স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে ইতিবাচক উদ্যোগ

মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে অনেক কিছুই হারিয়েছে বাংলাদেশ; হারিয়েছে তিরিশ লাখ মানুষ। মুক্ত স্বাধীন দেশের জন্য আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের বাংলাদেশ কখনো ভুলতে পারবে না। ভুলবে না একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার আর তাদের এদেশীয় দোসরদের পরিকল্পিত হত্যাকান্ডের শিকার বুদ্ধিজীবীদের।  আবার মুক্তিযুদ্ধে দুই লাখ নারী যেমন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তেমনি অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের মাধ্যমে পেয়েছি স্বাধীনতা। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সমাজ ও রাজনীতির নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে জাতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসের অনেক স্মারক হারিয়ে যেতে পারে। তেমনি পরিকল্পিতভাবে মুছে ফেলা হতে পারে জাতীয় ইতিহাসের অনেক অধ্যায়, অনেক স্মারক। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, নানা দেশের মতো বাংলাদেশও এই নির্মম বাস্তবতার মধ্য দিয়ে পার হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ আবার ঘুরেও দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে জাতি যখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখা এই জাতিরই শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের নামে সরকারি প্রতিষ্ঠান, সড়ক, সেতু ও ভবনের নামকরণ করার এক প্রয়োজনীয় এবং জরুরি উদ্যোগ নিয়েছে।  

গত শনিবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নামে হচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভার সুপারিশ অনুযায়ী নামকরণের কাজটি বাস্তবায়ন করছে পাঁচ থেকে ছয়টি মন্ত্রণালয়। ইতিমধ্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয় মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, সড়ক, জনপথ ও সেতু মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।  এ চিঠি পাওয়ার পর সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে বলেও জানা যায়।  এক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাস্তাঘাটসহ সব সরকারি স্থাপনার নামকরণের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের নাম বাছাইয়ের জন্য জেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। চলতি বছরের ১৮ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে অধীনস্ত গণপূর্ত অধিদপ্তর, রাজউক, জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষসহ সব সংস্থাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়নের ৫৩ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার নামে এলাকার ৫৩টি গ্রামীণ সড়কের নামকরণ করা হয়েছে।  মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে ৩০টি সড়ক নামকরণের উদ্যোগ নিয়েছে হাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদ। ভারতের সীমান্তঘেঁষা ঝিনাইদহের মহেশপুর পৌরসভা এলাকায় ৪০টি আঞ্চলিক ও শাখা সড়কে ৪০ জন জীবিত ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নামে ফলক বসিয়েছে। রাজধানীর পূর্বাচল তিনশ ফুট রাস্তাটি নামকরণের বিষয়টি নিয়েও এই নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছে রাজউক।

পৃথিবীর অনেক দেশের মতোই এদেশের মুক্তিযুদ্ধেও অনেক বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস এবং স্মৃতি রয়েছে। এ কালের ইতিহাসবিদরা বলছেন, এই সামষ্টিক সামাজিক ইতিহাস এবং স্মৃতি অমূল্য। ইতিহাসকে নানাভাবে দেখবার বুঝবার জন্য যেমন, তেমনি ইতিহাসকে ধরে রাখবার জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি। কেননা, মানুষের মুখে মুখে ফেরা নানা ঘটনার বিবরণে, নানা আখ্যানে সেকালের সমাজের, সেকালের মানুষের মনের কথাগুলো লুকিয়ে থাকে। আমাদের দেশেও স্বাধীনতার পরপরই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা ও সংরক্ষণে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ শুরু হয়। আশার কথা হলো, এখনো প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক নানা উদ্যোগের মধ্য দিয়ে আমাদের যুদ্ধদিনের স্মৃতি ধরে রাখবার প্রচেষ্টা চলমান। সে বিবেচনায় মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধাদের নামে সড়ক, সেতুসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনার নামকরণ করার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা অত্যন্ত ইতিবাচক। 

এর আগে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ২০০৭ সালে ভাষাসংগ্রামী এবং জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে অবদান রাখা বিভিন্ন ব্যক্তির নামে রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তার নামকরণ হয়। বর্তমান ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকার প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বিভিন্ন সড়কের নামকরণের উদ্যোগ নিলেও এতদিন জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অল্প কিছু উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়েছিল। এখন সরকারের এই নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের পরবর্তী প্রজন্মগুলোর সামনে মুক্তিযুদ্ধের বীরদের ইতিহাস তুলে ধরার একটি সেতুবন্ধন তৈরি হলো। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুক্তিসংগ্রামে যারা শহীদ হন, তাদের স্মৃতি সংরক্ষণের অনেক উদ্যোগই পরিলক্ষিত হয়। যেমন চীনের বিপ্লবে যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছে তাদের স্মৃতি সংরক্ষণে দেশটির সরকার নানা স্থাপনা তৈরি করেছে। আবার স্পেনে জেনারেল ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিস্ট বাহিনীর শিকার হয়ে ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের স্মৃতি ধরে রাখতে ২০০৭ সালে স্পেনের তৎকালীন সমাজবাদী সরকার ‘ঐতিহাসিক স্মৃতি আইন’ পাস করে। এই আইন দেশটির অতীতের ঘটনাবলিকে নতুন আলোতে দেখার এবং তা নিয়ে আলোচনার পথ তৈরি করে দেয়। অনান্য দেশের এসব উদাহরণকে সামনে রেখে বাংলাদেশেও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মৃতি সংরক্ষণের যেসব উদ্যোগ শুরু হয়েছে, তার ব্যাপক সম্প্রসারণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, প্রজন্মকে সত্য ইতিহাস জানানো এবং সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি বীরত্বগাথা, ঘটনা, দলিল ও ইতিহাস সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও গবেষণা করা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে উজ্জীবিত করার জন্য একান্তই জরুরি। ইতিহাস সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধে আমাদের অগ্রজদের ত্যাগ-তিতিক্ষা আর অর্জন সঠিকভাবে জানাতে পারলে এটাই হবে দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাতিঘর, আলোর দিশারী।