করোনার দ্বিতীয় তরঙ্গের ব্যাপকতা ও প্রখরতা নিয়ে আমরা যখন পরস্পরবিরোধী নানা খবরের কোষ্ঠী যাচাই নিয়ে ব্যস্ত, তখন (২৩ ডিসেম্বর) একটি ইংরেজি দৈনিকে খাদ্যসংশ্লিষ্ট দুটি গবেষণার ফল একদিনে পেলাম। প্রথমটি এ বছর আমন উৎপাদনের পরিমাণ নিয়ে, আর দ্বিতীয়টি ভেতরের পাতায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির দক্ষতা প্রসঙ্গে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারি (ইঅজও) আমন উৎপাদন প্রাক্কলন করে বিগত ২২ ডিসেম্বর বলেছে, বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির কারণে এ বছর গতবারের চেয়ে ১.৫৩ মিলিয়ন টন কম উৎপাদন হয়েছে, শতাংশের হিসাবে যার পরিমাণ ১০.০৬। বারির এই গবেষণায় দেশের ১৬.৭ মিলিয়ন লোকের জন্য মাথাপিছু দৈনিক ৪০৫ গ্রাম করে চালের ভোগ ধরে এও দাবি করা হয়েছে যে, উৎপাদন কম হওয়া সত্ত্বেও এ বছর বোরো আসার আগ পর্যন্ত তিন মিলিয়ন টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে; মানে চিন্তার কোনো কারণ নেই।
দ্বিতীয় সংবাদটি আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (ওঋচজও) পরিচালিত একটি জরিপের ফল নিয়ে। সেখানে বলা হয়েছে, অতিদরিদ্র মানুষের জন্য আগে থেকেই নামমাত্র শুভেচ্ছা মূল্যে চাল সরবরাহের যে কর্মসূচি চালু আছে, করোনাকালে সেই খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কর্মক্ষমতা নেতিবাচকভাবে ব্যাহত হয়েছে; ৬০ কেজির স্থলে সুবিধাভোগীরা গড়পড়তা ২০১৮ সালের মার্চ-এপ্রিলে ৫৭.৫ কেজি, আর ২০২০ সালের মার্চ-এপ্রিলে ৪৯.৬ কেজি করে চাল পেয়েছেন, অর্থাৎ উভয় প্রান্তিকে কম পেলেও সময়ের ব্যবধানে ও অতিমারীর মধ্যে তাদের গড়পড়তা প্রাপ্তি আরও আট কেজি করে কমে গিয়েছে। ২০২০ সালের মে মাসের অবস্থা আরও খারাপ; তখনকার গড়প্রাপ্তির পরিমাণ ৩০ কেজির স্থলে ১২.৭ কেজি মাত্র।
বারির প্রাক্কলন নিয়ে কিছু কথা বলা প্রাসঙ্গিক মনে করছি। এর আগে চলতি বছরের আগস্ট মাসে অনলাইন এক সেমিনারে বারি যে তথ্য উপস্থাপন করে, তাতে দেখা যায়, এ বছর নভেম্বর পর্যন্ত চাহিদা মেটানোর পরও ৫.৫৫ মিলিয়ন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। আমনের উৎপাদন বিবেচনায় নিয়ে এখন বলা হচ্ছে যে, আগামী জুন পর্যন্ত চাহিদা মিটিয়েও তিন মিলিয়ন টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। এর সঙ্গে প্রতি বছর যে ৫০-৬০ লাখ টন গম আমদানি হয়, সেটা বিবেচনায় নিলে নাসির উদ্দিন হোজ্জার সেই ‘বিড়াল কই বা মাংস কই’-এর রহস্যময় ধাঁধা মনে পড়ে। যাই হোক, এখন প্রশ্ন হলো এই হিসাব ঠিক হলে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে চাল আমদানি করার আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে কি না? কারণ, মে মাসের প্রথম থেকেই বোরো ধান কাটা শুরু হয়ে যায়।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের এই জাতীয় তথ্য এর আগেও খাদ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করেছিল। ২০১৭ সালে সিলেটের হাওর অঞ্চলে যে আগাম বন্যা হয়েছিল, তাতে ১০ লাখ টন খাদ্যশস্য বিনষ্ট হওয়ার প্রাক্কলন করা হয়েছিল। কিন্তু ওই মৌসুমে সরকারি ও বেসরকারি সেক্টর মিলে প্রায় ৩৯ লাখ টন চাল আমদানি করেও চালের দর বাগে আনা যাচ্ছিল না। সে সময়ও বোরো ফসলের জন্য প্রণোদনার কথা বলে চাল আমদানির ওপর আরোপিত ২৮ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করতে অনেক বিলম্বে করা হয়েছিল এবং সেটাও করা হয়েছিল ধীর গতিতে দুই দফায়। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে তার প্রভাব আশানুরূপ হয়নি; কিন্তু মধ্য মেয়াদে তা বিপরীত ফল এনেছিল; প্রয়োজনের চেয়ে বেশি চাল এসে গিয়েছিল। সেবার ক্ষয়ক্ষতির প্রাক্কলন ছিল ১০ লাখ টন, এবার সেটা ১৫ লাখ টনের বেশি। এবার শুল্কের পরিমাণও আকাশচুম্বী; ৬২.৫০ শতাংশ। বাজারে চালের দাম ক্রমে বেড়েই চলেছে। এখন সহজেই অনুমান করা যায় সামনের পরিস্থিতি কী হতে পারে? কলাম যখন লিখছি, তখন খবর পেলাম, শুল্কের পরিমাণ ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে এবং পাঁচ থেকে ছয় লাখ টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া নতুন শুল্ক হারে আমদানি করতে আমদানিকারকদের ১০ জানুয়ারির মধ্যে মন্ত্রণালয়ে দরখাস্ত করতে বলা হয়েছে। কিন্তু কাজকর্মের গতি-প্রকৃতি দেখে ২০১৭ সালের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি বলে মনে হচ্ছে না।
বারির এই জরিপের ফল এমন একসময়ে প্রকাশ করা হলো যখন খাদ্য অধিদপ্তর মরিয়া হয়ে মজুদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে নানামুখী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে একমাত্র ভারত ছাড়া অন্য কোথাও টনপ্রতি ৫০০ মার্কিন ডলারের নিচে চাল পাওয়া দুষ্কর। জাহাজের ভাড়া বৃদ্ধি ও কনটেইনারের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিগত ২৭ ডিসেম্বরের হিসাব অনুযায়ী চাল-গম মিলে মজুদ দাঁড়িয়েছে ৭.৩৯ লাখ টন। আপৎকালীন মজুদ নির্বাহ ছাড়াও তার তো নিজস্ব কিছু কর্মসূচি রয়েছে, যেগুলোতে নিয়মিতভাবে খাদ্যশস্য সরবরাহ করতে হয়। আবার সুযোগসন্ধানীরা সরকারি মজুদের অবস্থা দেখে তাদের মুনাফা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিতে নানা অপকৌশল অবলম্বন করে থাকে। সেজন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মজুদ সন্তোষজনক পর্যায়ে রাখাও জরুরি।
এবার অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে আমন চাল সংগ্রহের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এজন্য মজুদ গড়ে তুলতে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টন চাল আমদানির পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে ২.৫ লাখ টনের দরপত্র সম্পন্ন হয়ে গেছে। ভারতীয় একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির জন্য আলোচনা চলছে। কিন্তু গম আমদানির কোনো তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছ না। অথচ সেটাই সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য। যা হোক, শুল্ক মাত্র ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং আমদানির জন্য দরখাস্ত করে অনুমতি পাওয়ার পর আমদানির কাজ কতটুকু নির্বিঘ্ন, পর্যাপ্ত এবং দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হবে, তা বলা মুশকিল। ভারতীয় চালের দাম কিছুটা কম থাকায় ইতিমধ্যে সেখানে অনেক দেশ থেকে চালের সরবরাহ আদেশ চলে এসেছে, যা সেখানকার দর উসকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর আমাদের সঙ্গে করা চুক্তির চালও ভারত থেকে আসবে। এর মধ্যে বেসরকারি আমদানিকারকরা সেখানে গেলে ত্রিমুখী চাপে দাম আরও বেড়ে যাবে। তা ছাড়া বারি যেখানে বলছে, এবার ১৫ লাখ টনেরও বেশি উৎপাদন কমে গেছে, সেখানে বর্ধিত মূল্য বাগে আনতে পাঁচ-ছয় লাখ টন চাল আদৌ যথেষ্ট নয়। এভাবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা না বাড়িয়ে বরং চালের বাজারদর এবং প্রকৃত আমদানির নিবিড় নজরদারি ও পরিবীক্ষণের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নিলে কাজটা সহজ হয়ে যেত।
ঘাটতি মেটাতে সরকারি পর্যায়ে খাদ্যশস্য আমদানির ক্ষেত্রে যে সমস্যাটি প্রকট হয়ে দেখা দেয়, সেটা হলো সময়। দরপত্রের মাধ্যমে পণ্য আমদানিতে কমপক্ষে দু-তিন মাস সময় লেগে যায়; সরকার-টু-সরকার পর্যায়ে সময় কিছু কম লাগতে পারে বটে। কিন্তু দেশের দুটি সমুদ্রবন্দর (পায়রা বন্দর দিয়ে এখনো খাদ্যশস্য খালাস কাজ শুরু করা যায়নি) দিয়ে মাসে ১.৫ লাখ টনের বেশি চাল খালাস করা বেশ কঠিন, যদিও গমের দৈনিক খালাস পরিমাণ ছয় হাজার টনে উন্নীত করা সম্ভব।
এ রকম একটা গোলমেলে পরিস্থিতিতে শুধু উদ্বৃত্তের প্রাক্কলনই যথেষ্ট নয়, বাজারদর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবে সেই উদ্বৃত্ত কোথায় অবস্থান নেয়, সেটা নির্ণয় করা অধিকতর জরুরি। অন্যথায় সেটা শুধু কেতাবি উদ্বৃত্ত হয়েই থাকবে। তা ছাড়া, বাজারে যেকোনো ঘাটতি-বাড়তির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষণা করে অগ্রভাগে তার ফল জনসমক্ষে প্রকাশ করার আগে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের তা জানালে আরও ভালো হয়, যাতে সম্ভাব্য সরবরাহ সংকট মোকাবিলা করার আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করা সম্ভব হয়। কোনো ঘাটতি যে আশঙ্কা তৈরি করে, সেটা তার প্রকৃত পরিমাণকে কয়েক গুণ ছাড়িয়ে যায়। বারি তাদের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে এই স্পর্শকাতর বিষয়গুলো সুষ্ঠুভাবে মোকাবিলা করতে সরকারকে সাহায্য করতে পারে। আর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (ঋচগট) তো অন্যতম প্রধান কাজই হওয়া উচিত এই জাতীয় পূর্বাভাস প্রদান এবং তা মোকাবিলা করার সম্ভাব্য উপায় বাতলানো।
এই কলামে আগেও উল্লেখ করেছি, চাল আমদানি করে ঘাটতি পূরণ করা দুঃসাধ্য না হলেও কষ্টসাধ্য তো বটেই। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য চালের ভালো বিকল্প এবং তুলনামূলকভাবে সস্তা গম সাইলোতে ঝুরা অবস্থায় থাকলেও চাল থাকে বস্তাবন্দি অবস্থায়। ফলে গমের তুলনায় চালের আমদানি অধিক ব্যয়সাধ্য ও স্থানান্তর সময়সাপেক্ষ। আবার চালের আন্তর্জাতিক বাজারও খুবই ছোট; তার মধ্যে সেদ্ধ চালের তাৎক্ষণিক সরবরাহ ভারত ছাড়া অন্য কোনো উৎসে তেমন একটা নেই। অথচ সংকটকালে ভারত নির্ভরযোগ্য কোনো উৎস নয়। এ দেশে সংকট শুরু হলে সেখানে চাপ বেড়ে যায়। তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে তারা দাম বাড়িয়ে দেয়, আবার অনেক সময় রপ্তানিই বন্ধ করে দেয়। এই জাতীয় একক পণ্য ও উৎসভিত্তিক নির্ভরতা পরিহার করে খাদ্য নিরাপত্তা সুসংহত করতে আমাদের খাদ্যনীতিতে পণ্য ও উৎসের বহুমুখিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই নীতির অনুসরণে পণ্য ও উৎসের বহুমুখিতা অর্জনে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন; পণ্য পরিবহনে সমুদ্রপথের সঙ্গে রেল ও সড়কপথ যুক্ত করা সম্ভব হলে পণ্য আমদানিতে গতি আসতে পারে। তাতে আর্থিক সাশ্রয় যেমন হবে, তেমনি সময়ও কম প্রয়োজন হবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা সুসংহত হবে।
আগেই বলেছি, দ্বিতীয় বিষয়টি খাদ্য অধিদপ্তরের একটি কর্মসূচির কর্মক্ষমতা নিয়ে। ওঋচজও-এর গবেষণায় খাদ্য অধিদপ্তরের সর্ববৃহৎ ক্ষুধানিরোধী কার্যক্রম ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি’র কর্মক্ষমতা নিয়ে একটি মূল্যায়ন রয়েছে। তাতে উৎসাহব্যঞ্জক ও হতাশাব্যঞ্জক উভয় চিত্রই আছে। উৎসাহব্যঞ্জক তথ্য হলো এই যে, এতে চুরিচামারির (ষবধশধমব) হার বেশ কম; মাত্র ১২ শতাংশ। পল্লী রেশনিংয়ে এর হার ছিল ৭০ শতাংশ, ভারতে সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থায় এর হার এখনো প্রায় ৫০ শতাংশ। আর হতাশাব্যঞ্জক ছবিটি প্রথমেই চিত্রিত হয়েছে; সুবিধাভোগীরা আগেও তাদের কোটার চেয়ে কম চাল পাচ্ছিল, অতিমারীর মধ্যে তাদের প্রাপ্তির পরিমাণ আরও কমে গেছে।
এটা ঠিক, শুরুতে এই কর্মসূচির সুবিধাভোগী নির্বাচনে অনেক অসংগতি ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দৃঢ় অঙ্গীকার থাকায় সেটা অকিঞ্চিৎকর পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়। এখন অতিমারীর মধ্যে অতিদরিদ্র মানুষের প্রতি সাধারণ ও সচ্ছল মানুষজনের যেখানে অধিকতর সদয় হতে দেখা যাচ্ছে এবং দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহীর কাছ থেকে যেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীনতার নির্দেশনা আসছে, সেখানে এই বিচ্যুতির ক্রমবৃদ্ধি অবশ্যই উদ্বেগের কারণ। ওঋচজও এই কার্যক্রমের উন্নতিতে নিয়মিতভাবে পরিধারণের জন্য ঋচগট এতে একটি কোষ গঠন এবং ছোট করে হলেও নিয়মিতভাবে ফোনে নমুনা জরিপের সুপারিশ করেছে। এই সুপারিশ অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য। তবে এই দুঃসময়ে বিচ্যুতির মাত্রা বৃদ্ধির কারণ এবং তার প্রকৃতি নির্ণয়ের জন্য আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা থাকায় ওঋচজ এই গবেষণা কাজে এগিয়ে আসতে পারে। খাদ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়কেও এ কাজে এগিয়ে আসতে হবে। তাতে কর্মসূচির উন্নতি হবে; দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে।
লেখক খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক
rulhanpasha@gmail.com