কারসাজির তদন্ত স্থগিতের জেরে এক দিন পরই উল্লম্ফনে ফিরল পুঁজিবাজার। এতে করে পুঁজিবাজারে চাঙ্গাভাবের নেতৃত্ব পুরনো কোম্পানিগুলোর হাতেই রয়ে গেছে। অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি খতিয়ে দেখতে যেসব কোম্পানির লেনদেন তদন্তের আওতায় আসার কথা ছিল গতকাল সেসব কোম্পানির প্রায় সবগুলোর দর আকাশ ছুঁয়েছে। বড় মূলধনী বেশিরভাগ শেয়ারের দরবৃদ্ধিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন ৫ লাখ কোটি টাকার মাইলফলক পেরিয়েছে। সূচকও বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ডিএসইর প্রধান সূচকটি ৬ হাজার পয়েন্টের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।
দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নতুন কমিশনের নেতৃত্বে গত ৩১ মে থেকে সচল হতে শুরু করে দেশের পুঁজিবাজার। আর এরপর থেকেই সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও এসইসির নানামুখী পদক্ষেপে চাঙ্গা হতে শুরু করে বাজার পরিস্থিতি। ওয়ালটন ও রবি আজিয়াটার মতো বড় ও ব্র্যান্ডভ্যালুর কোম্পানির তালিকাভুক্তি গতি বাড়াতে সাহায্য করে। এতে করে মাত্র সাড়ে ছয় মাসে ডিএসইর বাজার মূলধন ১ লাখ ৯১ হাজার ১৭০ কোটি টাকা বেড়ে ৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এ সময়ে ডিএসইর বাজার মূলধন বেড়েছে ৬১ দশমিক ৫ শতাংশ। আর ডিএসইর প্রধান সূচক বেড়েছে ৪৯ শতাংশ।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ডিএসইর বাজার মূলধন বাড়াতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রয়েছে রবি ও ওয়ালটনের। এই দুই কোম্পানি সম্মিলিতভাবে ডিএসইর বাজার মূলধনে ৬৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি যোগ করেছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ের চাঙ্গাভাবে গ্রামীণফোন, লাফার্জহোলসিম, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, বেক্সিমকো লিমিটেড, বেক্সিমকো ফার্মার মতো পুঁজিবাজারের বড় মূলধনী কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়ায় ডিএসইর বাজার মূলধন নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
১৫ মাস পর গত ২০ অক্টোবর ডিএসইর বাজার মূলধন আবার ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়ায়। এর আগে সর্বশেষ ২০১৯ সালের ২৭ জুন ডিএসইর বাজার মূলধন ৪ লাখ কোটি টাকার ওপরে ছিল। গতকাল লেনদেন শেষে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ১ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা। মাত্র ১৫ কার্যদিবসে ডিএসইর সবচেয়ে বড় পরিশোধিত মূলধনী কোম্পানি রবির শেয়ারের দর বাড়ে ৭০০ শতাংশ। এতে করে গতকাল রবির বাজার মূলধন দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা। একক কোম্পানি হিসেবে বাজার মূলধনে তৃতীয় কোম্পানি হচ্ছে রবি। বর্তমানে ডিএসইর সবচেয়ে বড় মূলধনী কোম্পানি হচ্ছে গ্রামীণফোন, যার বাজার মূলধন ৪৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা। এছাড়া দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ওয়ালটন, যার বাজার মূলধন ৩৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। রবির শেয়ার দর যেভাবে বাড়ছে, তাতে করে অচিরেই বাজার মূলধনে ওয়ালটনকে ছাড়িয়ে যাবে দেশের দ্বিতীয় শীর্ষ এই মোবাইল ফোন অপারেটরটি।
বাজার মূলধনের পাশাপাশি গতকাল ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স বেড়েছে ১৩৯ পয়েন্ট। অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক সূচক বেড়েছে ৩৭৯ পয়েন্ট। মূলত শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির তদন্তে এসইসি নিজের নেওয়া সিদ্ধান্ত গত বুধবার স্থগিত করায় গতকাল লেনদেনের শুরু থেকেই সূচক লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। একই দিনে পুঁজিবাজারেও মার্জিন ঋণের সুদহার প্রথমবারের মতো বেঁধে দেয় এসইসি। এর ফলে শেয়ার ক্রয়ে নেওয়া মার্জিন ঋণের সুদহার নেমে আসে ১২ শতাংশে, যা আগে ১৪ থেকে ১৮ শতাংশে ছিল। ইতিবাচক এসব পদক্ষেপের ফলে গতকাল লেনদেনের শুরু থেকেই উল্লম্ফন দেখা দেয় বাজারে। বেশিরভাগ শেয়ারের দরবৃদ্ধিতে ডিএসইএক্স বেলা পৌনে ১২টায় ১৭২ পয়েন্ট বেড়ে যায়। অবশ্য লেনদেনের দ্বিতীয় ভাগে সূচক কিছুটা কমে যায়। তবে শেষ পর্যন্ত বড় ঊর্ধ্বগতির ধারা বজায় রেখে লেনদেন শেষ হয়েছে। গতকাল সূচককে সামগ্রিকভাবে টেনে তুলতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে ব্যাংক, টেলিযোগাযোগ, বিবিধ, এনবিএফআই, সিমেন্ট ও জ¦ালানি খাত। সাম্প্রতিক সময়ের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে গতকালও ডিএসইর লেনদেন ২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) কেনাবেচা হয়েছে ৮৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
ডিএসইতে লেনদেনের ভিত্তিতে (টাকায়) প্রধান ১০টি কোম্পানি হলো বেক্সিমকো লিমিটেড, বেক্সিমকো ফার্মা, রবি আজিয়াটা, সামিট পাওয়ার, লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ, আইএফআইসি ব্যাংক লিমিটেড, সিটি ব্যাংক, পাওয়ার গ্রিড, লংকাবাংলা ফাইন্যান্স ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো।
গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৩৬২টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দর বেড়েছে ১৫৯টির, কমেছে ১৩৩টির ও অপরিবর্তিত ছিল ৭০টির। গতকাল ডিএসইতে দরবৃদ্ধির শীর্ষে থাকা প্রধান ১০টি কোম্পানি হলো জিবিবি পাওয়ার, পাওয়ার গ্রিড, বেক্সিমকো লিমিটেড, মাইডাস ফাইন্যান্স, লংকাবাংলা ফাইন্যান্স, রবি আজিয়াটা, সাইফ পাওয়ার, সামিট পাওয়ার, বিডি ফাইন্যান্স ও সিটি ব্যাংক।