বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের স্বাধীনতার মতোই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি যদি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে না আসতেন, যদি পাকিস্তানি সামরিক জান্তারা তাকে হত্যা করত, তাহলে আমরা আজকের এই বাংলাদেশ পেতাম না। বঙ্গবন্ধুর সমালোচকদের কেউ কেউ এখনো বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি শাসকদের গ্রেপ্তারের সুযোগ না দিয়ে আত্মপোপন করতে পারতেন। আত্মগোপনে থেকে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে পারতেন। যারা এ ধরনের কথা বলেন, তারা আসলে সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা সম্পর্কে জানেন না। প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো, বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করেছেন সিংহের মতো। বীরের মতো। তিনি লুকোচুরি পছন্দ করতেন না। তিনি তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমি পালিয়ে থাকার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। কারণ আমি গোপন রাজনীতি পছন্দ করি না, আর বিশ্বাসও করি না।’ (পৃ. ১৩৪) ব্রিটিশ ধাঁচের সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ছিল বঙ্গবন্ধুর পছন্দ।
আত্মগোপন না করে গ্রেপ্তার হওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনের সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্তের একটি। তিনি সাংবিধানিক ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথে ছিলেন বলেই আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন পান। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে বিশ্বজনমত তার পাশে থাকে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গ্রেপ্তার হওয়া সম্পর্কে ১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারি ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, “সেদিন সন্ধ্যায় আমার বাড়ি পাকিস্তান সামরিক জান্তার কমান্ডো বাহিনী ঘেরাও করেছিল। ওরা আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। প্রথমে ওরা ভেবেছিল, আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলে ওরা আমায় হত্যা করবে এবং প্রচার করে দেবে যে, ‘তারা যখন আমার সঙ্গে রাজনৈতিক আপসের আলোচনা করছিল, তখন দেশের চরমপন্থিরাই আমাকে হত্যা করেছে।’ আমি বাড়ি থেকে বের হওয়া নিয়ে চিন্তা করলাম। আমি স্থির করলাম, আমি মরি, তবু আমার প্রিয় দেশবাসী রক্ষা পাক।... আমি ইচ্ছা করলে যে কোনো জায়গায় যেতে পারতাম। কিন্তু আমার দেশবাসীকে ছেড়ে আমি কেমন করে যাব? আমি তাদের নেতা। আমি সংগ্রাম করব। মৃত্যুবরণ করব। পালিয়ে যাব কেন? দেশবাসীর কাছে আমার আহ্বান ছিল তোমরা প্রতিরোধ গড়ে তোলো।... আমার মনের কথা ছিল, আজ আমি যদি আমার দেশের নেতা হিসেবে মাথা উঁচু রেখে মরতে পারি, তাহলে আমার দেশের মানুষের অন্তত লজ্জার কোনো কারণ থাকবে না। কিন্তু আমি ওদের কাছে আত্মসমর্পণ করলে, আমার দেশবাসী পৃথিবীর সামনে আর মুখ তুলে দাঁড়াতে পারবে না। আমি মরি, তাও ভালো। তবু আমার দেশবাসীর যেন মর্যাদার কোনো হানি না ঘটে।’’
রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর আত্মমর্যাদাবোধ এবং দেশবাসীর সম্মানকে তিনি যেভাবে দেখেছেন, তার তুলনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের কথা পাকিস্তান সরকার এক সপ্তাহ গোপন রাখে। তারপর গ্রেপ্তার করা অবস্থায় করাচিতে তার ছবি পত্রিকায় প্রকাশিত হলে বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় ওঠে। পাকিস্তান সরকারকে মানুষ ধিক্কার জানায়। ৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের ফয়সালাবাদ বন্দিশালায় বঙ্গবন্ধুর গোপন বিচার শুরু হয় এবং সেই প্রহসনমূলক বিচারে তাকে ‘দেশদ্রোহী’ ঘোষণা করে মৃত্যুদণ্ড দেয় সামরিক আদালত। কিন্তু বিশ্বজনমতের চাপে পাকিস্তানি শাসকরা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে দণ্ড কার্যকরের সাহস পায়নি। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাঙালিদের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হওয়ার পর বিশ্বনেতারা বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। আন্তর্জাতিক চাপে পরাজিত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত বন্দিদশা থেকে বঙ্গবন্ধুকে সসম্মানে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। প্রিয় নেতাকে ফিরে পেয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি সাড়ে সাত কোটি বাঙালি আনন্দাশ্রুতে সিক্ত হয়ে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত করে তোলে বাংলার আকাশ-বাতাস।
১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও মানুষের মনে ছিল শঙ্কা ও বিষাদের ছাপ। এ ছাড়াও যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির মাধ্যমে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শারীরিক উপস্থিতি ছিল অনিবার্য। সেদিন বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি যে কতটা প্রয়োজন ছিল, তা বর্তমান সময়ে বসে অনুভব করা যাবে না। তখন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের অনেকেই মনে করছিলেন, ‘আমরা সবাই রাজা’। কেউ কাউকে মানছিলেন না। তরুণ নেতারা অস্থায়ী সরকারের কোনো কথা শুনছিলেন না। একটি নৈরাজ্যের মতো অবস্থা ছিল ২৫টি দিন। তিনি না এলে মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র জমা দিতেন কি না, সন্দেহ। ভারতীয় সৈন্যও হয়তো অত তাড়াতাড়ি ফিরে যেত না। অনেক দেশের স্বীকৃতি পেতেও বেগ পেতে হতো। তার প্রত্যাবর্তনের দিন থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব আরও সংহত হয়। ১০ জানুয়ারি আসলে বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিপূর্ণতা লাভের দিন। এইদিন দেশবাসী তাদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে ফিরে পেয়ে প্রাণভরে বিজয়ের পূর্ণ স্বাদ উপভোগ করেন। এদিন থেকে বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রবেশ করে গণতন্ত্রের এক আলোকিত অভিযাত্রায়।
ইতিহাসকে বিচার করতে সময়ের নিরিখে। আজ বসে বসে হয়তো অনেক কথাই বলা যায়। কিন্তু সেদিনের ঘটনাগুলোকে মূল্যায়ন করতে হবে সেই সময়ের আলোকে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য রেহমান সোবহান সেই সময়ের মূল্যায়ন করে বলেছেন, ‘সাধারণ লোকজন তো শুধু মনে করেছে একটা যুদ্ধের মধ্যে আমরা স্বাধীন হয়ে গেছি। আমাদের আর ভাবনা-চিন্তা কী। আমাদের নাগালে সবকিছুই চলে আসবে। দেশের ওইসব সাধারণ লোকের মধ্যে এ ভাবনাটাই স্বাভাবিক ছিল। কারণ বঙ্গবন্ধুর প্রতি জনগণের ভালোবাসা ছিল তীব্র। মানুষ মনে করত তিনি সবকিছু করে ফেলতে পারবেন। সত্যিকার অর্থে ১৯৭২ সালে আমাদের অর্থনীতি পুরোপুরি ধ্বংস বা বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। আমাদের ইনফ্রাস্ট্রাকচার ধ্বংস, রাস্তাঘাট ধ্বংস, দুটো বড় বড় ব্রিজ পাকিস্তান সাবোট্যাজ করে চলে যায়। হাইওয়েতে কোনো গাড়ি চলে না। যোগাযোগ ব্যবস্থা বলতে কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। তবে মূল সমস্যা ছিল পাকিস্তানি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, পূর্ব বাংলার অর্থনীতির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল। তারা একসঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে পাকিস্তান চলে যায়। মূলত অবাঙালি ব্যবসায়ী সম্প্রদায় পাকিস্তান আমলে এদেশের ইকোনমি নিয়ন্ত্রণ করেছে, পূর্ব বাংলার ভেতর ও বাইরে থেকে। ইকোনমি নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো হলো সব বড় বড় কারখানা, ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, ট্রেডিং, পাটের ব্যবসাসব তো অবাঙালিদের হাতে ছিল। হঠাৎ করেই ১৬ ডিসেম্বরের আগে সবকিছু গুটিয়ে তারা চলে যায়। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ প্রতিষ্ঠার পর খুব কম দেশেই এ রকম অবস্থা হয়েছিল। ইতিহাসে এ রকম নজির নেই বললেই চলে। দেশ থেকে পুরো একটা ব্যবসায়ী ক্লাস উধাও।... প্ল্যানিং কমিশনের সদস্য হিসেবে বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন, তুমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দাঁড় করাও। অর্থাৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অ্যালোকেট করে রিভাইভ করো। সব তো তখন আমার হাতেই ছিল। এসব কঠিন কাজ তিন বছরের মধ্যে যে কিছু একটা হয়েছে, এটা তো কল্পনার বাইরে, এত শিগগিরই আমরা কিছু একটা দাঁড় করাতে পেরেছিলাম, এটাই তো অনেক। তারপর তিন বছরের মধ্যে সব কিছু কি গোলাপ বাগান হয়ে যাবে, এটা তো সম্ভব নয়। যতকিছু হয়েছে, সবই চ্যালেঞ্জিং সময়ের মধ্যে হয়েছে। তবে হয়েছে অনেক কিছুই, ওটা তো সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য, তিনি দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন প্ল্যানিং কমিশন নিয়ে। তার নজরে ছিল কীভাবে দেশের মজবুত অর্থনীতির ভিত রচনা করা যায়। তবে তার আরও চাপ ছিল ডোনারের সঙ্গে, আমেরিকা তো ফুড শিপমেন্ট বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশে। ওই সময় ফুডের একটা সংকট বাইরে থেকে চলে আসে, ফলে সবকিছু তো তাকেই সামলাতে হচ্ছে। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে তখন আমরা এগোচ্ছিলাম। দেশ ও দেশের বাইরের নানা বৈরী পরিস্থিতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সামাল দিতে হচ্ছিল। তবে এর মধ্য থেকেও সবার সঙ্গে তিনি পারসোনাল সম্পর্ক বজায় রাখতেন। ... যদি বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতেন, তবে সাড়ে তিন বছরের কষ্টের ফসলের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির মজবুত ভিত তৈরি হতো। সব তো ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর দেশ যে পথে গেল, হয়তো সে পথে যেত না। তিনি দেশকে একটা পূর্ণতা দিতে পারতেনএটা আমার স্পেকুলেশন। আমার মনে হয়, আরেকটা ইতিহাস হতো। এত সংকটের দিন থাকত না। এত মারামারি, এত কষ্ট, এত রক্তপাত হয়তো হতো না (বণিকবার্তা, ১০ জানুয়ারি ২০২০)।’
বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর সাড়ে চারটি দশক অতিক্রান্ত হয়েছে। সেই সময়টিতে থেকে থেকে দুর্বৃত্তরা বারবার আঘাত হেনেছে বঙ্গবন্ধু পরিবারের ওপর বাংলাদেশের স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি ধ্বংস করার দুরাশায়। কিন্তু তারা সফল হয়নি। তারা সফল হবে না। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা অপ্রতিরোধ্য। বাংলাদেশ যতই এগিয়ে যাবে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন আর অর্জন আমাদের জাতির জন্য উত্তরোত্তর ততই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে।
লেখক লেখক ও কলামনিস্ট
chiros234@gmail.com