নোনতা ঘাম ও চোখের জলে আখ তুমি কেন এত মিষ্টি হলে

একের পর এক মৃত্যুঘণ্টা বাজছে বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক ভারী শিল্পগুলোর। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশে যে পাট ও চিনিশিল্প রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়েছিল, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে ২০২০ সালের জুলাই মাসের ১ তারিখে সর্বশেষ ২৫টি পাটকল বন্ধ করেছে সরকার আর বিজয়ের মাস ডিসেম্বরের ৩ তারিখে ঘোষণা হলো ৬টি চিনিকল বন্ধ করা হবে। কারখানাগুলো আলাদা আলাদা হলেও কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে একই কথা লোকসান। এই বিপুল লোকসানের ভার দেশ আর বহন করতে পারছে না। কিন্তু এই লোকসানের কারণগুলো চিহ্নিত করা হলেও তা দূর করার কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ার কারণ কী? এত কথার মাঝে সেই দায় এবং দায়িত্ব নেওয়ার কথা কিন্তু বলেনি কর্র্তৃপক্ষ (!)। 

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা শুধু একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শব্দ নয়। একটা দেশকে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে বিচার করার মাপকাঠিও বটে। কোনো দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি। অর্থনীতিতে কম্পন বা ঝাঁকুনি লাগলে রাজনীতিও টালমাটাল হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ এ কথা বলে ক্ষমতাসীনরা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরও কড়াকড়িভাবে আরোপ করে; সে দৃষ্টান্ত দেশে এবং বিদেশে আমরা অহরহ দেখছি। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন ও রক্ষা করতে হলে দেশের অর্থনীতিতে কিছু স্থায়ী ভিত্তি লাগে। শুধু বিদেশের বাজারের দিকে তাকিয়ে পণ্য উৎপাদন বা মূল্য সংযোজন কিংবা আমদানি করা পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা যে ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ তা সবাই জানেন। যে সমস্ত দেশের এ ধরনের নির্ভরশীলতা আছে তারা করোনাকালে এই সত্য হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ দৃষ্টান্তের অন্যতম। ইউরোপ-আমেরিকার জনগণ কাপড় কেনা কমিয়ে দিলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮২ শতাংশের দাবিদার তৈরি পোশাকশিল্প যে মুখ থুবড়ে পড়ে, কিংবা ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করলে পেঁয়াজের দাম যে আকাশচুম্বী হয় অথবা চালের বাজারে কী ধরনের চালবাজি হয় তা বাংলাদেশের চেয়ে ভালো কোন দেশ আর বুঝতে পারে? আর ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট যে কত শক্তিশালী তা বুঝতে অসুবিধা অন্তত বাংলাদেশের ভোক্তাদের হওয়ার কথা নয়। আমন মৌসুমেও ২০ লাখ টন চাল আমদানি করতে হচ্ছে, বোঝেন ব্যাপারটা!

পৃথিবীর যে দেশগুলোকে পুঁজিবাদী অর্থেও উন্নত বা শক্তিশালী দেশ বলা হয়, তারাও তাদের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে এক ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখে। জাপানের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। সেখানে এক কেজি চালের দাম বাংলাদেশের টাকায় ৩৮০ টাকার বেশি। কিন্তু জাপান কখনো চিন্তাও করে না যে বাংলাদেশ থেকে কাটারিভোগ চাল আমদানি করবে। ইউরোপে দুধ উৎপাদন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই গরু পালনের জন্য ভর্তুকি দেয় তারা। প্রতিটি গরুর জন্য প্রতিদিন হিসেবে ২.৫ ডলার ভর্তুকি দেওয়া হয়, বাংলাদেশি টাকায় গরুর পেছনে এই ভর্তুকি প্রতি বছরে ৭০ হাজার টাকা। মাথাপিছু দুই ডলারের ওপর দৈনিক আয় হলে নাকি দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠা যায়। সেই হিসেবে ইউরোপের গরু যে ভর্তুকি পায় তা দিয়ে এশিয়া আফ্রিকার মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে যেতে পারত! আমেরিকার গম, ব্রাজিলের চিনি কোথায় ভর্তুকি নেই। বিশ্বের মোট উৎপাদনের অর্ধেকের মতো চিনি উৎপাদনকারী দেশ ব্রাজিল ২.৫ বিলিয়ন ডলার বা বাংলাদেশের টাকায় ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়। ভারত এ বছর ৬০ লাখ টন চিনি রপ্তানি করবে বলে পরিকল্পনা করছে। ভারত সরকার চিনিশিল্পে ৩৫ বিলিয়ন রুপি ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও ভারতের চিনিশিল্পের সঙ্গে যুক্তদের দাবি ছিল আরও বেশি। এই ভর্তুকি দেশের শিল্প রক্ষা, কৃষক রক্ষা, কর্মসংস্থান ও পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন। আর বাংলাদেশের ১৫টি চিনিকল লোকসান করেছে বলা হচ্ছে ৯৭০ কোটি টাকা। দুর্নীতির ছিদ্রপথ বন্ধ হলে এবং সময়মতো আধুনিকায়ন হলে চিনিকলগুলোতে এই লোকসান হতো না এ কথা জোরের সঙ্গেই বলা যায়।  

বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল বৈষম্যমুক্ত স্বনির্ভর অর্থনীতি। অনেকে দুঃখের সঙ্গে ব্যঙ্গ করে বলেন, স্বনির্ভর হবো কী ভাই, দেশটার ওপর শনির ভর চেপেছে। একদিকে মহাসমারোহে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর ঢাক পেটানো হচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের অর্থনীতির স্থায়ী ভিত্তিগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়ার আয়োজন সমাপ্ত করা হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলেই। স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ পেয়েছিল পাটকল, চিনিকল, চা এবং চামড়াশিল্প। স্বাধীনতার ৫০ বছরের মধ্যেই এর সবগুলো ব্যক্তি খাতে তুলে দেওয়ার কাজ শেষ করা হচ্ছে। গত জুনে ২৫টি রাষ্ট্রীয় পাটকল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে ১৫টি চিনিকলের (যার ৩টি ব্রিটিশ আমলে, ৯টি পাকিস্তান আমলে এবং ৩টি বাংলাদেশ আমলে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল) মধ্যে প্রথম দফায় কুষ্টিয়া, পাবনা, রংপুর, শ্যামপুর, সেতাবগঞ্জ ও পঞ্চগড় এই ৬টি চিনিকলের মৃত্যুপরোয়ানায় স্বাক্ষর করেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলতে পছন্দ করা আওয়ামী লীগ সরকার। এর ফলে বেকার হয়ে পড়বে স্থায়ী, অস্থায়ী, মৌসুমি মিলে ২৫ হাজার শ্রমিক। ক্ষতিগ্রস্ত হবে ৫ লাখ আখচাষি এবং পরোক্ষভাবে যুক্ত ৫০ লাখ মানুষ।

সেই পুরনো অজুহাত ও নতুনভাবে লুটপাট অব্যাহত আছে। চিনিকল বন্ধের যুক্তি হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে হাজির করা হচ্ছে সেই পুরনো অজুহাত লোকসান। কিন্তু লোকসানের কারণসমূহ দূর করার কথা একবারও বলা হচ্ছে না। লোকসানের কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অপচয় ও অদক্ষতা। এর কোনোটার সঙ্গেই আখচাষি, চিনিকল শ্রমিক ও দেশবাসী যুক্ত নন। একদিকে লুটপাট করে কারখানাকে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হচ্ছে আবার লোকসানের অজুহাতে চিনিকলের ১৯ হাজার একর জমি ও ২৫ হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি অতীতের বিরাষ্ট্রীয়করণকৃত কারখানাগুলোর মতো কিছু বিশেষ ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়ার আয়োজন চলছে। ফলে পরিণতি হবে আগের কারখানাগুলোর মতোই। অর্থাৎ শ্রমিক হারাবে কাজ, জনগণ হারাবে সম্পদ আর প্রায় বিনামূল্যে রাষ্ট্রীয় সম্পদের মালিক হবে ক্ষমতাসীনদের অনুগ্রহপুষ্ট একদল লুটপাটকারী।

বাংলাদেশের আবাদি জমির ২ শতাংশ এলাকা অর্থাৎ ১ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে এবং প্রায় ২০টির বেশি জেলায় আখের চাষ হয়। গত সাত বছরে বাংলাদেশ সুগার ক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট আখের ৬টি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছে। যে জাতগুলোর উৎপাদন গড়ে ১০০ টনের বেশি, যা বর্তমানের প্রায় দ্বিগুণ। এতে চিনি আহরণের পরিমাণ ১২ শতাংশের বেশি, বর্তমানে যা ৭-৮ শতাংশ মাত্র। দীর্ঘদিন থেকে বলা হচ্ছে যে, আখ থেকে চিনি আহরণের পরিমাণ বাড়লে চিনি উৎপাদন লাভজনক করা সম্ভব। এখন দেশেই উদ্ভাবিত উন্নত জাত কাজে লাগাবে কি, কারখানাই বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। পরিবেশের বিবেচনাতেও আখ চাষ খুব গুরুত্ব বহন করে। উদ্ভিদতাত্ত্বিক বিবেচনায় আখকে বলা হয় সি-৪ উদ্ভিদ। যারা বাতাস থেকে বেশি পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে পরিবেশকে নির্মল রাখে। কিন্তু মুনাফার কাছে যেখানে মানুষ গুরুত্বহীন, সেখানে পরিবেশের কথা ভাববে কে? আখ যেহেতু ১০-১২ মাসের ফসল, তাই আখের সঙ্গে সাথী ফসল হিসেবে আলু, মিষ্টি আলু, বাদাম ও শীতকালীন শাকসবজি চাষ করা যায়। এসব বিবেচনায় আখের গুরুত্ব যা হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি।

বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে আধুনিকায়ন করলে চিনিকল লাভজনক করা সম্ভব ছিল। দেশে চিনির চাহিদা প্রায় ২০ লাখ টন এবং তা প্রতি বছর বাড়ছে। রাষ্ট্রীয় চিনিকলগুলো উৎপাদন সক্ষমতা ২ লাখ ১০ হাজার টন, ফলে প্রয়োজন চিনির উৎপাদন আরও বাড়ানো। কিন্তু উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণই করা হয় মাত্র ৮২ হাজার টন। সেই চিনিও আবার অবিক্রীত থাকে। ৫টি বেসরকারি চিনি পরিশোধন কারখানা বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত চিনি বিদেশ থেকে আমদানি করে তা পরিশোধন করে বাজার সয়লাব করে ফেলছে। চিনি-বর্জ্য নদীতে ফেলে এরা ধ্বংস করছে পরিবেশ এবং দেশকে বিদেশি চিনির ওপর নির্ভরশীল করে ফেলছে। দেশের স্বার্থের কথা ভাবলে চিনিকলগুলো আধুনিকায়ন করা, চিনির উপজাত চিটাগুড়, ছোবড়া ও প্রেসমাডকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে অনেক সহায়ক শিল্প গড়ে তোলা যেত। কাগজ, অ্যালকোহল, জৈব সার, স্যানিটাইজার উৎপাদন এবং আখের ছোবড়া ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেত। কিন্তু জনগণের সম্পদ লুটপাট করাই যাদের লক্ষ্য, তারা কি এসব ভাববে?  জনগণের স্বার্থেই রাষ্ট্রীয় সম্পদ চিনিকল ও পাটকল রক্ষা করা দরকার।

কোনো দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি সে দেশের ভারী শিল্প। কিন্তু একের পর এক সেই শিল্পসমূহ ব্যক্তি খাতে তুলে দিয়ে দেশের শ্রমিক-কৃষক ও সাধারণ মানুষকে পুঁজিপতিদের কাছে জিম্মি করে ফেলা হচ্ছে, যাদের কাছে দেশ পরিবেশ, শ্রমিক, কৃষক বড় কথা নয়, মুনাফাই মুখ্য। কিন্তু দেশবাসীর ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত কৃষিভিত্তিক ভারী শিল্প এভাবে বন্ধ করে দিয়ে রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা যাবে না। তাই রাষ্ট্রীয় চিনিকল বন্ধ নয়, চালু ও আধুনিকায়ন করা, লোকসানের জন্য দায়ী ভুলনীতি পরিহার করা এবং দুর্নীতিবাজ আমলাদের শাস্তি দেওয়ার কাজটা ছিল জরুরি। তা না করে কারখানা বন্ধ এবং বিক্রি করার অর্থ দুর্নীতিকে উৎসাহিত করা। একদা সাম্রাজ্যবাদী শোষণে জর্জরিত কিউবার লোককবিদের গাওয়া গানের একটি চরণ ছিল ‘নোনতা ঘাম ও চোখের জলে আখ তুমি কেন এত মিষ্টি হলে?’ আমাদের চিনিকল বন্ধ হওয়ার পর আমরা কী গাইব?

লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

rratan.spb@gmail.com