মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত রোহিঙ্গা নাগরিকদের দেশে ফেরা নিশ্চিত করতে তুরস্ককে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল বুধবার তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত চাভুসওগ্লুভ গণভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে প্রধানমন্ত্রী এই আহ্বান জানান।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে বাংলাদেশে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির পাশাপাশি বাণিজ্য দ্বিগুণ করার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান জাহিদ তুষার পরে বৈঠকের বিভিন্ন দিক সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন।
এরপর দুপুরে ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠকে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির পাশাপাশি বাণিজ্য দ্বিগুণ করার আগ্রহের কথা জানান।
বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে তুর্কি মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে বাণিজ্যের পরিমাণ দুই বিলিয়ন করার লক্ষ্য ঠিক করেছি। গত বছর বাংলাদেশে আমাদের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল এক বিলিয়ন ডলার।’
করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যেও তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য না কমায় তারা ‘খুশি’। তিনি বলেন, ‘এ কারণে আমরা আশাবাদী, অদূর ভবিষ্যতে বাণিজ্যের পরিমাণ দুই বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে পারব।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনের সঙ্গে বৈঠকে আলোচনার প্রসঙ্গ ধরে মেভলুত চাভুসওগ্লুভ বলেন, ‘আমি আমাদের সামরিক সরঞ্জামের সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে আলোকপাত করেছি। এক্ষেত্রে বিশ্বে প্রথম সারিতে আছি আমরা। প্রতিযোগিতামূলক দাম এবং কোনো ধরনের পূর্বশর্ত নেই। আমি নিশ্চিত যে, বাংলাদেশ এই সুযোগের ব্যবহার করবে।’
সামরিক সহযোগিতা বিষয়ে এক প্রশ্নে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে কাজ করে থাকে তুরস্ক। এখন আমরা যা উৎপাদন করছি তার ৭০ শতাংশের বেশি আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার হচ্ছে। তবে আমরা এক্ষেত্রে প্রচুর বিনিয়োগ করেছি।’
এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘আমরা তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্য, কভিড-১৯, বহুপক্ষীয় সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী। আমরা তুরস্কের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।’
গত মঙ্গলবার মেভলুত চাভুসওগ্লুভ দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে আসেন। গতকাল বুধবার দুপুরে তিনি গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এবং অতিথিভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর তিনি ঢাকায় তুরস্কের নতুন দূতাবাস ভবনের উদ্বোধন করেন।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরে আঙ্কারায় বাংলাদেশ দূতাবাসের নতুন ভবন উদ্বোধন করতে গিয়েছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন। সে সময় তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মোমেন তখন এরদোয়ানকে বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানান। ওই সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদুলু এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের উন্নয়ন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তুরস্কের হস্তক্ষেপ, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে জোর দেওয়ার কথা জানান।
বৈঠক সূত্র জানায়, মেভলুত চাভুসওগ্লুভের এই সফরে ছিল তুরস্কর প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে দুই দেশের সম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাওয়ার বার্তা। এরদোয়ান সরকার মনে করে, মুসলিমপ্রধান দেশ দুটির মধ্যে ইতিমধ্যে সম্পর্ক অনেক জোরালো হয়েছে। তবে এটাকে আরও উন্নত করা প্রয়োজন। তুরস্ক কোনো দলের নয়, দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে আগ্রহী। এজন্য তারা বাংলাদেশকে বাণিজ্য, সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিতে চাইছে। বাংলাদেশ চাইছে অর্থনৈতিক জোনগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগ। তুরস্কও চাইছে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে। বিশেষ করে কনস্ট্রাকশন খাতে তুরস্কের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী। এই বিষয়টি তিনি বাংলাদেশকে জানান। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের স্বাগতম জানানোর বিষয়ে বাংলাদেশ প্রস্তুত।
বৈঠকে অন্যতম আলোচ্য বিষয় ছিল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও ভাসানচরে স্থানান্তরের বিষয়টি। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের বিষয়ে জানানো হয়। এছাড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে তুরস্ককে আন্তর্জাতিকভাবে চাপ প্রয়োগে সহায়তা চাওয়া হয়। এ সময় চাভুসওগ্লুভ বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে তুরস্ক সব সময় বাংলাদেশের পাশে ছিল। প্রয়োজনে দেশটি মিয়ানমারের সঙ্গে কথা বলবে। তিনি রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের বিষয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে বাংলাদেশের একযোগে কাজ করার পরামর্শ দেন।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তুরস্কের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) অথবা অগ্রাধিকার বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষরের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। তুরস্ক সরকারও এ বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে তুরস্কের পক্ষ থেকে এই মুহূর্তে পিটিএ স্বাক্ষরের বিষয়ে আগ্রহ দেখানো হয়েছে। এছাড়া অদূর ভবিষ্যতে এফটিএ স্বাক্ষরের বিষয়েও আশ্বস্ত করা হয়। এখন বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আলোচনা করবেন। আগামী মার্চে এরদোয়ান বাংলাদেশ সফরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। ওই সফরে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। তখন এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
টার্কিস এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল বিকেলে বাংলাদেশে নিযুক্ত তুরস্কের দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক উন্নয়নে জোরালো কাজ করার জন্য দিকনির্দেশনা দেন বলে জানা গেছে। এছাড়া দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নয়নে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায় এবং বাংলাদেশে তুরস্কের ব্যবসায়ীদের কোন কোন খাতে বিনিয়োগে ভালো সম্ভাবনা আছে তা যাচাইয়ের জন্য কাজ করতে বলেন।
করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর মাস মার্চে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বাংলাদেশ সফর করতে পারেন বলে জানান সফররত দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তুর্কি প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানানোয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। একই সঙ্গে করোনা মহামারী পরিস্থিতি মোকাবিলায় শেখ হাসিনা সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের প্রশংসা করেন তিনি। সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস, বাংলাদেশে নিযুক্ত তুর্কি রাষ্ট্রদূত মুস্তাফা ওসমান তুরান উপস্থিত ছিলেন।