মনজুর-ই-মওলা এক ‘পরশপাথর’

২০০৪ সালের জানুয়ারি মাস। আমার মামা সরকার আমিন আমাকে কল করে জানতে চাইলেন একজন বড় লেখক তার লেখা কম্পিউটার কম্পোজিং এর জন্য সহযোগিতা চাচ্ছেন। আমি উনাকে সহযোগিতা করতে পারব কিনা? আমি রাজি হওয়াতে তিনি আমাকে পাঠালেন মনজুর-ই-মওলা স্যারের আজিমপুরের বাসায়। শুরুতে আমি ধরে নিয়েছিলাম কাজটি হয়তো সাময়িক সময়ের জন্য। কিন্তু মনজুর-ই-মওলা স্যারের সঙ্গে দেখা হওয়ার প্রথম দিন থেকে আমাকে এতটা আপন করে নিয়েছেন যে, আমি উনার সঙ্গে সাময়িক সময়ের জন্য বইয়ের কম্পোজিংয়ের সহযোগিতা করতে গিয়েছি সেটি উপলব্ধি হয়নি।

২০০৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে আমেরিকায় আসার আগের দিন পর্যন্ত প্রতিদিন স্যারের সঙ্গ পাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। আমি ধরেই নিয়েছিলাম, আমেরিকায় আসার পর বুঝি স্যারের সঙ্গ পাব না। কিন্তু স্যার মারা যাওয়ার ১ মাস আগেও আমাকে সঙ্গ দিয়েছেন। আমার খোঁজ রেখেছেন। অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন।

স্যারের সঙ্গে যত দিন কাজ করেছি, প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত কাজে থাকতাম স্যারের আজিমপুরের বাসায়। বাসার নিচতলায় ছিল স্যারের গবেষণা কেন্দ্র। পরে অবশ্য স্যার একদিন আমাকে ফোনে জানালেন সেটি ৩ তলায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং স্যারের শারীরিক অসুবিধার কারণে বাড়িতে লিফট লাগানো হয়েছে।

প্রতিদিন ৪ ঘণ্টা করে স্যারের সঙ্গে থেকেছি বটে, তবে কাজ করা হতো মূলত ১ থেকে দেড় ঘণ্টা। বাকিটা সময় কাটত স্যারের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে। স্যার বেশ গল্প করতেন আমার সঙ্গে। আমেরিকার বিভিন্ন জায়গার গল্প। স্যার যে আমার মাঝে পরশপাথরের মতো মিশে আছেন, সেটি অনুভব করেছি ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসের ৮ তারিখ। আমেরিকায় আসার পরের দিন যখন ট্রেনে করে জ্যাকসন হাইটসে গেলাম স্যারের শ্যালক এহেতশামুল হক টুটু মামার সঙ্গে দেখা করতে, তা-ও আবার কারো সহযোগিতা ছাড়া তখনই উপলব্ধি করলাম স্যারের কাছ থেকে শোনা আমেরিকার গল্প আমাকে পরশপাথরের মতো নিউইয়র্ককে চিরচেনা শহর করে তুলেছ। ঘর থেকে বের হয়ে আমার একটুও মনে হয়নি নিউইয়র্ক শহরটি আমার কাছে সম্পূর্ণ নতুন একটি শহর।

বাংলা একাডেমি নিয়ে অনেক গল্প করতেন স্যার। তিনি যখন বাংলা একাডেমিতে মহাপরিচালক হিসেবে যোগ দিয়েছেন, তখন অফিস সময় ছিল সকাল ৭টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত। প্রথম দিন স্যার অফিসে গেলেন, কিন্তু অফিসে যেন কেউ নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেন না। একজন কর্মকর্তা তো বিনা অনুমতিতে ২ মাস ধরে বিদেশ ভ্রমণ করছেন তখন। স্যার সবাইকে ডাকলেন এবং জানালেন, ‘আমি জানি আপনারা ভালো লেখক। তবে আমি আমার অফিসে ভালো লেখক চাই না, ভালো কর্মকর্তা চাই। সবাইকে যেন ঠিক সময়মতো অফিস করতে দেখা যায়, সেটি আমি আশা করব।’ 

স্যার জানতেন এই বাণীতে কোন কাজ হবে না। তারপর যে কর্মকর্তা বিনা অনুমতিতে বিদেশ ভ্রমণ করছেন, তাকে সঙ্গে সঙ্গে বরখাস্ত করলেন। পরদিন থেকে স্যার অফিসে দেরি করে গেলেও সবাই ঠিক সময়মতো অফিস করতে শুরু করেছে।

বরখাস্ত ওই কর্মকর্তা তার বরখাস্তের সংবাদ পেয়ে দ্রুত ফিরে আসলেন দেশে। স্যারের কাছে ক্ষমাও চাইলেন। কিন্তু স্যার তাকে কোন পাত্তা দিলেন না। ওই কর্মকর্তা নিরাশ হয়ে চলে গেলেন। বছর খানিক পর স্যার ওই কর্মকর্তাকে ডেকে পাঠালেন।

স্যারের দপ্তরে আসার পর তাকে জানালেন, তোমাকে যে বরখাস্ত আদেশ দেওয়া হয়েছে, সেটি অবৈধ, তুমি কোর্টে মামলা করতে পার। ওই কর্মকর্তা উকিলের কাছে গেলেন। উকিল সেই আদেশ দেখে কোথাও কোনো সমস্যা পেলেন না। ওই কর্মকর্তা আবার স্যারের কাছে ফিরে আসলেন। স্যারকে জানালেন, উকিল তো কোনো সমস্যা খুঁজে পাচ্ছেন না।

স্যার তাকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘ওই আদেশ কে করিয়েছে, আমি নাকি তোমার উকিল?’ ওই কর্মকর্তা জবাব দিলেন, ‘স্যার, আপনি।’ স্যার তাকে বললেন, ‘আমি যদি আদেশ দিয়ে থাকি আর আমি বলছি এটি অবৈধ, তোমার উকিলকে বলো সেটি খুঁজে বের করতে।’

পরে স্যার অবশ্য কিছুটা ইঙ্গিত দিয়ে দিয়েছিলেন যে, একজন কর্মকর্তা নিয়োগপ্রাপ্ত হন হিউম্যান রিসোর্স ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে। তাকে বরখাস্ত করার ক্ষমতা কেবল হিউম্যান রিসোর্স ডিপার্টমেন্টেরই আছে। অন্য কোনো ডিপার্টমেন্টের সেই অধিকার নেই।

স্যার ওই কর্মকর্তাকে বরখাস্তের আদেশে স্বাক্ষর করিয়েছিলেন অন্য দপ্তরের কর্মকর্তার মাধ্যমে। কারণ স্যারের উদ্দেশ্য ছিল কেবল বাংলা একাডেমিকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা। কারও জীবিকায় লাথি দেওয়া নয়। এই কর্মকর্তা কোর্টে মামলা করার পর স্যার কোর্টে গিয়ে ভুল স্বীকার করে নিলেন এবং ওই কর্মকর্তার সারা বছরের বেতনসহ তার চাকরি ফিরিয়ে দিলেন।

স্যারের এই রকম গল্পগুলো আমাকে ম্যানেজমেন্ট এর কাজে বেশ পারদর্শী করে তুলেছে। ফলে আমেরিকায় এখন সফটওয়্যার কোম্পানিতে টিম ম্যানেজ করার ক্ষেত্রে সব সময় সুনাম অর্জন করতে পারছি। আমার অফিসের উপরস্থ কর্মকর্তারা একজন টিম মেম্বার কেমন হওয়া উচিত সেই সার্ভে যখন করেন, প্রতিনিয়তই তালিকায় আমার নামটি থাকে।

এ ছাড়া ‘আগামী’ নামের একটি অলাভজনক সংগঠন যারা আমেরিকায় ফান্ড কালেকশন করে বাংলাদেশে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সহযোগিতার কাজ করে, সেখানেও আমি ডিরেক্টর হিসেবে বেশ দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছি। আমার মাঝে এই সব দক্ষতার বেশির ভাগই আমি পেয়েছি আমার ২ জন গুরু মনজুর-ই-মওলা এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান বৃক্ষপালনবিদ শাহজাহান মোহাম্মদ মহিউদ্দিন স্যারের সঙ্গে কাজ করার সুবাদে। তারা দুজনই আমার মাঝে পরশপাথরের মতো মিশে আছেন।

২০২০ সাল আমার জন্য একটা ‘কাল বছর’ হয়ে মনে থাকবে। কারণ একই বছরে আমি হারিয়েছি আমার দু’জন গুরুকেই। করোনা আক্রান্ত হয়ে তারা চির নিদ্রায় শায়িত। কিন্তু আমার মত যারা মনজুর-ই-মওলার সান্নিধ্য পেয়েছেন মনজুর-ই-মওলা বেঁচে থাকবেন তাদের মাঝে পরশপাথর হয়ে।

লেখক: মোস্তাফিজুর রহমান পারভেজ

ম্যারিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র।