তিন মাস ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের মূল্য আকাশচুম্বী। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে রড ও অন্যান্য ইস্পাত সামগ্রীর দর বাড়ছে। তা সত্ত্বেও সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চলমান উন্নয়ন কর্মকান্ডকে কেন্দ্র করে ইস্পাত শিল্পের উল্লেখযোগ্য বিকাশ এবং এ খাতে বিপুল সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপ সংকট ও দেশে রডের দরবৃদ্ধির কারণ এবং দেশের ইস্পাত শিল্পের নানা দিক নিয়ে দেশ রূপান্তরকে বিস্তারিত বলেছেন মোস্তফা হাকিম শিল্প গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠান গোল্ডেন ইস্পাত লিমিটেডের পরিচালক মোহাম্মদ সরোয়ার আলম। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের বিশেষ প্রতিনিধি ও চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান ফারুক ইকবাল।
করোনার কারণে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা বিরাজ করছে। এ অবস্থায় দেশে ইস্পাত শিল্পের উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতি কেমন?
করোনার কারণে প্রথম দিকে উন্নয়ন কর্মকান্ড প্রায় স্থবির হয়ে পড়লেও এখন সেই ধাক্কা অনেকখানি কাটিয়ে ওঠা গেছে। বিশেষ করে সরকারের অবকাঠামোগত মেগা প্রকল্পগুলোর নির্মাণকাজে গতি এসেছে। বেসরকারি পর্যায়েও নানা শিল্প কারখানায় বিনিয়োগ হচ্ছে। ফলে ইস্পাত শিল্পে উৎপাদন ও বিপণনে তার ইতিবাচক প্রভাব দেখতে পাচ্ছি।
২-৩ মাসে দেশে ইস্পাত পণ্যমূল্য বিশেষ করে রডের দাম দফায় দফায় বেড়েছে। হঠাৎ রডের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার কী কারণ, সংকটই-বা কোথায়?
আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের (পুরনো জাহাজ/পুরনো লৌহজাত সামগ্রী) মূল্য এখন আকাশচুম্বী বলা চলে। পাশাপাশি স্ক্র্যাপের ঘাটতিও এর বড় কারণ। ক্ষেত্র বিশেষে, স্বল্পতার দরুণ প্রয়োজনীয় স্ক্র্যাপ সময়মতো মিলছে না। এ অবস্থায় মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের দাম প্রতি টনে ১৫০ ডলার বেড়ে গেছে। দুই মাস আগে প্রতি টন স্ক্র্যাপ আমদানিতে ব্যয় হতো ৩৫ হাজার থেকে ৩৬ হাজার টাকা। এখন সেই স্ক্র্যাপের মূল্য ভ্যাট, ট্যাক্স মিলে দাঁড়িয়েছে ৪৬ হাজার ৫০০ টাকা। ফলে, দেশের বাজারে রডের মূল্য টনপ্রতি ৭-৮ হাজার টাকা বেড়ে এখন কোম্পানি বা মানভেদে ৬৪-৬৮ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপ সংকটের নেপথ্য কারণ?
করোনা মহামারীর কারণে চীনে গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি নিষিদ্ধ বা বন্ধ ছিল। কিন্তু গত বছরের নভেম্বর থেকে চীন বড় মাপে স্ক্র্যাপ আমদানি করতে শুরু করে। ফলে, আন্তর্জাতিক বাজারে হঠাৎ করেই স্ক্র্যাপ সংকট দেখা দেয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আমাদের দেশীয় ইস্পাত শিল্পের উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থায়।
মোস্তফা হাকিম গ্রুপের অন্যতম শিল্প প্রতিষ্ঠান গোল্ডেন ইস্পাত ইতিমধ্যে দেশীয় বেশ কয়েকটি ইস্পাত কারখানা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। আপনাদের কী চিন্তাভাবনা?
ভালো কথা, আগামী ফেব্রুয়ারিতে কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরের ডাঙ্গারচরে আমাদের নতুন প্রকল্প ‘এইচ এম স্টিল লিমিটেড’ চালু হতে যাচ্ছে। প্রায় ১৫ একর আয়তনের এই বৃহৎ ও অত্যাধুনিক ইস্পাত কারখানা স্থাপনে মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। আমেরিকা, জার্মানি ও ভারত থেকে এ নতুন প্রকল্পে ল্যাব ও মেশিনারিজ স্থাপন করা হয়েছে। এতে ডিএইচআর পদ্ধতিতে ইস্পাত সামগ্রী উৎপাদিত হবে। ফলে কার্বন দূষণের মাত্রা হবে স্বল্পমাত্রায়। কারখানার বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ৩ লাখ ৬৫ হাজার টন। এতে প্রায় এক হাজার কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে কুমিরায় স্থাপিত গোল্ডেন ইস্পাত কারখানায় বার্ষিক ২ লাখ ২০ হাজার টন রডসহ বিভিন্ন প্রকার ইস্পাত সামগ্রী উৎপাদন হচ্ছে। এতে কর্মরত আছেন পাঁচ শতাধিক শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তা।
কাঁচামাল সংকট তথা অনেকখানি আমদানি নির্ভরতা এবং সীমাবদ্ধ বাজার সত্ত্বেও দেশি ইস্পাত শিল্পের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কতটুকু উজ্জ্বল?
মূলত দেশের উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে ইস্পাত শিল্পের অগ্রগতির চাকা ঘুরছে। স্টিলের মাথাপিছু চাহিদায় ভারতসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে। তবে আশার কথা, আমাদের চাহিদা ও উৎপাদন দুটোই সমহারে বাড়ছে। তাছাড়া, সম্ভাবনার বড় দিক হচ্ছে অবকাঠামো খাতে সরকারের অনেকগুলো মেগাপ্রকল্পসহ ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং বেসরকারি খাতের উন্নয়ন প্রকল্প। সেইসঙ্গে আছে দেশের জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির দিকটিও। বর্তমান সরকারের অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মকান্ডে উৎপাদিত স্টিলের ৬৫ শতাংশ এবং বেসরকারি পর্যায়ে ৩৫ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে। আর পাশ^বর্তী দেশগুলোতে যেখানে স্টিলের মাথাপিছু চাহিদার পরিমাণ ৮০ শতাংশ, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে তা এখনো ৩০ শতাংশ মাত্র। যা উত্তরোত্তর বাড়ছে। এসব বিষয় পরিসংখ্যান ও সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে দেশে নতুন নতুন ইস্পাত কারখানা হচ্ছে। তাতে এই খাতে প্রতিযোগিতা বাড়ছে।
দেশীয় ইস্পাত সামগ্রীর বাজার সম্প্রসারণ অর্থাৎ রপ্তানির সম্ভাবনা কতটুকু?
সম্প্রতি প্রথমবারের মতো জিপিএইচ ইস্পাত তাদের উৎপাদিত পণ্যের একটি চালান চীনে রপ্তানি করেছে। আমি তাদের সাধুবাদ জানাই। এটি দেশীয় ইস্পাত শিল্পের জন্য একটি আশা জাগানিয়া দিক। ঠিক এখনই না হলেও যে হারে এই শিল্পে প্রতিযোগিতা বাড়ছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে নতুন নতুন বাজার খুঁজতে হবে এবং আমরাও সেটি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছি।