ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পাবনা ও মাদারীপুরসহ দেশের কয়েকটি স্থানে গতকাল সোমবার সংঘর্ষে জড়িয়েছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে পাবনায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক খাওয়া নিয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় কমপক্ষে ৮ জন আহত হয়েছেন। আর মাদারীপুরের কালকিনিতে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে চেয়ার ছোড়াছুড়ি ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে নোয়াখালীতে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। এতে ইউপি চেয়ারম্যানসহ আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৬ জন। বিস্তারিত আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে :
কোম্পানীগঞ্জে আ.লীগের দুপক্ষের সংঘর্ষে আহত ৬ : নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাটে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় চরএলাহী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাকসহ অন্তত ৬ জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় এক পক্ষের মামলায় পুলিশ আহত চেয়ারম্যানসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে।
আহতরা হচ্ছেন চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক, তার পক্ষের হোরণ, রাসেল, মো. রাব্বি, কালাম, ফয়সালসহ ৬ জন। আহত রাজ্জাক চরএলাহী ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি।
স্থানীয়রা জানান, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ইউপি চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক উপজেলার বসুরহাট পৌর শহরের তার ভাড়া বাসা থেকে বের হয়ে যুবলীগের নেতাকর্মীসহ বসুরহাটে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। পথে হাসপাতাল এলাকায় চরএলাহী আওয়ামী লীগ সভাপতি শাহাব উদ্দিন ও সেক্রেটারি গণির লোকজনের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে শাহাব উদ্দিন ও গণির লোকজন চেয়ারম্যান ও তার লোকজনের ওপর হামলা করে।
ইউনিয়ন আ.লীগ নেতা শাহাব উদ্দিন ও গণির লোকজন লোহার রডসহ লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালালে চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক আত্মরক্ষার্থে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে ঢুকে পড়েন। একপর্যায়ে হামলাকারীরা ওই ক্লিনিকের গ্লাস ভাঙচুর করে সেখানে গিয়ে চেয়ারম্যান রাজ্জাকের মাথায় আঘাত করলে তার মাথা ফেটে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন তাকেসহ তার লোকজনকে উদ্ধার করে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে চিকিৎসা দেয়।
চেয়ারম্যান রাজ্জাক অভিযোগ করেন, কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই ইউনিয়ন আ.লীগের সভাপতি ও সেক্রেটারির নেতৃত্বে তাদের লোকজন তার মিছিলে হামলা চালায়। হামলাকারীরা তাকে হত্যা করার চেষ্টা করলে তিনি পালিয়ে একটি ক্লিনিকে গিয়েও বাঁচতে পারেননি। সেখানে গিয়ে তার মাথা ফাটিয়ে দেয়। এ ঘটনায় তার ৮-১০ জন লোক আহত হয়েছেন।
তিনি জানান, হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তিনি থানায় গেলে পুলিশ তাকে বসিয়ে রাখে এবং উল্টো তার বিরুদ্ধে ইউনিয়ন আ.লীগের সেক্রেটারি গণির করা মামলা গ্রহণ করে।
চরএলাহী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল গণি পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, বসুরহাটে কর্মসূচিতে আসার পর চরএলাহী যুবলীগের সেক্রেটারি আবদুল মালেকের সঙ্গে ছাত্রলীগের এক কর্মীর কথা-কাটাকাটি হয়। এরপরই চেয়ারম্যান রাজ্জাক ও তার লোকজন আমাদের ওপর হামলা করে এতে আমাদের কয়েকজন আহত হয়েছে, বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। এ ঘটনায় চেয়ারম্যানের লোকজন আমার বাড়িতেও হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর জাহিদুল হক রনি বলেন, সম্মেলনে আসার সময় চেয়ারম্যানের লোকজন গণির লোকজনের ওপর হামলা করে। এতে চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন আহত হন। চেয়ারম্যানের গ্রুপের লোকজন হাসপাতালের সামনে কয়েকটি দোকানও ভাঙচুর করে। পরে আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি। পরে আবদুল গণি রাজ্জাক চেয়ারম্যানকে প্রধান আসামি করে থানায় মামলা দেন। এ ঘটনায় চেয়ারম্যানসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়।
পাবনায় ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ৮ : পাবনায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক খাওয়া নিয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল দুপুরে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। এতে কমপক্ষে ৮ জন আহত হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান হোসেন বলেন, ‘জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক প্রিন্স এমপি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কেটে চলে যাওয়ার পর ছাত্রলীগ নেতা গাজী নেতাকর্মীদের মধ্যে কেক বিতরণ করছিলেন। এ সময় পেছন থেকে কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবক কেকের ওপর হামলে পড়ার চেষ্টা করলে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তাজুল ইসলাম এবং আমি নেতাকর্মীদের শান্ত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করি। পরে দলীয় কার্যালয়ের বাইরে আবারও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে শুনেছি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা জানান, কেক কাটার পর জেলা ছাত্রলীগ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফিরোজ আলী গ্রুপের কয়েকজন কর্মী কেক জোরপূর্বক নিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় অন্যরা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে শুরু হয় হাতাহাতি। পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি ওমর ফারুক সৈকতের নেতৃত্বে সভাপতি গ্রুপের নেতাকর্মীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তাজুল ইসলামের কর্মীদের ওপর হামলার চেষ্টা চালালে দুই গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। এ সময় শহরের প্রধান সড়ক আব্দুল হামিদ রোডে লোকজন ভয়ে ছোটাছুটি করে নিরাপদে আশ্রয় নেন। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় পথচারী ও ছাত্রলীগ কর্মীসহ ৮-১০ জন আহত হন।
জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তাজুল ইসলাম বলেন, ‘কেক খাওয়া নিয়ে হালকা একটু উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল। তাৎক্ষণিক আমরা বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসি। ঘটনাটি অনাকাক্সিক্ষত হলেও বড় ধরনের তেমন কিছু ঘটেনি।’
পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাসিম আহমেদ বলেন, ‘কেক খাওয়া নিয়ে নিজেদের মধ্যে একটু ঝামেলার সৃষ্টি হলে তাৎক্ষণিক ছাত্রলীগের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে নিয়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।’
কালকিনিতে চেয়ার ছোড়াছুড়ি : জুনিয়র ছাত্রলীগ নেতাদের নাম আগে মাইকে ঘোষণা দেওয়ার জের ধরে মাদারীপুরের কালকিনিতে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে চেয়ার ছোড়াছুড়ি ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে পুরো অনুষ্ঠানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে আ.লীগ নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। গতকাল দুপুরে এ ঘটনা ঘটে।
জানা গেছে, ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কালকিনি উপজেলা, পৌর ও কলেজ ছাত্রলীগের যৌথ উদ্যোগে সকালে উপজেলার প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে বর্ণাঢ্য র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। র্যালি শেষে স্থানীয় সার্কিট হাউজ চত্বরে উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি বদিউজ্জামান বাকামিন খানের সভাপতিত্বে ও উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক বি এম জুবায়ের হোসেনের সঞ্চালনায় আলোচন সভার আয়োজন করা হয়। আলোচনা সভার শুরুতে নিয়ম ভঙ্গ করে সিনিয়র ছাত্রলীগ নেতাদের নাম আগে মাইকে ঘোষণা না দিয়ে জুনিয়র ছাত্রলীগ নেতাদের নাম ঘোষণা দেওয়া হয়। এর জের ধরে ছাত্রলীগের একাংশ ক্ষিপ্ত হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে চেয়ার ছোড়াছুড়ি করে এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটায়। মুহূর্তের মধ্যে পুরো অনুষ্ঠানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি উপজেলা চেয়ারম্যান মীর গোলাম ফারুক ও বিশেষ অতিথি উপজেলা আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক তৌফিকুজ্জামান শাহিনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
কালকিনি থানার ওসি মো. নাসিরউদ্দিন মৃধা বলেন, ‘অনুষ্ঠানে সিনিয়র-জুনিয়রের নাম আগে-পরে ঘোষণা নিয়ে নিজেদের মধ্যে সামান্য ঘটনা ঘটেছে।’
দীঘিনালায় দুপক্ষের বিতণ্ডা : খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের সময় দুপক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডাসহ উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় ।
জানা যায়, গত ১৪ নভেম্বর দীঘিনালা উপজেলা ছাত্রলীগ ও দীঘিনালা সরকারি ডিগ্রি কলেজ কমিটি ঘোষণার পর থেকেই কমিটি বাতিলের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে অপর পক্ষ। ফলে ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের উদ্যোগ নিলে অপর পক্ষ আলাদা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করার প্রস্তুতি নেয়। দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে দীঘিনালা থানা পুলিশ। গতকাল উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পুলিশ দুপক্ষকে শান্ত করে।
সভাপতি-সম্পাদক ছাড়াই ইবিতে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন : সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুপস্থিতিতেই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয়। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ক্যাম্পাসে আনন্দ র্যালি করেন শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা।