স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ প্রস্তাবিত কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধিত প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে প্রস্তাবটি অনুমোদন না দিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি এবং প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য সচিব প্রকল্পের বিস্তারিত বলতে গেলে প্রধানমন্ত্রী তাকে থামিয়ে দেন। তিনি বলেন, প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে না পারার পেছনে কারা কারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে বিভাগীয় পর্যায়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।
এদিকে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতের সক্ষমতা বাড়াতে ভ্যাকসিন কেনা ও ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য আরও ৫ হাজার ৬৫৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকার অনুমোদন দিয়েছে একনেক। ‘কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্রিপারেডেন্স’ প্রকল্পের জন্য গতকাল রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে এনইসি সভাকক্ষে একনেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এ অর্থ অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে এ প্রকল্পে সরকারের বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৭৮৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। শুধুমাত্র টিকা আমদানিতে ৪ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি সভায় যুক্ত হন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য উপস্থাপন করে বৈঠক-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ প্রকল্পের ব্যাপারে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) তদন্ত করে প্রতিবেদন দেবে। একনেকের পরের সভায় তদন্তের প্রতিবেদন দিতে হবে। আইএমইডি সচিবের নেতৃত্বে প্রতিবেদনটি তৈরির নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে ২০১৮ সালে এ প্রকল্পটি নিয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এজন্য প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পের মেয়াদ এবং ব্যয় বাড়ানোর কারণ ও ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ প্রকল্পের মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ২৭৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। বাস্তবায়ন মেয়াদ ছিল জানুয়ারি ২০১২ থেকে ডিসেম্বর ২০১৪ সাল পর্যন্ত। কিন্তু গত আট বছরে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদনের পর দুই দফা মেয়াদ বাড়িয়ে বাস্তবায়ন মেয়াদ ২০১৬ সাল পর্যন্ত করা হয়। এরপর প্রথম সংশোধন করা হয়। প্রথম সংশোধনীর পরও প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়িয়ে ডিসেম্বর ২০২০ সাল পর্যন্ত করা হয়। গতকাল দ্বিতীয় সংশোধনের জন্য একনেক সভায় উপস্থাপন করা হলে প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পটি ফিরিয়ে দেন। এরই মধ্যে গত আট বছরে প্রকল্পটির ব্যয় তিনগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য চিকিৎসা শিক্ষার জন্য অবকাঠামো নির্মাণ, চিকিৎসক তৈরির মাধ্যমে চিকিৎসক এবং জনসাধারণের আনুপাতিক হার যৌক্তিক করা, চিকিৎসা শিক্ষাকে বিকেন্দ্রীকরণ করা, প্রান্তিক জেলায় তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা, চিকিৎসা শিক্ষার চাহিদা পূরণ করা, হাসপাতালকে ক্লিনিক্যাল এবং ব্যবহারিক পরীক্ষাগার হিসেবে মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের জন্য উপযোগী করা, কুষ্টিয়া ও তার পার্শ্ববর্তী জেলার জনগণের জন্য আধুনিক চিকিৎসাসেবা দেওয়া, উপযুক্ত এবং আধুনিক চিকিৎসা সুবিধার উপযোগী পরিকাঠামো তৈরি করা, বিশেষ পরিষেবা দেওয়ার মাধ্যমে বিনামূল্যে কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হার হ্রাস নিশ্চিত করা, চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে মানুষের আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি এবং চিকিৎসক ও অন্যান্য পেশার জনগণের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
বৈঠকে ‘কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্রিপারেডেন্স’ প্রকল্পসহ ছয়টি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী। তিনি বলেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৯ হাজার ৫৬৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে পাওয়া যাবে ৩ হাজার ৮৬৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে ৫ হাজার ৭০১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। অনুমোদিত প্রকল্পের মধ্যে তিনটি নতুন প্রকল্প রয়েছে এবং বাকি তিনটি সংশোধিত প্রকল্প।
‘কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্রিপারেডেন্স’ মূল প্রকল্পের ব্যয় ছিল ১ হাজার ১২৭ কোটি ৫১ লাখ, সেটা এখন ৫ হাজার ৬৫৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা বৃদ্ধি করে সংশোধিত প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৭৮৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রকল্পের আওতায় কভিড-১৯ ভ্যাকসিন ক্রয়, সংরক্ষণ ও বিতরণের পাশাপাশি আরটি-পিসিআর কিট, অ্যান্টিজেন কিট ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী কেনা হবে। এ ছাড়া ২৭টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পিসিআর মেশিনসহ ল্যাব স্থাপিত হবে।
তিনি আরও জানান, ১০ শয্যাবিশিষ্ট আইসিইউ ও ৪৩ জেলার সদর হাসপাতালে ২০ শয্যার আইসোলেশন ইউনিট স্থাপন করা হবে। প্রকল্পের অর্থে দেশের পাঁচটি ইমিগ্রেশনে সাতটি মেডিকেল স্ক্রিনিং ইউনিট স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে তিনটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এবং চট্টগ্রাম শাহ আমানত, সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দরে একটি করে ইউনিট স্থাপন করবে সরকার। এর পাশাপাশি ১০টি জেলায় মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থপনা প্ল্যান্ট স্থাপন করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সফলভাবে কভিড মহামারী মোকাবিলাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের পর্যাপ্ত তহবিল রয়েছে। কর্র্তৃপক্ষ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ভ্যাকসিন সংরক্ষণ নিশ্চিত করেছে। আমরা প্রস্তুত আছি এবং আশা করি সময়মতো ভ্যাকসিন পেয়ে যাব।’ ভ্যাকসিনের মূল্য নিয়ে কোথাও যেন কোনো অব্যবস্থাপনা তৈরি না হয় এজন্য সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করা হবে বলেও জানান তিনি।
একনেকে অনুমোদিত অন্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে জেলা পর্যায়ে আধুনিক তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১০৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের জন্য বাস্তবায়ন খরচ ধরা হয়েছে ১৫৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগকালে অনুসন্ধান, উদ্ধার অভিযান পরিচালনা এবং জরুরি যোগাযোগের জন্য যন্ত্রপাতি সংগ্রহ প্রকল্পে ব্যয় হবে ২ হাজার ২৭৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। এছাড়া জেলা মহাসড়কগুলো যথাযথ মান ও যথাযথ প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১২২ কোটি ৮২ লাখ টাকা এবং চিটাগাং সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্পের বাস্তবায়ন খরচ হবে ২৪৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
করোনার ভ্যাকসিন পাবেন যারা : দেশের আপামর জনগোষ্ঠীর মধ্যে কারা করোনার টিকা পাবেন তা তুলে ধরে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এরই মধ্যে কিছু ব্যক্তি-শ্রেণির নাম এসেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। এর বাইরে পরিকল্পনা কমিশনও কিছু শ্রেণির জনগোষ্ঠীর নাম প্রস্তাব করেছে। প্রস্তাবিত জনগোষ্ঠী হলেন কভিড-১৯ সংক্রমণের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিভিন্ন স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মজীবী, সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী, জনপ্রতিনিধি, জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মী, ধর্মীয় প্রতিনিধি, বন্দরগুলোতে দায়িত্বরত কর্মী, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত কর্মী, ব্যাংককর্মী, স্বল্প বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাহীন জনগোষ্ঠী, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের যারা কভিডের সঙ্গে সম্পৃক্ত, শ্রমঘন প্রতিষ্ঠানের কর্মী (গার্মেন্ট), পরিবহন শ্রমিক, শ্রমঘন হাটবাজার-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মী, এতিমখানা এবং বিদেশগামী ও বিদেশফেরত সব ব্যক্তি।’