সোনা, মাদক, মুদ্রা, মানবসহ যেকোনো পণ্য পাচারে ট্রানজিট রুট হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করছে আন্তঃদেশীয় অপরাধ চক্রের সদস্যরা। সীমান্তবর্তী এলাকা, নৌ ও বিমানবন্দরের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বল নজরদারির সুযোগ নিয়ে শতাধিক চক্র এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।
এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভৌগোলিক বিচারে এ উপমহাদেশে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। এখানে স্থল, সমুদ্র ও বিমানবন্দর রয়েছে। এসব সুবিধা ঘিরেই আন্তঃদেশীয় অপরাধীরা সক্রিয়। বিশেষ করে নৌপথ ব্যবহার করে অনুমোদিত পণ্যের সঙ্গে অনেক অবৈধ পণ্য দেশে আনা হচ্ছে। এরপর তা সহজেই সীমান্ত এলাকা দিয়ে পাচার করা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এসব অপরাধ পুরোপরি বন্ধ করা যাবে না। তবে নিয়ন্ত্রণে বন্দরকেন্দ্রিক বিশেষ জাতীয় ইউনিট গঠন করা যেতে পারে। কারণ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের পক্ষে সারা দেশের বন্দরকেন্দ্রিক অপতৎপরতা বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ দুটি সংস্থা যেসব ঘটনার তদন্ত করছে, তার অধিকাংশ রাজধানীকেন্দ্রিক। বন্দরকেন্দ্রিক বিশেষ জাতীয় ইউনিট হলে হয়তো অপরাধের মাত্রা কমে যাবে।’
সিআইডি ও সিটিটিসির একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, আন্তঃদেশীয় অপরাধ চক্রের হোতারা সবসময় দুর্বল নিরাপত্তাকে লক্ষ্যবস্তু করে। এজন্য ইউরোপীয় অঞ্চলের এক দেশ থেকে অন্য দেশে অবৈধ পণ্য পাচারে বাংলাদেশ রুট ব্যবহার করে তারা। কারণ এখানে বিভিন্ন বন্দরকেন্দ্রিক ও সীমান্তবর্তী এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দুর্বলতা রয়েছে। পাশাপাশি অপরাধ চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থার অনেক অসাধু কর্মকর্তা জড়িত।
পুলিশ কর্মকর্তারা ক্রমবর্ধমান আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমনে রাষ্ট্রভিত্তিক সহযোগিতা, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার (ইন্টারপোল) প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরত্বারোপ করছেন। সম্প্রতি ইন্টারপোলের সহায়তায় মানব পাচার চক্রের বাংলাদেশি দুই হোতা হোসেন শাহদাত ও ইকবাল জাফরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদেরসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোল রেড নোটিস জারি করেছিল। অন্যরা হলো মিন্টু মিয়া, স্বপন, নজরুল ইসলাম মোল্লা (মোল্লা নজরুল ইসলাম) ও তানজিরুল। এরা ৩৮ বাংলাদেশিকে ইউরোপে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করে। লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির ১৮০ কিলোমিটার দক্ষিণে একটি এলাকায় জিম্মি করে অর্থ আদায়ে পরিবারের কাছে নির্যাতনের ভিডিও পাঠায়। একপর্যায়ে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা এক পাচারকারীকে হত্যা করে। এরই প্রতিক্রিয়ায় পাচারকারীরা লিবিয়ার শিজদা শহরে গুলি করে ৩০ অভিবাসনপ্রত্যাশীকে হত্যা করে, যাদের মধ্যে ২৬ জন ছিলেন বাংলাদেশি নাগরিক।
বাংলাদেশ থেকে এসব মানুষ পাচারে যুক্ত ছিল রেড নোটিস জারি হওয়া ওই ছয়জন। পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) শাখা জানিয়েছে, রেড নোটিসের খড়গে থাকা বাকি চারজনকেও খোঁজা হচ্ছে। পাশাপাশি মুদ্রা, মাদক ও অন্যান্য অপরাধী শনাক্তে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
আন্তঃদেশীয় অপরাধ তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি পাচার হচ্ছে অর্থ। এরপরই মানব, মাদক, সোনাসহ বিভিন্ন দ্রব্য। আর এসব পাচার কাজে সক্রিয় রয়েছে শতাধিক চক্র। এসব চক্রের অধিকাংশ হোতা দেশের বাইরে অবস্থান করছে। তাদের নির্দেশনায় চক্রের দেশীয় সদস্যরা নানা কৌশলে আইনপ্রয়োগ সংস্থা বা অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দিয়ে পাচার কার্যক্রম করে। সীমান্ত এলাকার পাশাপাশি বিমান, ডাক, নৌপথেও সক্রিয় রয়েছে চক্রটি। তারা মাদক, সাপের বিষসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্য পাচারে প্রথমে ঢাকা টু মধ্যপ্রাচ্য রুট ব্যবহার করে। এরপর সেখান থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়।
সন্ত্রাসবাদ ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ ইউনিট (সিটিটিসি) গঠন করা হয়। সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশে সমুদ্র ও বিমানবন্দরে প্রতিদিন পণ্য লোড ও খালাস হয়। এসব ঘিরে দেশি-বিদেশি অপরাধ চক্র সবসময় সক্রিয় থাকে। আর্থিক লাভের আশায় অনেক কর্মকর্তা তাদের ফাঁদে পা দেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘অঞ্চল ও পণ্যভেদে চক্রটি ভিন্ন ভিন্ন রুট ব্যবহার করে। যেমন বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারে এ দেশের অপরাধীরা সবচেয়ে বেশি ভারতকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে। এশিয়ার অপরাধচক্র মধ্যপ্রাচ্যে কিছু পাচারে বাংলাদেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে।’
সিটিটিসির ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের উপকমিশনার মাহফুজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, আন্তঃদেশীয় অপরাধ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে তারা তৎপর রয়েছেন। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মানব, মাদকসহ অবৈধ মালামাল পাচারে সক্রিয় অন্যান্য চক্রের হোতাদের ধরতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি কুরিয়ার সার্ভিস ও বিমানযোগে পাচারের চেষ্টাকালে রপ্তানি কার্গো ভিলেজ থেকে বিপুল পরিমাণ এমফিটামিন মাদক উদ্ধারের ঘটনা তদন্তে আন্তর্জাতিক চক্রের সদস্যদের তথ্য বেরিয়ে আসে। এ চক্রের দেশীয় সদস্যরা ধরা পড়লেও অস্ট্রেলিয়া কিংবা ভারতীয়দের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। এরপরও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
তিনি আরও জানান, এমফিটামিন মাদক পাচার চক্রের মতো র্যাবের হাতে উদ্ধার মূল্যবান ধাতু ইউরোনিয়ামসহ তিন ব্যক্তি গ্রেপ্তার হলেও র্যাব ধাতুটির উৎস এবং গন্তব্য সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেনি। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার কোটি কোটি টাকা মূল্যের সাপের বিষসহ বেশ কয়েকজন দেশীয় সহযোগী গ্রেপ্তার হলেও দ্রব্যটির উৎস কিংবা গন্তব্য সম্পর্কে জানতে পারেনি তদন্তকারী কর্মকর্তারা।
রাজধানীর রামপুরা থেকে সাপের বিষ উদ্ধার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মাসুদ পারভেজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যা উদ্ধার করা হয়েছে, সত্যিকার অর্থে এগুলো কী, তা পরীক্ষার অনুমতি নেওয়া হয়নি। উৎস বা গন্তব্যে পৌঁছানো তো বহু দূর।’