অভিনেত্রী আশা চৌধুরী নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে রহস্য বাড়ছে। আশার পরিবার এ মৃত্যুকে পরিকল্পিত বলে সন্দেহ করছে। ঘটনার সময় আশার সঙ্গে থাকা মোটরসাইকেলচালক শামীম আহম্মেদকে নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার রাতে আশা ২০ মিনিটের মধ্যে বাসায় ফেরার কথা পরিবারের সদস্যদের জানালেও আড়াই ঘণ্টা পর কীভাবে টেকনিক্যাল মোড়ে গেলেন, তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ধূম্রজাল। পরিবারের ধারণা, মৃত্যুর আগে আশাকে মাদকজাতীয় কিছু খাওয়ানো হতে পারে। ময়নাতদন্ত শেষে ছোট পর্দার এই অভিনেত্রীকে গত মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে দাফন করা হয়েছে।
আশার মৃত্যুর ঘটনায় তাকে বহনকারী মোটরসাইকেলটির চালকসহ অজ্ঞাতপরিচয়দের বিরুদ্ধে রাজধানীর দারুসসালাম থানায় মামলা করেছেন আশার বাবা। দারুস সালাম থানার ওসি তোফায়েল আহম্মেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আশার পরিবারের করা মামলায় মোটরসাইকেলচালক শামীমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, একটি ট্রাক তাদের পেছন থেকে ধাক্কা দিয়েছে। তবে ট্রাকটি এখনো শনাক্ত করা যায়নি।
ঘটনার রাতে আশা ২০ মিনিটের মধ্যে বাসায় ফেরার কথা জানিয়ে পরিবারের সদস্যদের ফোন দেওয়ার পর দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা কোথায় ছিলেন, তা জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘তদন্ত শেষে বিস্তারিত বলা যাবে।’
আশার পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, ৪ জানুয়ারি রাত ১১টার দিকে আশা তার মাকে ফোনে জানান যে বনানীতে আছেন। ২০ মিনিটের মধ্যে বাসায় ফিরবেন। আশা ফোন দেওয়ার ৫ মিনিট পরে তার বাবা আবু কালাম আবারও তাকে ফোন দিয়ে তাদের নতুন বাসার কাজের ব্যাপারে সর্বশেষ কথা বলেন। বনানী থেকে কালশী রোড হয়ে আশার মিরপুর রূপনগর আবাসিক এলাকার বাসায় ফেরার কথা ছিল রাত ১১টার মধ্যে। কিন্তু রাত প্রায় ২টার দিকে মোটরসাইকেলের চালক শামীম আহমেদ আশার মাকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘আন্টি, একটু টেকনিক্যাল মোড়ে আসেন।’ কিছুক্ষণ পরে তিনি আবার ফোন দিয়ে বলেন, ‘আন্টি, আশা মারা গেছে।’
আশার মামা দুলাল বলেন, ‘বাইকচালক শামীম আহমেদ পুলিশকে তিন রকম কথা বলেছেন। তাদের ফেরার কথা ছিল কালশী রোড হয়ে। টেকনিক্যাল মোড়ে তিনি কীভাবে গেলেন? এই প্রশ্ন করলে শামীম জানান, পথ ভুলে গিয়েছিলেন। আশা ঢাকার প্রায় সব রাস্তাই চিনত। তাহলে কীভাবে পথ ভুল হলো? তা ছাড়া বাইকচালক পুলিশকে বলেছেন, রোড পার হতে গিয়ে আশা দুর্ঘটনায় মারা গেছে। কিন্তু সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, বাইকে থাকা অবস্থায় ট্রাকের ধাক্কায় আশা রাস্তায় পড়ে যায়। তার মাথার ওপর দিয়ে ট্রাকের চাকা চলে যায়।’
দুলাল আরও বলেন, ‘আমাদের সন্দেহ শামীমই নেশাজাতীয় কিছু খাইয়েছিল আশাকে। আশা সুস্থ থাকলে এমন ঘটনা ঘটত না। আশা রাস্তায় ছিটকে যাওয়ার পর সে একবারও ধরেনি। শামীম আড়াই ঘণ্টা কীভাবে রাস্তায় ঘুরেছেন, তার সঠিক উত্তর দিতে পারেননি। সন্দেহ হওয়ায় তাকে প্রধান আসামি ও অজ্ঞাত ট্রাকচালকের নামে গত মঙ্গলবার রাতে মামলা করা হয়েছে। আশার বাসায় ফেরার পথে আড়াই ঘণ্টার হিসাব না মেলায় শামীমকে প্রধান অভিযুক্ত করা হয়েছে।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের দারুসসালাম জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) মিজানুর রহমান জানান, আশার বাবা আবু কালাম বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন। মামলায় মোটরসাইকেলের চালক মো. শামীম আহমেদকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্ত শামীম অভিনেত্রী আশা চৌধুরীর পরিবারের ৬ থেকে ৭ বছরের পরিচিত। তাকে সন্দেহ হওয়ায় অভিনেত্রীর পরিবার শামীমসহ সড়ক আইনের ১০৫ ধারায় অজ্ঞাতপরিচয় আরও চারজনকে আসামি করেছে।
এসি মিজানুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা মূল ঘটনা উদঘাটন করে অপরাধীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।’
জানা গেছে, চার বোনের মধ্যে আশা চৌধুরী সবার বড়। রাজধানীর বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজিতে (বিইউবিটি) আইন বিভাগে সপ্তম সেমিস্টারে পড়াশোনা করতেন তিনি। প্রায় চার বছর আগে তিনি অভিনয় জগতে আসেন। নাটকে অভিনয়, অনুষ্ঠান উপস্থাপনা ছাড়াও তিনি বিজ্ঞাপন ও গানের মডেল হয়েছেন। অভিনয়কেই পেশা হিসেবে বেছে নিতে চেয়েছিলেন তিনি। আশার স্বপ্ন ছিল, তিনি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করবেন। অভিনয়ে দক্ষতার কারণে মারা যাওয়ার দুদিন আগে রুমান রুনির একক নাটক ‘দ্য রিভেঞ্জ’-এ সেই সুযোগ তিনি পেয়েও যান। সেই নাটকে গত শনিবার সর্বশেষ ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন আশা। প্রধান চরিত্রের অভিনেত্রী হিসেবে টানা এক সপ্তাহ বেশ পরিশ্রম করেছেন। নিজে থেকেই সহশিল্পী সালাহউদ্দিল লাভলু এবং আনিসুর রহমান মিলনের সঙ্গে গল্প নিয়ে কথা বলেছিলেন।
সম্প্রতি বড় পর্দায়ও নাম লিখিয়েছিলেন আশা। তার অভিনীত ছবিটির নাম ‘বাবার মেয়ে’। প্রচারের অপেক্ষায় আছে তার অভিনীত একাধিক নাটক ও টেলিছবি। হাতেও ছিল একাধিক নাটকের শ্যুটিং। এর আগে জাহিদ হাসানের সঙ্গে ‘ওল্ড ইজ গোল্ড’ নাটকে অভিনয় করেছেন আশা চৌধুরী।