাখ ৪৬ হাজার ৯০০ টাকা ও অলংকার রয়েছে দেড় লাখ টাকা মূল্যমানের। ছেলের কাছ থেকে রেমিট্যান্স হিসেবে পেয়েছেন ৯ লাখ ৯২ হাজার ১৬১ টাকা। এ পৌরসভায় বিএনপির প্রার্থী মো. আবুল মুনছুর। তিনি নিজেকে ‘স্বশিক্ষিত’ দাবি করেছেন।
বরিশালের বাকেরগঞ্জ পৌরসভার আওয়ামী লীগের প্রার্থী লোকমান হোসেন ডাকুয়া। মৎস্য চাষ থেকে শুরু করে তার রয়েছে ঠিকাদারি ব্যবসা। এইচএসসি পাস এ প্রার্থী কৃষি খাত থেকে আয় দেখিয়েছেন ৮০ হাজার টাকা। ব্যবসা থেকে ২ লাখ টাকা, সম্মানী ভাতা হিসেবে পান ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। এ পৌরসভায় এসএসসি পাস বিএনপির প্রার্থী এসএম মনিরুজ্জামান পেশা হিসেবে ক্ষুদ্র ব্যবসা উল্লেখ করেছেন। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ রাজনৈতিক মামলা রয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী খলিলুর রহমান শিক্ষাগত যোগ্যতা কামিল পাস উল্লেখ করেছেন। পেশা হিসেবে শিক্ষকতা উল্লেখ করলেও বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. মাসুদউজ্জামান মাসুক। তিনি নিজেকে ‘স্বশিক্ষিত’ দাবি করেছেন। তার পেশা বাড়ি ও দোকান ভাড়ার ব্যবসা। তার বার্ষিক আয় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। তার নগদ টাকা রয়েছে ৪৫ হাজার। কাউন্সিলর থেকে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী এ প্রার্থীর স্থাবর সম্পদের মধ্যে ২০ শতক কৃষিজমি, আট শতক অকৃষি জমি ও চার শতক জমির ওপর একতলা ভবন রয়েছে। ব্যাংকে ঋণ আছে ১০ লাখ টাকা।
এ পৌরসভায় বিএনপির প্রার্থী এমএফ আহমেদ অলি। তিনি নবম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। পেশার বিবরণীতে তিনি লিখেছেন গৃহসম্পত্তি ও কৃষি আয়। কিন্তু পেশা থেকে কোনো বার্ষিক আয় দেখাননি তিনি। তার নামে মামলা আছে ১০টি। তার অস্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে নগদ ২৮ হাজার টাকা, ব্যাংক ও আর্থিকপ্রতিষ্ঠানে জমা ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৮৫ টাকা। স্ত্রীর নামে জমা রয়েছে ৪ লাখ ৮০ হাজার ৬২৬ টাকা। তার স্থাবর সম্পদের মধ্যে একটি পাকাঘর রয়েছে। যৌথ মালিকানায় ১৩ দশমিক ৯১ একর কৃষি, ১০৫ শতক কৃষি এবং ১৮০ শতক (৫০ লাখ টাকা মূল্য) জমি আছে। এসব জমির ৪৮/৭ অংশের মালিক তিনি।
এ পৌরসভায় স্বতন্ত্র প্রার্থী ছালেক মিয়া পেশায় ব্যবসায়ী। তার বার্ষিক আয় ৫২ লাখ ৬০ হাজার ৫০০ টাকা। এর মধ্যে কৃষি/মৎস্য খাতে আয় ৪০ লাখ ৫ হাজার টাকা, ভাড়া থেকে আয় ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৫০০, ব্যবসা থেকে আয় ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এছাড়া (উপস্বত্ব, রয়্যালিটি) ও মেয়র হিসেবে প্রাপ্ত ভাতা থেকে আয় ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। অন্য স্বতন্ত্র প্রার্থী আবুল কাশেমের বার্ষিক আয় ৩২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। নির্ভরশীলদের আয় ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা। তার কাছে নগদ টাকা রয়েছে ২ লাখ। কৃষিজমি ১০১ শতাংশ, অকৃষি জমি ৭১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এছাড়া যৌথ মালিকায় কৃষিজমি ৪৯৪ শতাংশ, অকৃষি জমি ২৩৬ দশমিক ১ শতাংশ ও ছয়টি বাড়ি রয়েছে। নিজের নামে ঋণ ৯ কোটি ৫০ লাখ ও স্ত্রীর নামে ঋণ ৩০ লাখ টাকা। আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী ফজল উদ্দিন তালুকদার নিজেকে স্বশিক্ষিত দাবি করেছেন। অন্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ইমদাদুল ইসলাম স্নাতক পাস; তিনি পেশায় ব্যবসায়ী।
ঢাকার ধামরাই পৌরসভায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী গোলাম কবির বিএ পাস। পেশায় তিনি ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে একটি মামলা চলমান। আগে তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা থাকলেও সেগুলো নিষ্পত্তি হয়েছে। তার বার্ষিক আয় ১০ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ব্যবসা থেকে ৫ লাখ ৫০ হাজার ও সম্মানীভাতা থেকে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। বিএনপির প্রার্থী দেওয়ান নাজিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা আছে পাঁচটি। এর মধ্যে চারটি বিচারাধীন ও একটি উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত আছে। তিনি বিএ পাস। পেশায় তিনি ব্যবসায়ী। তার বার্ষিক আয় ১৫ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫২ টাকা। এ পৌরসভায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী শওকত আলী এইচএসসি পাস। পেশায় তিনি শিক্ষক।
খুলনার চালনায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী সনত কুমার বিশ্বাস এসএসসি পাস। পেশায় ব্যবসায়ী এ প্রার্থীর বার্ষিক আয় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বিএনপির প্রার্থী মো. আবুল খয়ের খানের শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন’। তার বিরুদ্ধে আছে একটি মামলা। তবে সেটি ২০১৫ সালের ৮ ডিসেম্বর থেকে স্থগিত। তিনিও পেশায় ব্যবসায়ী। তার বার্ষিক আয় ১১ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা। তার অস্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে নগদ ১ লাখ ও ব্যাংকে জমা ৫ হাজার টাকা। স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে ১১ একর কৃষিজমি, দশমিক ৮১ একর অকৃষি জমি, একতলা দালান ও বাড়ি একটি। স্বতন্ত্র প্রার্থী অচিন্ত্য কুমার মণ্ডলের শিক্ষাগত যোগ্যতা এমএসসি পাস। পিএইচডি ডিগ্রিও রয়েছে তার। পেশায় তিনি শিক্ষক। আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী গৌতম কুমার রায় বিএসসি পাস। পেশার বিবরণীতে তিনি লিখেছেন, কৃষিকাজ, গোসেবা, ভক্তসেবা।
ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এসএম ইকবাল হোসেন সুমন বিকম পাস। পেশায় তিনি অটোরাইস মিলের ব্যবসায়ী। দ্রুত বিচার আদালতে একটি মামলা চলমান থাকলেও বেশ কয়েকটি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। তিনি কৃষি খাত থেকে বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৩০ লাখ টাকা। এছাড়া শিক্ষকতা, চিকিৎসা এবং আইনি পরামর্শ থেকে তার বার্ষিক আয় ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। অন্যান্য আয় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এছাড়া বাড়িভাড়া ও শেয়ার থেকে আয় দেখিয়েছেন তিনি।
এ পৌরসভায় বিএনপির প্রার্থী শাহ আবদুল্লাহ আল মামুন বিএ পাস। তার বিরুদ্ধে দুটি ফৌজদারি মামলা চলমান। পেশা হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন ট্রাকে বালু ভরে আয় ও ভাড়া উত্তোলন। কৃষি খাতে আয় ৩০ হাজার টাকা। বার্ষিক তার ব্যবসা থেকে ২০ হাজার ও শেয়ার থেকে আয় ৫০ হাজার টাকা। এছাড়া ৫০ শতাংশ কৃষিজমি, ১০ শতাংশ অকৃষি জমি এবং দালান ও একটি বাড়ির কথা হলফনামায় উল্লেখ করেছেন তিনি।