ধর্ষণ রোধে পাঠ্যপুস্তকে যৌনশিক্ষা প্রয়োজন

অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম

ধর্ষণ রোধে আইন পরিবর্তন করে কঠোরতম আইন করা হয়েছে। কেউ ধর্ষণ করলে তার মৃত্যুদণ্ড হবে। কিন্তু সমাজে যে কতগুলো জায়গা আছে যেখানে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় শঙ্কার জায়গাটা হচ্ছে, এতটুকু ছেলেমেয়েরাও ধর্ষণের মতো ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। যদিও ছেলেটাকে বলা হচ্ছে প্রাপ্তবয়স্ক, মেয়েটার বিষয়েও মেডিকেল প্রতিবেদন পেলে বোঝা যাবে। তবে মেয়েটির মা বলছে তার ১৭ বছর বয়স। যেহেতু সে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে তাই নিশ্চয়ই সঠিক বয়সটা চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা ভালো করে দেখবেন। তবে যে ঘটনা ঘটেছে সেটাকে একেবারেই পরিকল্পিত বলে মনে হচ্ছে। মেয়েটা একটা বড় প্রতারণার শিকার হয়েছে। নোট নেওয়ার জন্য মেয়েটাকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। তাদের মধ্যে একটা আস্থা-বিশ্বাসের জায়গা ছিল। যেটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক। এটা তো জীবনের একটি স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু আমরা দেখছি মেয়েরা সবসময় এ রকম জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হচ্ছে।

এসব ঘটনার মূল কারণ হিসেবে আমি বলব, আমাদের সমাজ খুব দ্রুত সময়ে পরিবর্তন হচ্ছে। এই যে আমাদের ট্রানজিশনটা হচ্ছে, আমরা অনেক ভাষা শিখছি, আমাদের অবকাঠামোর উন্নয়ন হচ্ছেএটা কিন্তু স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু এর পাশাপাশি একটা দায়িত্ববোধ থাকা উচিত, নিজের যদি অন্য কোনো ধরনের ইচ্ছা জাগ্রত হয়সেটা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত এবং সুষ্ঠু যৌন শিক্ষার যে বিষয়গুলো সেগুলো কিন্তু দেওয়া হচ্ছে না। এ কারণে এই ধরনের ঘটনাগুলো ঘটে যাচ্ছে। এই যে অল্পবয়সীদের যৌনইচ্ছা জাগ্রত হয়েছে এবং সে জন্য সে তার নারী বন্ধুটিকে বেছে নিয়েছে। একটা টেলিভিশনে দেখলাম, সে নিজেই স্বীকার করেছে এটা পরিকল্পিত ছিল। তাকে (মেয়েটিকে) কোমল পানীয়ের সঙ্গে নেশা জাতীয় কিছু খাওয়ানো হয়েছিল। সুতরাং আমি মনে করি কেবল আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও আইনের মাধ্যমে এটা পরিবর্তন করতে পারবেন না। এটার জন্য সঠিক যৌন শিক্ষার প্রয়োজন।

এই যে যৌন সম্পর্কের বিষয়টাএটা আপনি বন্ধ করতে পারবেন না। এটা একটা চাহিদা। অভিভাবকদের খোঁজ নিতে হবে তার সন্তান কাকে বাসায় নিয়ে আসছে, কার সঙ্গে মিশছে। এখন যেটা হয়েছে সেটা হলো আমরা অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের বিশ্বাস করে ফেলি। আমাদের মনে রাখতে হবে, এটা কোনো শ্রেণিগত সমস্যা না। এটা একটা সামাজিক সমস্যা। বাসের কন্ডাকটররাও এই অপরাধটা করছে আবার ইংরেজি মিডিয়ামে শিক্ষিতরাও এটা করছে। এটা দূর করতে হলে আমাদের রাষ্ট্র, সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবাইকে কাজ করতে হবে। ধর্মীয়ভাবেও যদি আমরা মূল্যায়ন করি, সেখানে ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, নারীকে সম্মান করা, নারীকে হেয় প্রতিপন্ন না করা, এগুলো কিন্তু ধর্মীয় মূল্যবোধ। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে এসব বিষয়ে শিক্ষা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ধর্মীয় দৃষ্টিতে যৌন সম্পর্কের একটা নির্দিষ্ট গণ্ডি বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সেগুলোকে বোঝাতে হবে। এসব বিষয়কে সুন্দর করে না বলে কদর্যভাবে বলা হয়। কিন্তু এটাকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে হবে। ওয়াজ মাহফিলে এগুলোর বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে।

আরেকটি বিষয় হলো নব্য পয়সাওয়ালাদের ফ্যামিলিতে এখন অপরাধ প্রবণতা বেশি হচ্ছে। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর বাসের কন্ডাকটররাও এখন মাদক বিক্রি করে। সারা দেশ মাদকে সয়লাব। আমরা এখনো পর্নোগ্রাফি বন্ধ করতে পারিনি। আবার চাকরিজীবীরা সন্তানদের খোঁজ নিতে পারছে না। এই যে ঘটনাটা ঘটল সেখানেও একজনের বাবা-মা দুজনেই চাকরি করে। আবার আরেকজনের বাবা ব্যবসা করেন এবং মা চাকরি করেন। কিন্তু অভিভাবকদেরও এর মধ্যে সন্তানদের খোঁজ নেওয়া উচিত। পারিবারিকভাবে যৌন শিক্ষা দিতে হবে। সন্তানদের শেখাতে হবে তুমি কী করতে পারবে আর কী পারবে না। আমি সবচেয়ে যেটা বেশি প্রয়োজনীয় মনে করি সেটা হলো নতুন পাঠ্যপুস্তক করা হবে। সেখানে ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে অবশ্যই যৌন শিক্ষা সম্পর্কিত বই পাঠ্যপুস্তক আকারে বাধ্যতামূলক করতে হবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত এ বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে। মাদককে নির্মূল করতে হবে।

প্রফেসর ড. সাদেকা হালিম, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়