ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মালিকানাধীন মার্কেটগুলোতে থাকা অবৈধ দোকান উচ্ছেদ নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছেন সংস্থাটির বর্তমান মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ও সাবেক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। সম্প্রতি প্রভাবশালী এ দুই ব্যক্তির পরস্পরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পর তা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যেও। এরই মধ্যে গতকাল সোমবার ডিএসসিসি মেয়র তাপস সাবেক মেয়র খোকনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলার পরপরই ঢাকার আদালতে দুই আইনজীবী বাদী হয়ে দুটি মামলার আবেদন করেছেন। এরপর সাঈদ খোকনের পক্ষ থেকেও গণম্যাধ্যমে বার্তা পাঠানো হয়। সেখানে তিনি মেয়র তাপসের মানের বাজারমূল্য কত এমন প্রশ্ন রেখে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথেও তাপসেকে মোকাবিলার ঘোষণা দেন।
ডিএসসিসির কর্মকর্তারা জানান, গতকাল সকালে ডিএসসিসির ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মানিকনগর স্লুইস গেট এলাকা পরিদর্শনে যান মেয়র শেখ তাপস। পরিদর্শন শেষে তিনি সেখানে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় এর আগে দক্ষিণ সিটির সাবেক মেয়র খোকনের দেওয়া বক্তব্যকে মানহানিকর উল্লেখ করে এ বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়ে তাপস বলেন, ‘৯ জানুয়ারি আমরা লক্ষ করলাম যে, তিনি (সাঈদ খোকন) ঘটা করে আমার বিরুদ্ধে সভা ডেকে, আমার বিরুদ্ধে বিষোদগার করলেন। আমার কাছে মনে হয় যে, এটা ওনার ব্যক্তিগত আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ।’
তাপস আরও বলেন, ‘গত বছর ১৭ মে দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে। আপনারা লক্ষ্য করেছেন, মার্কেটসংক্রান্ত কিছু তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সংবাদকর্মীরা আপনারাই সেগুলো অনুসন্ধান করে বের করেছেন। সেখানে বিভিন্নভাবে টাকা লেনদেন হয়েছে। যাদের সঙ্গে টাকা লেনদেন হয়েছে, যারা লেনদেন করেছেন, তারাই অভিযোগ এনেছেন। আমরা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে অথবা আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনোভাবেই কোনো অভিযোগ আনিনি। সেখানে যারা লেনদেন করেছেন, যারা ব্যবসায়ী দোকানদার অবৈধভাবে সেই জায়গাগুলোর দখলে ছিলেন, তারা অর্থ লেনদেন করেছেন। এখন তিনি (খোকন) পুরো দোষ আমার ওপর চাপানোর চেষ্টা করছেন। সেটা আমি মনে করি খুবই অনভিপ্রেত। সেটা শুধু ব্যক্তিগত আক্রোশের বশবর্তী হয়ে তিনি এ বিষয়গুলো তুলে ধরছেন।’
সাবেক মেয়র খোকন মানহানিকর বক্তব্য দিয়েছেন উল্লেখ করে বর্তমান মেয়র তাপস বলেন, ‘আমি তার বক্তব্য শুনে অবাক হয়েছি। তিনি নিজেকে চুনোপুটি দুর্নীতিবাজ হিসেবে স্বীকার করেছেন। আর আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অবশ্যই এটা মানহানিকর হয়েছে। আমি এ ব্যাপারে ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে পারি।’
খোকনের বিরুদ্ধে মানহানির দুই মামলার আর্জি : ডিএসসিসি মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসকে নিয়ে মানহানিকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে একই সংস্থার সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের বিরুদ্ধে দুটি মামলার আবেদন হয়েছে। গতকাল মো. সারওয়ার আলম নামে এক আইনজীবী ও কাজী আনিসুর রহমান নামে এক ব্যক্তি ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে এ দুটি মামলার আবেদন করেন। দুজনের আর্জি শুনে মহানগর হাকিম রাজেশ চৌধুরী এ বিষয়ে আজ মঙ্গলবার আদেশের জন্য দিন নির্ধারণ করেন বলে সংশ্লিষ্ট আদালত সূত্র জানায়। আর্জিতে দণ্ডবিধির ৫০০ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে সাঈদ খোকনের বিরুদ্ধে।
গত শনিবার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দান ও প্রেস ক্লাবসংলগ্ন কদম ফোয়ারার সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধনে সাঈদ খোকন বলেন, ডিএসসিসির মেয়র পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন শেখ ফজলে নূর তাপস। গুলিস্তান এলাকায় দুটি মার্কেটে উচ্ছেদ অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা পুনর্বাসনের দাবিতে ওই মানববন্ধনের আয়োজন করেন।
ডিএসসিসির সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন আরও বলেন, ‘তাপস ডিএসসিসির শত শত কোটি টাকা তার নিজ মালিকানাধীন মধুমতি ব্যাংকে স্থানান্তর করেছেন। কোটি কোটি এই টাকা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের মাধ্যমে তিনি লাভ করেছেন এবং করছেন। অন্যদিকে অর্থের অভাবে করপোরেশনের গরিব কর্মচারীরা মাসের পর মাস বেতন পাচ্ছেন না। আমি তাকে বলব, রাঘববোয়ালের মুখে চুনোপুটির গল্প মানায় না।’
সাঈদ খোকনের এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় গত রবিবার ধানম-ি ৩২ নম্বরে মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস সাংবাদিকদের বলেন, ‘কেউ যদি ব্যক্তিগত আক্রোশের বশবর্তী হয়ে কোনো কিছু বলে থাকেন, সেটার জবাব আমি দায়িত্বশীল পদে থেকে দেওয়াটা সমীচীন মনে করি না।’ এরপর গতকাল রাজধানীর মানিকনগরে বক্স কালভার্ট পরিদর্শনে গিয়ে মেয়র তাপস সাংবাদিকদের জানান, সাঈদ খোকনের মানহানিকর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি আইনি ব্যবস্থা নেবেন। এর কিছুক্ষণ পর সাঈদ খোকনের বিরুদ্ধে দুই মামলার আবেদনের খবর আসে।
তাপসের মানসম্মানের বাজারমূল্য কত, প্রশ্ন খোকনের : গতকাল মেয়র তাপস আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণার দেওয়ার পরপরই ঢাকার আদালতে খোকনের বিরুদ্ধে দুটি মামলার আবেদন জমা পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে সাবেক মেয়র খোকন বলেন, ‘তাপসের মানসম্মানের বাজারমূল্য কত? মামলার পূর্ণাঙ্গ বিবরণী পাওয়ার পর সেটা আমি জানতে পারব। এ মামলার আইনি মোকাবিলার পাশাপাশি রাজপথে দেনা-পাওনার হিসাব হবে।’