আত্মহত্যার আগে নার্স লাইজুর এসএমএস

‘তোমার মিথ্যা প্রতিশ্রুতির কাছে হেরে গেছি’

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) নার্স লাইজু আক্তারের (২৭) আত্মহত্যার পেছনে তার কথিত প্রেমিক মো. তানভীরের (৩২) প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। তার প্ররোচনায়ই বেশ কিছুদিন স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ রেখেছিলেন লাইজু। তবে সম্প্রতি তাদের (লাইজু ও তানভীর) সম্পর্কের বিষয়টি জানাজানি হলে লাইজুর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন তানভীরের মা ও স্ত্রী লতা। পুলিশ ও লাইজুর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

তারা জানান, মৃত্যুর আগে নিজের মোবাইল ফোন থেকে তানভীরকে পাঠানো এক এসএমএসে লাইজু লেখেন, ‘হেরে গেছি তোমার মিথ্যে প্রতিশ্রুতির কাছে।’ এ ছাড়া নিজ হাতে লেখা সুইসাইড নোটেও তানভীরকে দায়মুক্তি দিয়ে যান লাইজু। তবে তানভীর বেশ কিছুদিন ধরেই লাইজুকে ব্ল্যাকমেইল করত বলে দাবি করেছেন লাইজুর স্বামী সুজন পারভেজ। 

এর আগে গত শনিবার রাতে বিএসএমএমইউর নার্সিং হোস্টেলের ষষ্ঠ তলার বাথরুমে লোহার অ্যাঙ্গেলের সঙ্গে গলায় ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় লাইজুর মরদেহ উদ্ধার করে শাহবাগ থানার পুলিশ। এ ঘটনায় লাইজুর স্বামী সুজন পারভেজ শাহবাগ থানায় মো. তানভীরকে আসামি করে মামলা করেন। ঘটনার পর থেকেই পলাতক রয়েছে তানভীর।

লাইজুর গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার সিঙেরবাড়ি। তার স্বামী সুজন পারভেজ একজন ব্যবসায়ী। পাঁচ বছর আগে তাদের বিয়ে হয়। লাবিব নামে  দুই বছর বয়সী এক ছেলে সন্তান রয়েছে তাদের। হোস্টেলে থেকে বিএসএমএমইউর শিশু সার্জারির ৫ নম্বর ওয়ার্ডে চাকরি করতেন লাইজু। আর সুজন থাকতেন মিরপুরে।

ডিএমপির রমনা বিভাগের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (এসি) এস এম শামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে মনে হয়েছে এই মৃত্যুর পেছনে পরকীয়া প্রেমঘটিত বিষয় রয়েছে। আমরা তদন্ত করছি। খুব দ্রুত আসামি গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হব।’

এদিকে মৃত্যুর আগে এক আবেগঘন সুইসাইড নোট লিখে গেছেন লাইজু। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আমি কোনো অপরাধ করিনি, লতা আর সুজন মিলে আমার জীবনটাকে শেষ করে ফেলেছে। যেখানে মান সম্মান নাই, সেখানে বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়া সমান কথা। মানুষ যে নিজের স্বার্থের জন্য এতটা নিচে নামতে পারে তা আগে বুঝতে পারিনি তানভীর। যে আমার সম্মান মাটির সাথে মিশে দিল আর তুমি তাকে এভাবে কাছে টেনে নেবে বুঝতে পারিনি। আমার কোনো দোষ ছিল না। হাজার কষ্টের মাঝেও আজ সত্যি আর পারলাম না। হেরে গেলাম তোমার ভালোবাসার কাছে। ভালো থেকো সবাই। আমার কোনো প্রকার একসিডেন্টের জন্য কেউ দায়ী নয়। ভালো থাকো সাথী। সত্যি তোমার তুলনা হয় না।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিন থেকে চার মাস আগে শাহবাগ থানায় তানভীরের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা করতে এসেছিলেন লাইজু। এ সময় তার স্বামীকে থানার বাইরে রেখে ধর্ষণের বিষয়টি পুলিশকে এসে জানান তিনি। ওই সময় লাইজু জানান, করোনা ইউনিটে নাইট ডিউটি করার সময় তানভীর তাকে ধর্ষণ করেছে। এরপর আবার বাইরে গিয়ে তার স্বামীর সঙ্গে কথা বলে পুলিশকে জানান মামলা করবেন না। পারিবারিকভাবে তা মীমাংসা করবেন।’

পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, তানভীরের বাড়ি টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে। কয়েক বছর আগে তানভীরকে বিএসএমএমইউর লিফটম্যানের (দিনমজুরি) চাকরি দেন লাইজু। কিন্তু এরপর থেকেই লাইজুকে উত্ত্যক্ত করত তানভীর। বিষয়টি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছেও অভিযোগ করেন লাইজু। তিন মাস আগে লাইজুকে ধর্ষণও করে তানভীর। বিষয়টি নিয়ে পারিবারিকভাবে মীমাংসা করা হয়। কিন্তু একটা সময় পর তানভীরের সঙ্গে প্রেমে জড়িয়ে পড়েন লাইজু। তানভীর প্রতিনিয়ত লাইজুকে ব্যবহার করলেও স্ত্রীর স্বীকৃতি দিতে চাইত না। একপর্যায়ে তাদের প্রেমের বিষয়টি জানজানি হলে তানভীরের স্ত্রী লতা ও লাইজুর স্বামী সুজন এক হয়ে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। বিয়ের জন্য চাপ দিলে একপর্যায়ে তানভীর লাইজুর সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেয়। ফোনও ঠিকমতো রিসিভ করত না। এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন লাইজু। এক মাস স্বামীর সঙ্গেও কোনো যোগাযোগ ছিল না লাইজুর।

এদিকে আত্মহত্যার আগে স্বামী সুজন, প্রেমিক তানভীর ও মাকে বেশ কিছু এসএমএস করে গেছেন লাইজু। এর কিছু দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে। সেসব এসএমএস ঘেঁটে দেখা গেছে, স্বামী সুজনের ফোনে করা এসএমএসে লেখেন, ‘সুজন আমাকে মাফ করে দিও, ছেলেকে দেখে রেখো, কাছে রেখো।’

প্রেমিক তানভীরকে লেখেন, ‘তুমি আমাকে যে কষ্ট দিছো তার পর আর বেঁচে থাকার সাধ থাকে না। হেরে গেছি আমি, তোমার মিথ্যা প্রতিশ্রতির কাছে। তোমার মিথ্যা ভালোবাসার কাছে হেরে গেছি। সব শেষ করে দিলাম, ভালো থাকো। ভালো থাকো তুমি, তোমার ফ্যামিলি। আমাকে আর কারো কাছে খারাপ করো না।’

লাইজু তার মাকে এসএমএস করেন, ‘মা, আমার কপাল খুব খারাপ। আর কেউ না জানুক তুমি তো জানো আমার বাবা নেই বলে আজ এই করুণ পরিণতি। এত যুদ্ধ করে চলা যায় না।’

লাইজুর স্বামী সুজন পারভেজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তানভীর লাইজুকে সব সময় উত্ত্যক্ত করত। লাইজু আমাকে বলত তানভীর তাকে ব্ল্যাকমেল করছে। কিন্তু আমি বুঝতে পারি একপর্যায়ে লাইজু তানভীরের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে যায়। আমি অনেক অনুরোধ করলেও সে তানভীরের সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে গেছে। একপর্যায়ে তানভীরের স্ত্রী লতা আমাকে ফোন করে বিষয়টি বলে। আমরা চেষ্টা করেছি লাইজুকে ফিরিয়ে আনতে।’

তিন মাস আগে থানায় অভিযোগ করতে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সুজন বলেন, ‘লাইজু আমাকে সঙ্গে নিয়ে থানায় অভিযোগ করতে গিয়েছিল। অমাকে বাইরে রেখে ও থানার স্যারদের সঙ্গে কথা বলে। পরে বাইরে এসে বলে মামলা করব না। পারিবারিকভাবে সমাধান করব।’