ফ্রান্সফেরত সন্দেহভাজন জঙ্গি কারাগারে

আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে প্রবাসী এক বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে ফরাসি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তার নাম সাইফ রহমান (২৪)। তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর আগে প্রায় দুই মাস ফ্রান্সের প্যারিসের ডিপোর্টেশন সেন্টারে রেখে তদন্ত করে সে দেশের গোয়েন্দারা। তদন্তে সাইফের বিরুদ্ধে অনলাইনে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জিহাদি গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে বলে খুঁজে পান তারা। বিভিন্ন জঙ্গি নেতার সঙ্গে তার কথোপকথনের বেশকিছু নথিও উদ্ধার করা হয়। এরপরই প্যারিসের ডিপোর্টেশন সেন্টার থেকে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

গতকাল রবিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, সাইফ রহমানকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সে বাংলাদেশের কোনো জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সিটিটিসি জানায়, গত ১৪ জানুয়ারি সাইফ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসার পরপরই সিটিটিসির একটি টিম তাকে আটক করে। পরে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের কাছে অনুমতি চায় সিটিটিসির তদন্তকারী কর্মকর্তা। তবে আদালত রিমান্ড নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।

সিটিটিসি সূত্র জানায়, ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করার কারণে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি মেলেনি। তবে সাইফের বিরুদ্ধে ফ্রান্স থেকে যেসব নথিপত্র এসেছে তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে বিস্তারিত তদন্ত হচ্ছে। জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হবে। এরপর আবারও আদালতের কাছে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন করা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিটিটিসির এক কর্মকর্তা বলেন, ফ্রান্সের প্যারিসে সাইফ ও তার মা জেরিন রহমান একই সঙ্গে থাকতেন। সাইফ আটক হওয়ার কয়েক দিন পরই তার মা দেশে ফিরে আসেন। তবে বর্তমানে তিনি কোথায় অবস্থান করছেন সে বিষয়ে জানতে পারেনি সিটিটিসি। ছেলের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য এ জেরিন রহমানকেও খোঁজা হচ্ছে।

ফ্রান্স থেকে পাঠানো নথি ঘেঁটে সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন, বাবা-মার একমাত্র সন্তান সাইফ রহমান। তাদের গ্রামের বাড়ি ঢাকার দোহার-নবাবগঞ্জে। তার বাবার নাম লুৎফর রহামান। রাজধানীর ইংলিশ মিডিয়াম প্রতিষ্ঠান- ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ড স্কুল থেকে ২০১৪ সালে ‘ও’ লেভেল ও অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে ‘এ’ লেভেল সম্পন্ন করেন। পরে ২০১৬ সালে উচ্চতর ডিগ্রির জন্য ফ্রান্সের প্যারিসে যান। সেখানকার ইউনিভার্সিটি অব ডি-সেরগি পন্তাইজে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি প্যারিসের ইউনিভার্সিটি অব প্যানথিয়ন আসাসে প্রশাসন শাখায় খন্ডকালীন চাকরিতে যোগদান করেন। সেখান থেকে আটক হন। সিটিটিসি আরও জানায়, অধ্যয়ন ও চাকরিকালীন তার ওপর নজরদারি করছিল ফ্রান্স পুলিশ। একপর্যায়ে তাকে বাসা থেকে আটক করা হয়। আটকের পর সাইফকে প্রায় দুই মাস প্যারিসের একটি ডিপোর্টেশন সেন্টারে রাখা হয়।

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফ্রান্স পুলিশ জানিয়েছে, সাইফ প্যারিসে অবস্থান করাকালীন আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। ফ্রান্স পুলিশ তার ব্যবহৃত ইলেকট্রনিকস ডিভাইস পরীক্ষা করে একাধিক জিহাদি গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ পায়। তবে সে সহিংস কোনো হামলার জন্য পরিকল্পনা করেছিল কি না এ বিষয়ে পুলিশ কোনো তথ্য পায়নি। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, সাইফ আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন বলে তারা ধারণা করছেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিহাদি গ্রুপগুলোতে কোন দেশের নাগরিকদের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন তা জানার চেষ্টা চলছে। তার সঙ্গে আর কোনো বাংলাদেশি নাগরিক জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।