পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে নীরব চাঁদাবাজি

মাঝে কয়েক বছর চাঁদাবাজি আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কমে গেলেও রাজধানীর মিরপুর-পল্লবীতে ফের ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে চাইছেন দীর্ঘদিন ধরে ভারতে পালিয়ে থাকা তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে প্রায়ই গুলির ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি মিরপুরের বাইরেও শাহাদাতের রাজত্ব কায়েমের চেষ্টা করছে তার সহযোগীরা। অনেকেই ভয়ে চাঁদার টাকা তুলে দিচ্ছেন নীরবে।

শাহাদাতের মতো রাজধানী ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান, মোল্লা মাসুদ, সুব্রত বাইন, মানিক ও আইজি গেটের কচির নামেও চাঁদা ওঠানো হচ্ছে বিভিন্ন এলাকা থেকে। চাঁদা নেওয়ার পর পরিবারসহ প্রাণনাশের হুমকিও দিচ্ছে। ফলে বেশিরভাগ ভুক্তভোগীই চাঁদাবাজির বিষয়টি অবহিত করছেন না। পুলিশসহ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ভাষ্য, এ কারণে তারা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এ ছাড়া তাদের বেশিরভাগই বিদেশে বসে কলকাঠি নাড়ছে বলে তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না।

পুলিশ ও র‌্যাবের সূত্রগুলো জানিয়েছে, চাঁদাবাজিসহ অপরাধে সবচেয়ে এগিয়ে আছে শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত হোসেন। ঢাকার বেশিরভাগ স্থানেই তার সহযোগীরা সক্রিয়; বিশেষ করে মিরপুর-পল্লবী ও সাভার এলাকায়  তার সহযোগীদের আনাগোনা বেশি। ২০০১ সালে মিরপুর এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত বেপরোয়া হয়ে ওঠে। জীবনে একবার গ্রেপ্তার হলেও রাজনৈতিক তদবিরে ছাড়াও পেয়ে যায় সে। পুরো মিরপুর, পল্লবী ও সাভার এলাকায় একাধিক গ্রুপ তৈরি করে। তারা বিভিন্ন পোশাক ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারসহ নানা রকম অপরাধ কর্মকাণ্ড শুরু করেছে।

তারা টার্গেট করা ব্যক্তির ব্যবসায়িক ও পারিবারিক সব খোঁজখবর নিয়ে ফোন করে চাঁদা দাবি করে। এ কারণে ব্যবসায়ীরা গোপনে দর-কষাকষি করে শাহাদাতের ক্যাডারদের হাতে চাঁদার টাকা তুলে দেন।

একসময় শাহাদাত ছাড়াও মোল্লা মাসুদ, সুব্রত বাইন, মানিকসহ অন্তত অর্ধশত শীর্ষ সন্ত্রাসীর কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে বিএনপি-জামায়াত জোটের আমলে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। এর পর এদের অনেকেই আত্মগোপনে চলে যায়। কিছু দিন পর থেকেই তাদের সহযোগীরা অপরাধ কর্মকাণ্ড চালাতে শুরু করে। এখনো সেই ধারা অব্যাহত আছে।

র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা তথ্য পেয়েছি, বিদেশে পালিয়ে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে গোপনে চাঁদাবাজিসহ অপরাধমূলক কর্মকান্ড চালাচ্ছে তাদের সহযোগীরা; বিশেষ করে শাহাদাতের গ্রুপ বেশি সক্রিয়। তাদের ওপর কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে। সন্ত্রাসীরা যদি কারও কাছে চাঁদা দাবি করে তাৎক্ষণিক পুলিশ বা র‌্যাবকে অবহিত করুন। আমরাও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেব। দেশ থেকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিদের মুক্ত করতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি।   

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সম্প্রতি বলেছিলেন, সন্ত্রাসীদের স্থান নেই বাংলাদেশে। যারা সন্ত্রাসী কর্মকা- চালাবে, তাদের বিরুদ্ধেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে অনেকে অপকর্ম করে বলে আমরা মাঝেমধ্যে তথ্য পাই। এ ক্ষেত্রে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কঠোর। চাঁদাবাজির ঘটনা অনেকাংশ কমে এসেছে। তারপরও সন্ত্রাসীদের বিষয়ে আমরা সতর্ক আছি।

একই কথা বলেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মাদ শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে কেউ সন্ত্রাসী কর্মকা- চালানোর চেষ্টা করে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অ্যাকশনে যেতে পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে একাধিক চক্রকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা জানান, সপ্তাহখানেক আগে মিরপুর এলাকায় আমার এক পরিচিত লোকের কাছে শাহাদাতের নাম করে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। যে নম্বর থেকে ফোন এসেছিল তা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে ভিওআইপি ফোন করা হয়েছিল। অনেক সময় দেখা যায়, বাংলাদেশে থেকেও অপরাধী চক্র এসব অপকর্ম করে। আবার ভারত থেকে সরাসরি ফোন করা হয়। ওই কর্মকর্তা বলেন, শাহাদাতের নাম ব্যবহার করেই এ ধরনের কর্মকাণ্ড বেশি হচ্ছে। শাহাদাতসহ সন্ত্রাসীদের বেশিরভাগই কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে আত্মগোপনে আছে।

এদিকে মিরপুরে প্রিন্স গ্রুপের মালিক শহিদুল্লাহ ও ব্যবসায়ী আফতাব হত্যা মামলা থেকে রেহাই পেতে এখনো রাজনৈতিক তদবির চালিয়ে আসছে শাহাদাত। ইতিমধ্যে ব্যবসায়ী আফতাব হত্যা মামলায় শাহাদাতসহ ১৯ আসামির নাম প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হওয়ার পর প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া থমকে যায়। এখন মামলাটি আদালতে বিচারাধীন আছে। এ ছাড়া মিরপুর ৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছায়েদুর রহমান নিউটন, ওয়ার্ড কাউন্সিলর শওকত আলী মিস্টার, ব্যবসায়ী নেতা ও প্রিন্স গ্রুপের মালিক কাজী শহীদুল্লাহ, ব্যবসায়ী আহম্মেদ আলী, ব্যবসায়ী আফতাব হোসেন, আবদুল বারেক, ছিন্নমূল মার্কেটের সভাপতি রিপন খান, মাহবুব, সেলিম, গুদারাঘাটের টিপু, ছাইদুল ইসলাম রিপন, পল্লবীতে মৎস্য খামার ব্যবসায়ী হামিদুর রহমান খোকন, বাদশা মিয়া, কল্যাণপুরে মুদিদোকানি রুহুল আমিন, মিরপুরে খাজা মার্কেটের ব্যবসায়ী জাকির হোসেন বিপ্লব, মণিপুরের মুদিদোকানি সেলিম, পল্লবীর বিহারি ক্যাম্পের লবণ ব্যবসায়ী ফকরুদ্দীন আহম্মেদ ও তার ছেলে বাবুল, কল্যাণপুরে ঠিকাদার আবদুল জাব্বার, শিল্পপতি আজহারুল ইসলাম, গার্মেন্টস ব্যবসায়ী আবদুস সামাদ, ভিডিও সেন্টারের মালিক মাহবুবকে হত্যা করে শাহাদাত ও তার গ্রুপের সদস্যরা।