বায়ুদূষণে মৃত্যুঝুঁকিতে দেশের ২ লাখ মানুষ

বাংলাদেশে উচ্চমাত্রার বায়ুদূষণের প্রভাবে শ্বাসতন্ত্রের রোগ বাড়ছে। এতে শুধু চলতি বছরে দুই লাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। পরিবেশবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্টের (এসডো) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। গতকাল সোমবার এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

‘বাংলাদেশে বায়ুদূষণ : অভ্যন্তরীণ এবং বহিরাগত উৎস’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদন বলছে, গত ১১ মাসের বায়ুমান সূচকে বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক দূষণের মাত্রায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় এবং ঢাকা নগরী চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। উচ্চমাত্রার বায়ুদূষণ শুধু মানব স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নয়, এটি অর্থনীতি ও বাস্তুসংস্থানকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। গবেষণাটি করা হয়েছে বাংলাদেশ ও বিভিন্ন দেশের বায়ুদূষণের তুলনামূলক মূল্যায়নের মাধ্যমে বায়ুদূষণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের দিকসমূহ। এতে শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক বায়ুদূষণের দিকসমূহ আলোচনা করা হয়েছে।

বাংলাদেশে বায়ুদূষণের বাহ্যিক কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্মাণকাজ ৩৮ শতাংশ, প্লাস্টিক বর্জ্য পোড়ানো ২২ শতাংশ, শিল্প প্রক্রিয়াজাতকরণ ১৭ শতাংশ, ইটভাটা ১০ শতাংশ, জীবাশ্ম জ্বালানি দহন, সড়ক পরিবহন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ৮ শতাংশ। তাছাড়াও অভ্যন্তরীণ কারণগুলো হলো রান্নার চুলা থেকে নিঃসৃত ধোঁয়া ৪১ শতাংশ, সিগারেট থেকে নিঃসৃত ধোঁয়া ২৫ শতাংশ, নর্দমা নিষ্কাশন ১৫ শতাংশ, রেডন গ্যাস ও অন্যান্য দূষণকারী পদার্থ ১০ শতাংশ।

এসডোর পর্যালোচনায় জানা যায় যে, মৌসুম পরিবর্তন ও বাতাসের আন্তঃসীমান্ত গতিশীলতা বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ। এটি বাংলাদেশের মতো ছোট দেশের জন্য হুমকিস্বরূপ কারণ বাংলাদেশ ভারত ও নেপালের সীমান্ত দ্বারা বেষ্টিত। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীতজুড়ে দক্ষিণ এশিয়া থেকে দূষিত বায়ু ঢাকাতে পরিবাহিত হয়। শীতকালে (নভেম্বর-জানুয়ারি) উত্তর-পশ্চিম বায়ুর প্রভাবে দূষিত পার্টিকুলেট ম্যাটারের পরিমাণ বেড়ে যায়।

কিন্তু বর্ষাকালের আগে বাতাসে দূষিত বায়ুর প্রভাব থাকে মিশ্র (ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল)। উচ্চতার প্রভাবে বাতাসে দূষিত কণা প্রতি কিলোমিটারে ২০০-৫০০ কিমি প্রবাহিত হতে পারে। শীতকালে আন্তঃসীমান্ত গতিশীলতার বাতাসে দূষিত বায়ুকণার প্রভাব সর্বোচ্চ থাকে যা বাংলাদেশে ইন্ডিয়ান বেল্টের কারণে উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়ে ঢাকা, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছায়।

এসডোর গবেষণায় বলা হয়, বায়ুদূষণের কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার হার, বিকলাঙ্গতা, শ্বাসযন্ত্রের দুর্বলতাজনিত কারণে মৃত্যু, স্ট্রোক, ফুসফুস ক্যানসার, ডায়াবেটিসসহ নিউমোনিয়ার মতো ছোঁয়াচে রোগের কারণও বায়ুদূষণ। গত পাঁচ বছরে (২০১৫-১৯) সার্বিকভাবে হাঁপানি রোগীর সংখ্যা প্রায় ২৪ গুণ বেড়ে ৩ হাজার ৩২৬ (২০১৫) থেকে ৭৮ হাজার ৮০৬ জনে (২০১৯) দাঁড়িয়েছে, যেখানে মৃত্যুর সংখ্যা ১০ গুণ বেড়ে ৫৬ থেকে ৫৮৮ জনে উপনীত হয়েছে।

এর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসজনিত রোগীর সংখ্যা ২০১৫ সালে ১ হাজার ৬১০ থেকে বেড়ে ২০১৯ সালে ৭৮ হাজার ৮০৬ জনে দাঁড়িয়েছে, যা ২০১৫ সালের তুলনায় প্রায় ৪৯ গুণ বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্যমতে এ সময়ে মৃত্যু সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৯ শতাংশ। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২০ সাল নাগাদ শ্বাসযন্ত্রের রোগ এবং দীর্ঘসময় ধরে দূষিত বায়ুর সংস্পর্শে থাকার কারণে প্রায় দুই লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. আবু জাফর মাহমুদ, পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (মনিটরিং ও এনফোর্সমেন্ট শাখা) ড. মো. আবদুল মোতালিব, নিপসমের পেশাগত ও পরিবেশগত স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শাফিউর রহমান, এসডোর মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন, এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দীকা সুলতানাসহ প্রমুখ।