বাঙালি গদ্যলেখকের সামর্থ্য ও শ্রম

সাধারণত যেমন বৈঠকি মেজাজে অনায়াসে লিখে থাকেন সৈয়দ মুজতবা আলী, একটি ব্যক্তিগত রম্যগদ্যে লিখেছেন সেভাবেই, কিন্তু বাক্যটির ভেতরে লুকানো খেদটুকু আর চাপা থাকেনি। যে প্রসঙ্গে লিখেছেন, সেখানে ওই খেদ উগরে দেওয়ার যথেষ্ট কারণ হয়তো ছিল ও আছে। তার চেয়েও বড় কারণ, সৈয়দ মুজতবা আলী তার কিংবদন্তিতুল্য মেধায় গোটা বাংলা গদ্যসাহিত্যের খোলনলচে একেবারে নিজের সামনেই দেখতেন। ফলে যখন লেখেন, বাঙালি লেখকের প্রতিভায় তিনি খামতি পান না, খামতি যা আছে তা পরিশ্রমে! পড়ার পরে, এই বাক্যটি ওই ছোট্ট গদ্যলেখাটির একেবারে ভেতরে হঠাৎ প্রবিষ্ট হলেও দ্বিতীয়বার সেখানে নজর যেতে বাধ্য।

কথাটা তিনি লিখেছিলেন ফরাসি গদ্য নিয়ে হঠাৎ দু-ছত্র মন্তব্যের মাঝখানে। ফরাসি লেখকরা গদ্যকে শিল্পের যে পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, তা কাব্য পঙ্্ক্তির জুড়িই বলা যায়, আর সেটি ঘটেছে ওই গদ্যভাষা নির্মাণে তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে। বাঙালি গদ্যলেখকরা কখনই অমন অক্লান্ত পরিশ্রমের ভেতর দিয়ে যান না। মুজতবা সরাসরিই জানিয়েছেন সে কথা। তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? প্রতিভা থাকলেই সাহিত্যে চূড়ান্ত নির্মিতির স্পর্শ ঘটে না। সে যাত্রায় সর্বোচ্চ পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়। কিন্তু পরিশ্রম তো যেকোনো লেখককেই করতে হয়, যেকোনো ভাষাতেই। কিন্তু মুজতবা আলী শুধু তাই বলেননি, ইঙ্গিত দিয়েছেন গদ্যের শ্রেষ্ঠতম সৌন্দর্যকে আবিষ্কারে প্রয়োজন বাড়তি পরিশ্রমের। বাঙালি লেখকের সেখানেই খামতি! কথাসাহিত্য ভাষানির্মিত শিল্প, কাহিনী সেখানে এক অর্থে গৌণই।

এখানে কবুল করা ভালো, যেকোনো ভাষার গদ্যের সেই সৌন্দর্যটি উপলব্ধির জন্য পয়লা প্রয়োজন সেই ভাষাটা খুব ভালোভাবে জানা। অনুবাদে সে সৌন্দর্য প্রায়শ থাকে না। থাকলেও এর অনেকখানিক কৃতিত্ব অনুবাদকের। সৈয়দ মুজতবা আলীর সেই সুযোগ ছিল। ফরাসি-জর্মনের মতো ইউরোপীয় ভাষা তিনি ভালো জানতেন। ফরাসি ভাষার প্রধান গদ্যলেখকদের বই তিনি মূল ভাষাতেই পড়েছেন, ইংরেজি অনুবাদে নয়। তাই হয়তো, হয়তো কেন, সেই জন্য স্তাদাল, ফ্লোবেয়ার, বালজাকের গদ্যের ওই সৌন্দর্যের সঙ্গে বাংলা গদ্যের তুলনা করতে পেরেছেন। জানি না কেন, ইংরাজ আর ইংরেজি গদ্যের লেখাপত্তরের প্রতি তার ভক্তিশ্রদ্ধা সব সময়ই একটু কম ছিল। তাদের চরের জাত বলে হামেশা গালও দিয়েছেন কোনো কোনো লেখায়। এমনকি ব্রিটিশ স্থাপত্যের সঙ্গে ভারতীয় স্থাপত্যের তুলনা করতে গিয়ে এক জায়গায় লিখেছেন : তাজমহল দেখলে মনে হয় এই উড়ে যাবে আর ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখলে মনে হয় এখনই ডুববে। এমন উদাহরণ সৈয়দ মুজতবা আলীর পক্ষেই দেওয়া সম্ভব। রসিকতায়ও যে তীব্র হুল থাকতে পারে, তা তার যেকোনো লেখায় পাওয়া যায় প্রায় প্রতিটি পঙ্ক্তিতে। সেখানে রেয়াত দেওয়া কাকে বলে তা তিনি জানতেন না। জানাটা তার মতো মানুষের জন্য অস্বাভাবিকই ছিল।

ফলে ফরাসি কথাসাহিত্যিকদের নিরিখে বাঙালি কথাসাহিত্যিকদের সম্পর্কে যে কথা বলেছেন সেটিও ছোটখাটো একটা হুলই। না, খুব ছোটখাটো নয়। বাংলা কথাসাহিত্যের যে ওজন, শরৎচন্দ্র-পরবর্তী লেখককুলে  ভেতরে যারা প্রধানতম লেখক, সবাই তো তার সমকালীনই। বিভূতিভূষণ-তারাশঙ্কর-সতীনাথ আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অবিস্মরণীয় নামগুলো তো আছেই, নেওয়ার মতো আরও নাম সেই প্রজন্মে একেবারে কম ছিল না। সৈয়দ মুজতবা কথাগুলো যখন লিখেছেন, তখন তার প্রজন্মের কথাসাহিত্যিকরা খ্যাতির মধ্য-গগনে। জীবনের শ্রেষ্ঠ লেখাটিও লিখেছেন। দুই-একজনকে মৃত্যু এসে হানা দিয়ে তুলে নিয়ে গেছে। বাকিরা প্রায় প্রত্যেকেই সক্রিয়। কিন্তু মুজতবা কথাটা বলতে পিছপা হননি। কিংবা বলা যায়, হুলটা ফুটিয়েছেন জায়গা মতোই।

কিন্তু এ কথা তো শুধু হুল ফোটানো নয়। গদ্যের ফুল ফোটানোর আকাক্সক্ষার এক তুলনামূলক কথা। যেখানে প্রত্যাশার পারদ মাত্রা ছাড়িয়ে যায়নি, শুধু তুলনাটুকু করেছেন তিনি। তাকি এই জন্য যে, গদ্যসাহিত্য কবিতার পাশাপাশি প্রকৃত শিল্প হয়ে উঠতে, যেটুকু শ্রম ও মজদুরি দাবি করে, তা দিতে কৃপণ বাঙালি কথাসাহিত্যিক? হয়তো তাই। হয়তো তাই যদি হয়, যদি এক বাক্যে তাই বলে দেওয়া যায়, তাহলেও কোথায় যেন সে কথারও একটু খামতি থাকে। অন্তত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি আক্ষেপ এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, এটি বহু ব্যবহৃত তবু প্রাসঙ্গিক : যে ভাষায় একখানা বইয়ের ভালো বলে নাম হলে লেখককে আর কিছুই করতে হয় না। অর্থাৎ, সেই বইখানার বিক্রি এমনই যে তিনি পরের বইটির জন্য নির্ভাবনায় শ্রম দিতে পারেন। সেখানে বাঙালি লেখকের তো চুলোয় হাঁড়ি চড়ে কলমের নিবের ভরসায়। অথবা, অফিসে কলমের কালি ঝরিয়ে তারপর আর গদ্যের সৌন্দর্য নিংড়ানোর জন্য যে শ্রম তা দেওয়ার সুযোগ কোথায়?

একথাও তো একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়। এই বিপরীতের বাস্তবের ভেতর দিয়ে কত কত দিন ধরে চলমান বাংলা কাহিনীগদ্য। আরও কত আরও কত কত দিন ধরে এইভাবে চলবে তাই-বা কে জানে। ফলে, কোথায় যেন এমন পরিশ্রমহীনতার দোষ দেওয়াটাও প্রায় একতরফা হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া কথাসাহিত্যে, এখানে ছোটগল্প বাদ থাক, মুজতবা আলী কথাটা পেড়েছিলেন গুস্তাভ ফ্লোবেয়ারের সূত্রে তিনি উপন্যাসে গদ্যের সৌন্দর্যের কথা বলছেন বলে ধরে নিতে পারি। কিংবা, তাই নেওয়াই যুক্তির। সেদিক দিয়ে গোড়া থেকে বাঙলা উপন্যাসের শিল্পের প্রকরণগত আয়তন তো কোনোভাবেই ফরাসি বা রুশ কিংবা জার্মান উপন্যাসকে মান্য করে নয়। ইংরেজি উপন্যাসের নবিশিকরণ দিয়ে এর শুরু। এমন একখানি পুস্তক রচিত হইবে বঙ্গভাষায়, যাহা পড়িতে ইংরেজি ওরফে আইভান হো (?)-র উপন্যাসের মতন লাগিবে! বাংলা গদ্যে বঙ্কিমচন্দ্রের দক্ষতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। এসব বেশ তত্ত্বগত আলোচনা। এখানে তা পাশে সরিয়ে রাখা উচিত। তবে, এটুকু মনে রাখা যাক, ইংরেজির বদলে ফরাসি কি জার্মান কি রুশ উপন্যাসকে একলব্যের দ্রোণাচার্য মানাও তো কোনো কাজের কাজ হতো না যদি শ্রম দিয়ে তাকে মান্যতা না-দেওয়া যেত। সে ভিন্ন প্রসঙ্গ।

কিন্তু ফরাসি উপন্যাসের গোড়াপত্তন যার হাতে, সেই র‌্যাবেলে থেকে প্রুস্ত পর্যন্ত প্রত্যেকেই ফরাসি গদ্যের সৌন্দর্য নির্মাণের জন্য যে সময় পেয়েছেন, মাঝে যে কয়েকটি শতাব্দ বহমান, আর একই সঙ্গে তাদের গদ্যভাষার সৌন্দর্য আবিষ্কারের যে আকাক্সক্ষা সেটি কি কোনোকালে বাংলাকাহিনী গদ্যের অর্থাৎ উপন্যাসের ছিল না। রবীন্দ্রনাথকে ভুলে যাচ্ছি না।

সৈয়দ মুজতবা আলী নাম নিয়েছিলেন ফ্লোবেয়ারের, অন্য কেউ হয়তো বলতেন, মার্সেল প্রুস্তের কথা, বালজাক হয়তো অনুল্লেখ্যই থাকবে। এর একটু পাশ কাটিয়ে যদি রুশিদের কাছে যাই। হয়তো দেখা যাবে মুজতবা আলী-কথিত ওই সৌন্দর্যের ঘাটতি সেখানে আছে। কিন্তু অদ্ভুত দুই বৈপরীত্যও তো একই সঙ্গে বিকাশমান। ফেলানো কাগজের টুকরো, লন্ড্রির স্লিপ কিংবা যেকোনো আকারে কাগজে একটি উপন্যাস লিখেছেন ফিয়োদর দস্তইয়েভস্কি। তাতেই লিখিত হতে পারে বঞ্চিত লঞ্চিতর মতো লেখা, কিংবা আরও কোনো কোনোটি। সবই তো একবারেই লেখা; একটিই খসড়া! অন্তত যতদিন না আনা দস্তইয়েভস্কি তার লেখা টুকবার বা শ্রুতিলিখনের দায়িত্ব নিচ্ছেন। ওদিকে মহামতি ল্যেভ তলস্তয়ের কায়দা তো একেবারেই ভিন্ন। শোনা যায়, চৌদ্দশো পৃষ্ঠার যুদ্ধ ও শান্তির নাকি পাঁচটি খসড়া! কী অকহতব্য পরিশ্রম! যদিও তলস্তয়ের গদ্যে ওই সৌন্দর্যের খোঁজ কেউ করেন না। সেখানে জীবন মানবিক সব আবেদনে এমনই কোলাহলমুখর, উপন্যাস যে ওই তানে লিখিত হতে পারে, গদ্য-দুনিয়ার তা যেন অজানাই ছিল।

তাহলে, দস্তইয়েভস্কির একটি খসড়া আর তলস্তয়ের পাঁচটি খসড়া, এও তো এক ব্যতিক্রমেরই চিহ্ন। তলস্তয় তো ওই পাঁচটি খসড়ায় গদ্যের সেই সৌন্দর্য তালাশে নিয়োজিত ছিলেন না। হতে পারে, খুব ভয়ে ভয়ে লিখছি, তখনো রুশ কাহিনীগদ্য ফরাসিদের মতো কবিতার ভাষার সঙ্গে একই সারিতে দাঁড়ানোর ক্ষমতার অংশ নয়! নাকি রুশিরা সেসব তোয়াক্কার ঊর্ধ্বে?

সৈয়দ মুজতবা আলীর কথাগুলোর যুক্তির পাশে, এমন আরও কত যুক্তি, চাইলে বালকোচিত প্রণোদনায় দাঁড় করানো যায়। তাতে তার কথার সার কিন্তু একটুও কমে না। তিনি প্রায় একটিমাত্র বাক্যে যা বোঝাতে চেয়েছেন, সেটির কোনো অন্য অর্থও করা চলে না। বরং, ওই বিবেচনাবোধটুকু বাংলা উপন্যাসের ভাষায় খানিকটা প্রযুক্ত হলে, তা হতো বাংলা ভাষারই অর্জন!

লেখক কথাসাহিত্যিক

prasantamridha@gmail.com