গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থানার জলিরপাড় এলাকার ব্যবসায়ী মঙ্গল সরদার হত্যার নেপথ্যে ছিল ৩০ লাখ টাকা। মঙ্গল সরদারের শ্যালক ক্রিটি এই ৩০ লাখ টাকা পেতেন অটো রাইচ মিল ব্যবসায়ী আল আমিনের কাছে। ক্রিটি ভারত যাওয়ার পর দুলাভাই মঙ্গল সরদারের মাধ্যমে টাকার জন্য চাপ দেয় আল আমিনকে। এই টাকা না দিতেই আল আমিন তার রাইচ মিলে বসেই হত্যার পরিকল্পনা করে। ঘটনার দিন মঙ্গল সরদারকে নিয়ে একসঙ্গে চা খায় তারা। পরদিন ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয় মঙ্গল সরদারের লাশ। এ ঘটনায় মামলা হলেও খুনিদের বাঁচাতে স্থানীয় প্রভাবশালীরা তোড়জোড় চালানোর ফলে মামলাটি প্রথম থেকেই তদন্ত করতে বেগ পেতে হয় পিবিআইকে।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) গোপালগঞ্জ জেলার তদন্তে উঠে এসেছে হত্যাকাণ্ডের পেছনের নানা তথ্য। ১ জানুয়ারি হত্যাকা-ে জড়িত কালাম শিকদার (৫২), মো. লিটন শেখ ওরফে লিটু (৫২), আকবর শেখ (৪৮), ও মুশিয়ার শেখ (৫৮)। তাদের দুজন ঘটনার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছেন। তবে মূল পরিকল্পনাকারী আল আমিন ও সুশান্তকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পিবিআই।
গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর দুপুর থেকে নিখোঁজ ছিলেন মঙ্গল সরদার। পরদিন দুপুরে দক্ষিণ জলিরপাড় ধানক্ষেত ও হলুদক্ষেত থেকে মঙ্গল সরদারের লাশ হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর এসআই মো. আল আমিন শেখ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। নিরীহ প্রকৃতির মানুষ মঙ্গল সরদারকে হত্যার পর খুনিদের গ্রেপ্তারে বেগ পেতে হয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা তাদের প্রশ্রয় দিয়েছে। এ ছাড়া মূল পরিকল্পনাকারীর ভাই স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়্যারম্যান হওয়ায় ব্যাপকভাবে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে। খুব দ্রুত অন্যদেরও গ্রেপ্তার করা হবে।’
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, মূল অভিযুক্ত আল আমিন। তার ভাই স্থানীয় চেয়ারম্যান হওয়ায় মামলাটিকে প্রভাবিত করেছেন। এ ছাড়া অভিযুক্ত কালাম শিকদারসহ অন্যদের স্থানীয় প্রভাবশালীরা প্রশ্রয় দিয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম মাহমুদ খান ওরফে কুটি খান। তিনি কালামের পরিবারের কাছ থেকে এক লাখ টাকা নেন মামলা থেকে বাঁচানোর জন্য।
তবে মাহমুদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কালাম নির্দোষ জানিয়ে তার পরিবার মামলার খরচের জন্য এক লাখ টাকা দিয়েছিল। পরে সেই টাকা তাদের ফেরত দিয়েছি।
ক্রিটি একই এলাকার সুশান্তের স্ত্রীকে নিয়ে ভারত পালিয়ে যাওয়ার পর আল আমিনের কাছে ওই ৩০ লাখ টাকা দাবি করে আসছিলেন মঙ্গল সরদার।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গল সরদার জলিরপাড় বাজারে কাঁচামালের ব্যবসা করতেন। মঙ্গলের শ্যালক ক্রিটিও ওই বাজারে মিষ্টির দোকান করতেন। নগদ কিছু টাকা জমা হওয়ায় ক্রিটি একটি ট্রাক কেনার জন্য আল আমিনকে ৩০ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। আল আমিন ওই টাকা তার অটো রাইচ মিলের কাজে লাগায়। অভিযুক্ত আল আমিন ক্রিটির ওই টাকা দিয়ে তার ট্রাক কিনে দেয়নি এবং টাকাও ফেরত দেয়নি।
ভারতে যাওয়ার আগে ক্রিটি আল আমিনকে পাওনা টাকা তার দুলাভাই মঙ্গল সরদারকে দিতে বলে যায়। কিন্তু আল আমিন মঙ্গল সরদারকে কোনো টাকা দেয়নি। মঙ্গল সরদার বারবার টাকার জন্য আল আমিনকে তাগাদা দেন। এদিকে সুশান্তের স্ত্রীকে ক্রিটি ভাগিয়ে নিয়ে ভারতে চলে যাওয়ার বিষয়ে মঙ্গল সরদার ক্রিটিকে সহযোগিতা করায় সুশান্ত মঙ্গলের প্রতি ক্ষিপ্ত ছিল। আল আমিন এবং সুশান্ত উভয়ে মঙ্গল সরদারকে হত্যা করার জন্য একাধিকবার পরিকল্পনা করে। ঘটনার দিন পরিকল্পনা অনুযায়ী আল আমিন তার সহযোগী কালাম, সবুজ, মনোজ, আকবর, মুশিয়ার, নাজমুল, লিটন ওরফে লিটু শেখসহ জলিরপাড় বাসস্ট্যান্ডে আলোচনায় বসে। সেখানে আসামি আল আমিন মঙ্গল সরদারকে হত্যা করার জন্য আসামি কালাম, সবুজ, মনোজ, আকবর, লিটু মিয়া, মুশিয়ারকে জনপ্রতি ৬০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা করে দেয়।
যেভাবে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয় : ঘটনার দিন মঙ্গল সরদারকে পাওনা টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে আল আমিন, কালাম, মনোজ, সবুজ, আকবর, লিটু, মুশিয়ার, নাজমুলসহ ডেকে নিয়ে সিন্ধিয়া বাজারে সুশান্তের কাঠের দোকানে যায়। সেখানে সবাই একসঙ্গে চা-পান করে সিন্ধিয়া বাজার থেকে জলিরপাড়ের দিকে হেঁটে রওনা দেয়। তাদের সঙ্গে সুশান্তও আসে। ঘটনাস্থল সিন্ধিয়া বাজার থেকে ১ কিলোমিটর পশ্চিমে উল্লাবাড়ীর সামনে ফাঁকা জায়গায় পৌঁছালেই সবুজ মঙ্গল সরদারের মুখ চেপে ধরে, অন্য সবাই মিলে লোহার পেরেক, লাঠি, ইট দিয়ে আঘাত করে মঙ্গল সরদারকে হত্যা করে এবং আল আমিন সর্বশেষ ইট দিয়ে তার মুখে আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। রাত অনুমান ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে সুশান্তসহ অন্যরা লাশ পাটের বস্তায় ভরে কুমোদ বাগচির হলুদ ও ধানক্ষেতে নিয়ে ফেলে দেয়।