নরসিংদীর প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেন হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি আশরাফ হোসেন সরকার পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলা-শহর আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসগঠনের নেতাকর্মী-সমর্থকরা। এ নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার আশরাফ হোসেন সরকারের মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে চিঠি দিয়েছেন জেলা ও পৌর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
চিঠিতে তৃণমূলের সিদ্ধান্ত বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেনের ছোট ভাই বর্তমান মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. কামরুজ্জামানকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
আশরাফ হোসেন সরকার মেয়র লোকমান হোসেন হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি। যিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছিলেন। গত বুধবার রাতে স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের সভায় নরসিংদী পৌরসভায় মেয়র পদে আশরাফ হোসেন সরকারকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়। এমন খবরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগ সব সময় সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ আর দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। সেখানে আশরাফের মতো হত্যা মামলার আসামি কীভাবে মনোনয়ন পান। তারা বলছেন, জেলা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে তিনজন প্রার্থীও নাম পাঠানো হয় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রে। এক নম্বরে ছিলেন নরসিংদী শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান মেয়র কামরুজ্জামান কামরুল। যিনি প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেনের ছোট ভাই। তালিকায় দুই নম্বরে ছিলেন শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন বাচ্চু ও তিন নম্বরে ছিলেন শহর আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান।
কিন্তু আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মকান্ডে ছিল না তার কোনো সম্পৃক্ততা। যিনি দলের কোনো পদেও ছিলেন না দীর্ঘদিন। সেই বিতর্কিত ও জনবিচ্ছিন্ন ব্যক্তি, যার বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও আছে। সেই আশরাফ সরকার নৌকার মনোনয়ন পাওয়ায় দলের ভেতরেই তীব্র অসন্তোষ চলছে।
নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক পীরজাদা কাজী মো. আলী বলেন, লোকমান হত্যার বিচারের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। সেই কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে আমি এখনো দায়িত্ব পালন করছি। এখন সেই আমি কী করে লোকমানের খুনি আশরাফ সরকারের জন্য মানুষের কাছে ভোট চাইতে যাব? আশরাফের মনোনয়ন বাতিল করে অন্য কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানিয়ে নেত্রীর কাছে চিঠি পাঠিয়েছি।
নরসিংদী শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন বাচ্চু বলেন, ‘আশরাফ হোসেন সরকারের মতো একজন হত্যা মামলার আসামিকে নৌকার প্রতীক বরাদ্দ দেওয়ায় আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা হতবাক ও ক্ষুব্ধ। তার এই মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আমরা কেন্দ্রেও চিঠি দিয়েছি। আশরাফ হোসেন সরকারকে ১০ বছরের মধ্যে আওয়ামী লীগের কোনো দলীয় পদে নেই, কোনো কর্মসূচিতেও দেখা যায়নি।’
নরসিংদীর শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান মেয়র কামরুজ্জামান কামরুল ও লোকমান হোসেন হত্যা মামলার বাদী বলেন, ‘আমার ভাইয়ের হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি হচ্ছেন আশরাফ সরকার আর ওই মামলার বাদী আমি। এখন আমি আওয়ামী লীগ করি, শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি। এখন ভাই হত্যার বিচার চাইব, নাকি নৌকার প্রার্থী সেই ভাইয়ের খুনির জন্য ভোট চাইব?’
জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান শামীম নেওয়াজ বলেন, ‘আমার ভাইকে যিনি হত্যা করলেন, আদালতে স্বীকারোক্তিও তিনি দিলেন। চার্জশিটও হলো। সেই খুনি এখন নৌকা প্রতীক পেলেন। আর আমি এখন জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হয়ে তার জন্য আমাকে ভোট চাইতে হবে। আমাদের নেত্রী নিশ্চয়ই বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবেন।’
জেলা শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘শুধু লোকমান হত্যার আসামিই নয়, একাধিক মামলার আসামি আশরাফ সরকার। আমরা নিশ্চিত বঙ্গবন্ধুর কন্যা আমাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রী একজন খুনিকে মনোনয়ন দিতে পারেন না, এটা কেউ ভুল তথ্য দিয়ে করিয়েছেন।
লোকমান হত্যা মামলা: ২০১১ সালের ১ নভেম্বর পৌর মেয়র লোকমান হোসেনকে জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এ হত্যার ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই বর্তমান মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. কামরুজ্জামান কামরুল বাদী হয়ে ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা করেন। ওই ঘটনায় আশরাফ হোসেন সরকারকে গ্রেপ্তার করা হলে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীও দেন। ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তৎকালীন জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামুনুর রশীদ মন্ডল দীর্ঘ ৮ মাস তদন্ত শেষে ২০১২ সালের ২৪ জুন সালাহউদ্দিনসহ এজাহারভুক্ত ১১ আসামিকে বাদ দিয়ে ১২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন। তাদের মধ্যে মামলার এজাহাভুক্ত তিনজন এবং হত্যার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে নয়জন আসামির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এজাহারভুক্ত তিন নম্বর আসামি শহর আওয়ামী লীগের সাবেক কোষাধ্যক্ষ মোবারক হোসেন, এজাহারভুক্ত দুই নম্বর আসামি নরসিংদী পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি আবদুল মতিন সরকার, তার ছোট ভাই শহর যুবলীগের সাবেক সভাপতি আশরাফ হোসেন সরকারসহ ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।
আদালতে দাখিল করা চার্জশিটে বলা হয়, নাজমুল হাসান ওরফে কিলার শরীফ সরাসরি হত্যাকা- সংঘটিত করে ৩০২ ধারার এবং হত্যার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করে মোবারক হোসেন ওরফে মোবা, আশরাফুল ইসলাম সরকার, আবদুল মতিন সরকার, হাজি ফারুক ও শাহিন মিয়া ১২০(খ) ধারার অপরাধে সংশ্লিষ্ট থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া অভিযুক্ত বাকি আসামি হাজী সেলিম, আওলাদ হোসেন, শিবলী সরকার ওরফে ইশু সরকার, হিরু, মাহফুজুর রহমান ওরফে সবুজ সরাসরি হত্যার উদ্দেশ্যে সহযোগিতা করে দন্ডবিধির ৩৪ ধারার এবং হত্যার আলামত নষ্ট করার চেষ্টা করে আসামি সারোয়ার হোসেনের ২০১ ধারার অপরাধ করার প্রমাণ পাওয়া গেছে।