চট্টগ্রাম নগরীর রহমতগঞ্জে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত যাত্রামোহন সেনগুপ্তের বাড়ির দখল ও অবস্থানের ওপর স্থিতাবস্থা (যে অবস্থায় আছে সেভাবেই থাকবে) জারি করেছে উচ্চ আদালত। ‘শিশুবাগ স্কুল’ হিসেবে পরিচিত ওই বাড়িটি রক্ষায় জনস্বার্থে করা একটি রিট আবেদনের ওপর গতকাল বুধবার প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ স্থিতাবস্থা জারি করে।
যাত্রামোহন সেনগুপ্তের ঐতিহাসিক বাড়িটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা হিসেবে সংরক্ষণ করার ব্যর্থতাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং ওই স্থাপনাকে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা হিসেবে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কেন নির্দেশনা দেওয়া হবে না তা জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার, সংশ্লিষ্ট থানার ওসি (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) ও স্কুল কমিটিসহ ছয় বিবাদীকে চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে আদেশে।
আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী ব্যারিস্টার হাসান এমএম আজিম। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) তুষার কান্তি রায়। ব্যারিস্টার হাসান এমএস আজিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক এ বাড়িটির ওপর স্থিতাবস্থা জারিসহ সরকারের প্রতি রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট। অর্থাৎ বাড়িটি যে অবস্থায় ছিল, সেই অবস্থাতেই থাকবে। এটি দখল কিংবা ভাঙা যাবে না।’ হাইকোর্ট এ বিষয়ে শুনানির জন্য আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য রেখেছে বলেও জানান এ আইনজীবী।
দৈনিক আজাদী পত্রিকায় গত ৫ জানুয়ারি প্রকাশিত ‘শিশুবাগ স্কুলের ভবন ভাঙ্গা নিয়ে উত্তেজনা’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে গতকাল রিট আবেদনটি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাসুদ আলম চৌধুরী। আদালতের আদেশের কথা বলে গত সোমবার এক ব্যক্তি বুলডোজার নিয়ে এসে বাড়িটি ভেঙে ফেলতে উদ্যত হন। এ সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্তের নেতৃত্বে স্থানীয়দের প্রতিরোধের মুখে বাড়িটি রক্ষা পায়।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতীয় কংগ্রেস নেতা ও আইনজীবী যাত্রামোহন সেনগুপ্ত এ বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন। তার ছেলে ব্যারিস্টার যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত ছিলেন সর্বভারতীয় কংগ্রেসের নেতা। তিনি কলকাতার মেয়রও হয়েছিলেন। ইংরেজ স্ত্রী নেলি সেনগুপ্তাকে নিয়ে কিছুদিন ভবনটিতে ছিলেন তিনি। মহাত্মা গান্ধী, সুভাষ চন্দ্র বসু, শরৎ বসু, মোহাম্মদ আলী ও শওকত আলীসহ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন সময় এ বাড়িতে এসেছিলেন।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবীরাও এ বাড়ির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। সূর্য সেন, অনন্ত সিংহ, অম্বিকা চক্রবর্তীর হয়ে মামলা লড়েছিলেন যতীন্দ্রমোহন। এতে ব্রিটিশ শাসকদের রোষানলে পড়ে কারাগারে যেতে হয় তাকে। ১৯৩৩ সালে কারাগারেই মৃত্যুবরণ করেন তিনি। এরপর তার স্ত্রী নেলি সেনগুপ্তা ১৯৭০ সাল পর্যন্ত এ বাড়িটিতে ছিলেন। পরে তিনি চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়ে ফিরে এসে দেখতে পান বাড়িটি বেদখল হয়ে গেছে। ১৯ গন্ডা এক কড়া পরিমাণ জমিটি পরে শত্রু সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। এরপর জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে শামসুদ্দিন মো. ইছহাক নামে এক ব্যক্তি জমিটি ইজারা নিয়ে সেখানে ‘বাংলা কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৫ সালের পর নাম বদলে সেই ভবনে ‘শিশুবাগ স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ইছহাকের সন্তানরা স্কুলটি পরিচালনা করছেন।