সাম্প্রতিক নানা গবেষণায় বলা হচ্ছে, মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে ‘সিএমএসই’ বা অণু, ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প খাতের অবদান ২৫ শতাংশ। তবে, দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে এই খাতের প্রকৃত অবদান হিসাব করতে হলে সঙ্গে এই বিবেচনাও যুক্ত করতে হবে যেদেশের শিল্প খাতে মোট কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশই হয় সিএমএসই খাতে। কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্প খাতে সরকারের তদারকির পরিস্থিতি আসলে কী? দেশের অণু, ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প খাতের দেখভাল এবং এই খাতে আরও শিল্পায়নের তদারকি করে থাকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন, যা ‘বিসিক’ নামেই সমধিক পরিচিত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই সংস্থাটির বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক নানা ঘটনায় জোরদার যে অভিযোগ উঠছে সেটি অদক্ষতার। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, শিল্পনগরী স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের দক্ষতাই নেই বিসিকের। এই সংস্থাটিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যবহারের অভিযোগও অনেক পুরনো। ২০১৪ সালে ‘বিসিকের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ নিয়ে সংস্থাটির নিজস্ব এক সমীক্ষা প্রতিবেদনেই উঠে আসে যে, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিসিকের মোট ৭৪টি শিল্পনগরের মধ্যে ২০টিই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়।
বিসিকের ওই নিজস্ব সমীক্ষার পর আরও ছয়টি বছর কেটে গেলেও সংস্থাটির বেশিরভাগ শিল্পনগরীর অচলাবস্থা কাটেনি সেটা বলাবাহুল্য। শনিবার দেশ রূপান্তরে ‘কারখানার বদলে কলাগাছ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বিসিকের হবিগঞ্জ শিল্পনগরীর সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। দেশ রূপান্তরের হাতে আসা তথ্যানুযায়ী ‘হবিগঞ্জ টেক্সটাইল’ নামে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ার জন্য ২০১২ সালে ১৮ জুলাই হবিগঞ্জ বিসিকে শিক্ষার্থী ইফাত জামিলের নামে সাড়ে ১৩ হাজার বর্গফুট জমি বরাদ্দ নেওয়া হয়। তিনি হবিগঞ্জ সদর আসনের সাংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু জাহিরের একমাত্র ছেলে। ‘মুক্তি টেক্সটাইল’-এর নামে একই তারিখে একই পরিমাণ জমি বরাদ্দ পান যুবলীগের সৌদি আরবের জেদ্দা শাখার সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া চৌধুরী। হবিগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মোতাচ্ছিরুল ইসলামকে টেক্সটাইল মিলের জন্য ২০১৮ সালের ১ অক্টোবর সাড়ে ৪ হাজার বর্গফুট জমি হন্তান্তর করে বিসিক। এছাড়া হাজি শফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি সিরামিক কারখানার জন্য ২০০৮ সালের ১৬ অক্টোবর ৯ হাজার বর্গফুট এবং শাহ আলম বাবু ২০১৭ সালের ২২ মার্চ সাড়ে ১৩ হাজার বর্গফুট জমি বরাদ্দ নেন। কিন্তু আজও এসব ‘শিল্প উদ্যোক্তারা’ তাদের জায়গায় কারখানা গড়ে তোলেননি। একই অবস্থা সান কেমিক্যাল কমপ্লেক্সেরও। ২০০৮ সালে গোলাম মর্তুজা চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানটির নামে ৫ হাজার ২০০ বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ পাওয়ার পরও এখনো কারখানা গড়ে তোলেননি। সরেজমিন দেখা গেছে, সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু জাহিরের ছেলে ইফাত জামিলের শিল্প প্লটে টেক্সটাইল মিলের জায়গায় কলাগাছ শোভা পাচ্ছে। আর ফাঁকা অন্যান্য প্লট লম্বা ঘাস আর লতাপাতায় ভরে আছে।
৮ থেকে ১৩ বছর ধরে বরাদ্দকৃত এসব শিল্প প্লট খালি ফেলে রাখার পরও এমন উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে বিসিক আসলে কী ব্যাখ্যা দেবে? বিসিক শিল্পনগরীর প্লট বরাদ্দের নীতিমালা অনুযায়ী, প্লটের দখল বুঝে নেওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে কারখানা ভবনের লে-আউট প্ল্যান শিল্পনগরীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে দাখিল করতে হবে। লে-আউট প্ল্যান ১৫ দিনের মধ্যে অনুমোদনের পর নির্মাণকাজ শেষ করতে হবে ১৮ মাসের মধ্যে। এছাড়া তিন মাসের মধ্যে যন্ত্রপাতি স্থাপনের পর এক মাসের মধ্যে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করতে হবে। হবিগঞ্জ বিসিক থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে মোট ৬৮টি প্লটের মধ্যে ৫১টি বাস্তবায়িত শিল্প ইউনিট রয়েছে। তার মধ্যে বর্তমানে ৪৩টি কারখানা চালু এবং ৫টি বন্ধ রয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো সাক্ষ্য দেয় যে, কেবল হবিগঞ্জ শিল্পনগরীই নয় বিসিকের বেশিরভাগ শিল্পনগরীর হাল প্রায় একই। সাম্প্রতিককালে বিসিক সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে প্লাস্টিক শিল্পনগরী এবং সাভারের হেমায়েতপুরের চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্প বাস্তবায়নে সীমাহীন ব্যর্থতার কারণে। স্মরণ করা যেতে পারে দেশের শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে এই সংস্থাটির জন্ম হয়েছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক শ্রম, বাণিজ্য ও শিল্প প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে। আইন পরিষদে বঙ্গবন্ধুর আনা বিল থেকেই তখনকার ইপসিক বা আজকের বিসিকের জন্ম হয় ১৯৫৭ সালে। স্বাধীনতার পরপরই জেলায় জেলায় বিসিক শিল্পনগর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও ত্বরান্বিত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। আজ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে বিসিকের সামগ্রিক সাফল্য ও ব্যর্থতার খতিয়ান তাই জরুরি। একইসঙ্গে সংস্থাটির কর্তাব্যক্তিসহ শিল্প মন্ত্রণালয়েরও এই জবাবদিহি জরুরি যে, বিসিকের কেতাবে থাকা আর গোয়ালে থাকা গরুর সংখ্যায় আর কতদিন এমন তফাৎ থাকবে।