যদিও টেকসই উন্নয়নের জন্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বা ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন একটি শক্তিশালী উপাদান, কিন্তু এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য থাকলে তা এর প্রকৃত সুফলপ্রাপ্তিতে বাধা সৃষ্টি করে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি যত বাড়ে ততই নানান রকম উৎপাদনশীল সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ পায় সাধারণ মানুষ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের আর্থিক খাতে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে নানান ধরনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে যে, এই ধরনের অগ্রগতিতে অংশগ্রহণে পুরুষের তুলনায় নারীরা পিছিয়ে আছে। আর্থিক বিষয়ের জ্ঞান, আর্থিক বিষয়ে নানান ধরনের হিসাব-নিকাশ, ঋণপ্রাপ্তি, নানান ধরনের আর্থিক সেবা গ্রহণ, মোবাইল আর্থিক সেবাসহ বিভিন্ন রকম ডিজিটাল আর্থিক সেবায় অংশগ্রহণ ইত্যাদির সুযোগ ও ব্যবহারে নারী-পুরুষের ব্যবধান বা জেন্ডার বৈষম্য বিস্তর।
২০১৯ সালের ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ইনসাইটস কর্র্তৃক পরিচালিত জরিপে ফাইনান্সিয়াল অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ব্যবধান সুস্পষ্টভাবেই ধরা পড়েছে। এই জরিপে দেখা গেছে যে, পুরুষের তুলনায় নারীরা আর্থিক সেবাপ্রাপ্তিতে পিছিয়ে আছে। দেখা গেছে যে, ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা ছাড়া অন্য সব আর্থিক সেবা ও সুযোগের ক্ষেত্রে নারীরা পিছিয়ে। যেমন মোবাইল আর্থিক সেবার রেজিস্টার্ড গ্রাহকের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ব্যবধান ৫৮ ভাগ। আবার রেজিস্টার্ড ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে এই ব্যবধান ৩৩ ভাগ।
নানা রকম ডিজিটাল আর্থিক সেবা গ্রহণের সুযোগের সঙ্গে যেসব বিষয় সম্পৃক্ত থাকে সে ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ব্যবধান রয়েছে। যেমন মোবাইল ফোনের মালিকানা, ফোনের মাধ্যমে টেক্সট করার সক্ষমতা, ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি বা আর্থিক বিষয় সংক্রান্ত জ্ঞান ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ব্যবধান থাকায় সার্বিকভাবে ডিজিটাল পেমেন্ট অর্থ আদান প্রদানের ক্ষেত্রে প্রায় ৪৩ ভাগ জেন্ডার গ্যাপ দেখা যায়। সম্প্রতি জিএসএমএ কর্র্তৃক প্রকাশিত মোবাইল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০২০ অনুযায়ী নারী ও পুরুষের মধ্যে জনসংখ্যা অনুপাতে মোবাইল ফোন মালিকানার হার যথাক্রমে ৮৬ ভাগ ও ৬১ ভাগ। অর্থাৎ তাদের হিসাব অনুযায়ী মোবাইল ফোন মালিকানায় জেন্ডার গ্যাপ হচ্ছে ২৯ ভাগ। যেহেতু মোবাইলের মাধ্যমে সাধারণত স্বল্প আয়ের ও মধ্য আয়ের দেশের মানুষ ইন্টারনেট সেবা নিয়ে থাকে তাই নারীদের মোবাইল ফোন মালিকানা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় ইন্টারনেটের সুবিধা গ্রহণের মাত্রাও তাদের মধ্যে কম। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, মোবাইলের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা গ্রহণকারী পুরুষ ও নারীর হার মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর যথাক্রমে ৩৩ ভাগ ও ১৬ ভাগ, অর্থাৎ জেন্ডার বৈষম্য ৫২%।
অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ ব্যবধান দেখা যায়। অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সার্বিকভাবে ঋণপ্রাপ্তিতে উদ্যোক্তাদের থেকে পিছিয়ে থাকেন এ কথা সত্য কিন্তু এর মধ্যেও দেখা যায় যে, নারী উদ্যোক্তারা আরও বেশি পিছিয়ে রয়েছেন। বিভিন্ন ব্যাংক এবং ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত উদ্যোক্তা ঋণ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ঋণপ্রাপ্তিতে পুরুষদের তুলনায় নারী উদ্যোক্তাদের সংখ্যা যেমন কম তেমনি প্রাপ্ত ঋণের পরিমাণও কম। অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রদত্ত ঋণের মধ্যে ২০১৯ এ ৪ ভাগ ঋণ গিয়েছিল নারী উদ্যোক্তাদের কাছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জরিপে (সার্ভে অন ইম্প্যাক্ট অ্যানালিসিস অব এক্সেস টু ফাইন্যান্স ইন বাংলাদেশ) দেখা গেছে যে, দেশে বিভিন্ন ব্যাংকের শাখা এবং ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান ব্যাপ্তি ঘটা সত্ত্বেও এখনো প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার একটি বড় অংশ আর্থিক বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক সেবা থেকে বঞ্চিত। এর মূল কারণ হলো বিভিন্ন জায়গায় ব্যাংকিং সুবিধা না থাকা, সর্বনিম্ন ব্যালেন্স থাকার শর্ত, আর্থিক বিভিন্ন কার্যকলাপ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব, নানান রকমের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যেমন পরিচয় করিয়ে দেওয়ার লোকের অভাব, আয়ের প্রমাণপত্র না থাকা ইত্যাদি কারণে অনেকেই ব্যাংকিং সেবার আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবা নিতে পারেন না। নারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বেশি দেখা গেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে নারীদের ক্ষেত্রে এই ধরনের আর্থিক সেবা নেওয়ার জন্য বাইরে যাওয়া এখনো অনেক ক্ষেত্রেই খুব প্রচলিত নয়। বিভিন্ন ব্যাংকের শাখাগুলো সাধারণত গ্রামের বাজার কিংবা উপশহর এলাকায় হয়ে থাকে। উপজেলা সদরে সচরাচর নারীদের যাওয়া হয়ে ওঠে না কেবলমাত্র আর্থিক সেবা নেওয়ার জন্য। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ব্যাংক কর্তৃক এজেন্ট ব্যাংকিং চালু হওয়ার পরে এ অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে। তাছাড়া গ্রামীণ নারীদের মধ্যে যারা শিক্ষিত তারা বিভিন্ন এলাকার এটিএম বুথ ব্যবহারে কিছুটা আগ্রহী হয়েছেন। তারপরও ব্যাপকভাবেই নারীরা আসার ক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলো দেখা গেছে তার মধ্যে অন্যতম হলো শিক্ষার অভাব, আর্থিক সেবা গ্রহণ সংক্রান্ত নানা ভ্রান্ত ধারণা, আর্থিক সেবার ক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশ না থাকায় ইত্যাদি।
সাম্প্রতিক সময়ে এজেন্ট ব্যাংকিং এবং মোবাইলের মাধ্যমে আর্থিক সেবার কারণে আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবা গ্রহণে আগ্রহ বেড়েছে নারীদের মধ্যে। আবার অনেক শিল্প-কলকারখানা তাদের বেতন প্রদান করছে মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে। সেই কারণে নারীকর্মীদের মধ্যে এই ধরনের সেবার ব্যবহারের আগ্রহ বাড়ছে। তবে আরও বেশিসংখ্যক নারীকে এই ধরনের আর্থিক সেবা গ্রহণে আগ্রহী করতে হলে এজেন্ট ব্যাংকিং এবং মোবাইল আর্থিক সেবা নারী এজেন্টের সংখ্যা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বাড়ানো গেছে ব্যাপকভাবে। ২০১৯ এর শেষে ৫২ লাখ অ্যাকাউন্টধারীর মধ্যে ৫৬ ভাগ ছিল পুরুষ এবং ৪৩ ভাগ ছিল নারী। তবে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নানান রকম আর্থিক লেনদেনের সুবিধা নারীরা নিলেও এই ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ খুবই কম। কাজেই এজেন্ট ব্যাংকিং টাকা আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসেবে কিংবা সঞ্চয় জমানোর মাধ্যম হিসেবে ভালো কাজ করলেও ঋণের উৎস হিসেবে তেমন কার্যকর এখনো নয়। ফলে গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তারা ঋণপ্রাপ্তির যে সমস্যায় ভোগেন কিংবা আনুষ্ঠানিক খাত থেকে ঋণপ্রাপ্তিতে তাদের যে সমস্যা থাকে সেগুলো রয়েই যাচ্ছে।
নারীদের আর্থিক খাতে বেশি সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান নারীদের জন্য বিশেষায়িত আর্থিক সেবা চালু করেছে। যেমন নারীদের জন্য বিশেষ ক্রেডিট কার্ড চালু করেছে অনেক ব্যাংক। যে কার্ডধারীরা নারীদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য কেনাকাটায় অনেক ধরনের সুবিধা পান, ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সহযোগিতা পেয়ে থাকেন ইত্যাদি। তাছাড়া বিভিন্ন প্রযুক্তি সংস্থা আর্থিক সেবাকে সহজ করার জন্য নানান রকম আর্থিক প্রযুক্তি বা ফিনটেক-এর সম্প্রসারণে নিযুক্ত রয়েছেন। ফলে ব্যাংকিংসহ নানা রকম আর্থিক সেবাকে খুব সহজভাবে মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার উপায় তৈরি হয়েছে। তাছাড়া ফিনটেক-এর মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিভিন্ন সুবিধা মানুষের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যমে দৈনন্দিন জীবনের নানা রকম লেনদেন, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, ইত্যাদিকে সহজ করা হচ্ছে। যেমন মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী সংস্থা ‘বিকাশ’ সাম্প্রতিক সময়ে তাদের সেবার মধ্যে এই ধরনের বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করেছে, যার ফলে বিকাশের গ্রাহক সংখ্যা বাড়ছে। ভারতে ফিনটেক-এর মাধ্যমে বিশেষ ইলেকট্রনিক পরিচয়পত্র, ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর প্রদান ইত্যাদি সুযোগ তৈরির মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদেরও নানান রকম আর্থিক সেবা প্রদান করা যাচ্ছে। এই ধরনের প্রযুক্তি দিয়ে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের উদ্যোক্তাদের আর্থিক সেবা প্রদান করা যায় এবং তাতে অনেক নারী উদ্যোক্তা লাভবান হবেন কোনো সন্দেহ নেই।
দেশের উন্নয়নে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, নিরাপদে অর্থের লেনদেন, সরকারের সামাজিক সুরক্ষা সেবা প্রদানে সুশাসন নিশ্চিত করা, নানান রকম বিল প্রদান করায় সময় বাঁচানো ইত্যাদি ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির আর্থিক সেবা এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। এক্ষেত্রে যত বেশি মানুষকে সম্পৃক্ত করা যাবে সার্বিকভাবে নানান খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে তা ভূমিকা রাখবে। আর আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে বা আধুনিক আর্থিক সেবায় নারী-পুরুষের যে ব্যবধান রয়েছে তা দূর করা জরুরি। তাই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সম্প্রসারণ, মোবাইল আর্থিক সেবার সম্প্রসারণ ইত্যাদিতে নিয়মকানুন যেমন সহজ করতে হবে তেমনি অবকাঠামোগত উন্নয়নও জরুরি। তা ছাড়া সরকারি বিভিন্ন মাধ্যম যেমন টেলিভিশন-রেডিও ইত্যাদির মাধ্যমে আর্থিক খাতের আধুনিক সেবা গ্রহণ সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ ও তথ্য নিয়মিতভাবে প্রচারের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে জেন্ডার ব্যবধান কমিয়ে আনা গেলে তা সার্বিকভাবে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণে সহায়তা করবে, তেমনি উৎপাদনশীল খাতে নারী-পুরুষ উভয়ের অংশগ্রহণে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
লেখক সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)
nazneen7ahmed@yahoo.com