চলে গেলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ঢাকার নিজ বাসায় অসুস্থ হয়ে পড়লে গতকাল শনিবার ভোরে তাকে রাজধানীর বিআরবি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা আয়শা খানমকে মৃত ঘোষণা করেন। মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু এসব তথ্য জানিয়েছেন। আয়শা খানমের বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ক্যানসারে আক্রান্ত আয়শা খানম দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। গত শুক্রবার রাতে ঢাকার নিজ বাসায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে গতকাল সকালে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আয়শা খানমের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মন্ত্রী পরিষদের সদস্যরা। এক শোক বার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আয়শা খানম ছিলেন একজন সাহসী যোদ্ধা। দেশে নারীর ক্ষমতায়নে তিনি অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছেন।’ রাষ্ট্রপতি আয়শা খানমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
পৃথক শোক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই নারী নেত্রীর মৃত্যুতে দেশের নারী সমাজ একজন অকৃত্রিম বন্ধু ও সাহসী সহযোদ্ধাকে হারাল।’ প্রধানমন্ত্রী মরহুমার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সহসভাপতি আয়শা খানম বাষট্টির ছাত্র আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধসহ সব আন্দোলনের সক্রিয় সংগঠক ছিলেন।
আয়শা খানমের মৃত্যুর কথা জানিয়ে নারী নেত্রী মালেকা বানু বলেন, ‘আয়শা আপা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। শুক্রবার রাতে উনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। শনিবার ভোরে বিআরবি হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ডাক্তাররা ওনার মৃত্যুর খবর জানান।’
আয়শা খানমের মরদেহ গতকাল সকাল সাড়ে ৮টায় ঢাকার সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে স্বজন ও দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর নেত্রকোনা পৌরসভার কাটলী এলাকায় পারিবারিক কবরস্থানে স্বামীর কবরের পাশে আয়শা খানমকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়, নেত্রকোনার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুয়েল মাহমুদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান জুয়েল এবং সদর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এরশাদুল আহম্মেদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
এর আগে বিকেল ৩টার দিকে আয়শা খানমের মরদেহ নেত্রকোনায় এসে পৌঁছালে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
আয়শা খানমের মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন। মহিলা পরিষদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আয়শা খানম বাষট্টির ছাত্র আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধসহ সব প্রগতিশীল আন্দোলনের সক্রিয় সংগঠক ছিলেন। তিনি ছাত্রজীবন শেষে বঞ্চিত অধিকারহীন নারীদের অধিকার আদায়ে আমৃত্যু নিয়োজিত ছিলেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের নারী আন্দোলন এক অকৃত্রিম অভিভাবককে হারাল।’
আয়শা খানমের জন্ম নেত্রকোনার গাবড়াগাতি গ্রামে ১৯৪৭ সালের ১৮ অক্টোবর। পাকিস্তান আমলে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বাতিলের দাবিতে ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে পা রাখেন তিনি। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি রোকেয়া হল ছাত্র সংসদের সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে ছাত্র ইউনিয়নের সহসভাপতি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে ঢাকায় শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করতে নামেন তিনি। ডামি রাইফেল হাতে ঢাকায় নারী শিক্ষার্থীদের মিছিলের যে ছবি আলোচিত হয়, তাতে আয়শা খানমও ছিলেন। এ ছাড়া ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বক্তৃতা দিয়েছিলেন আয়শা খানম।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিজেকে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যুক্ত করেন তিনি। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের নির্যাতনের শিকার নারীদের পুনর্বাসন এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় কাজও করেন তিনি। শুরু থেকেই বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আয়শা খানম। প্রথমে ছিলেন সহসাধারণ সম্পাদক, দশক কাল আগে সভাপতি নির্বাচিত হন এবং আমৃত্যু সেই পদে ছিলেন।
ঢাবি উপাচার্যের শোক প্রকাশ : নারীনেত্রী আয়শা খানমের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। এক শোকবাণীতে উপাচার্য বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী আয়শা খানম ছিলেন প্রগতিশীল ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের সামনের সারির একজন নেত্রী। বাংলাদেশের মহিলা পরিষদের সভাপতি হিসেবে তিনি নারীমুক্তি ও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় অসাধারণ অবদান রেখে গেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে, নারী অধিকার রক্ষায় এবং নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য ও সহিংসতা প্রতিরোধে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনের জন্য এই বীর মুক্তিযোদ্ধা স্মরণীয় হয়ে থাকবেন বলেও উপাচার্য উল্লেখ করেন।