রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আশার আলো দেখছে বাংলাদেশ। এ বছরের মাঝামাঝি থেকে প্রত্যাবাসন শুরু হতে পারে। চীনের মধ্যস্থতায় ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে মিয়ানমার চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রত্যাবাসন শুরু করতে মত দিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের পর পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বৈঠক সম্পর্কে আরও বলেন, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বছরের মাঝামাঝিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করা যেতে পারে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ভিন্ন ভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে। বাংলাদেশ চাইছে গ্রাম বা অঞ্চলভিত্তিক প্রত্যাবাসন। অন্যদিকে মিয়ানমার বলছে, এখন পর্যন্ত যতজনকে তারা যাচাই-বাছাই করেছে সেটি দিয়ে প্রত্যাবাসন শুরু করতে। বিষয়টি সমাধানের জন্য চীন মিয়ানমারকে প্রভাবিত করে কি না তার ওপর বাংলাদেশ অনেকাংশে নির্ভর করছে। প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য মিয়ানমার আরও সময় চাচ্ছে।
মাসুদ বিন মোমেন প্রত্যাবাসনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, ‘এর আগে যেহেতু দুটি ডেট দিয়ে আমরা সফল হতে পারিনি, এখন সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে কীভাবে সফল হওয়া যায় সেই চেষ্টাই থাকবে বাংলাদেশের।’
ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে গতকাল দুপুর ২টা থেকে দেড় ঘণ্টা ধরে সচিব পর্যায়ের এই বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন মাসুদ বিন মোমেন। চীনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুও জাওহুইয়ের সভাপতিত্বে বৈঠকে মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দেশটির আন্তর্জাতিক সহযোগিতা উপমন্ত্রী হাউ দো সুয়ান।
বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন সাংবাদিকদের বলেন, বছরের প্রথম কোয়ার্টারে আমরা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার জন্য প্রস্তাব দিয়েছি। তবে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে বছরের মাঝামাঝিতে নেওয়ার জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। আগামী ১ এপ্রিল থেকে তাদের জাতীয় সংসদে সভা থাকার কারণে এই সময় দিয়েছে তারা।পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ঠিক কী প্রক্রিয়ায় প্রত্যাবাসন শুরু হবে তা নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বৈঠকে চীনের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, প্রথম ধাপে যেসব রোহিঙ্গা যাবে তাদের চীনের পক্ষ থেকে করোনার টিকা দেওয়া হবে।
মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘আমরা খুব সিনসিয়ারলি এঙ্গেজড থাকব। কারণ এখন অনেকগুলো বিষয় আছে। এসব বিষয় মাথায় রেখে প্রত্যাবাসনের কাজ এগিয়ে নিতে হবে।’ পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি কশাসলি অপটিমিস্টিক, আমাদের ডিপ্লোম্যাটিক ভাষায় বলে আমরা চেষ্টা করে যাব, উইথ অল আওয়ার হার্ট অ্যান্ড সউল।’
পররাষ্ট্র সচিব প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশে মিয়ানমারের চুক্তির বিষয় তুলে বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় চুক্তি যদি অক্ষরে অক্ষরে পালিত হয়, সেখানে ১০ লাখের বেশি মানুষকে নিয়ে যেতে বছরের পর বছর লেগে যাবে। গত তিন বছরে ৯০ হাজার নতুন বাচ্চাও জন্মগ্রহণ করেছে। এভাবে যত দিন যাবে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। জটিলতাও বাড়বে। তাই আমি মনে করি প্রত্যাবাসন দ্রুত শুরু করার বিকল্প নেই।’
বৈঠকের সিদ্ধান্তের বিষয়ে মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহের মধ্যে আমাদের ওয়ার্কিং গ্রুপের মিটিংটা হবে এবং সেটার ব্যাপ্তি কিছুটা বাড়বে। আগে আমাদের ডিজি লেভেলের সঙ্গে চীন ও মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত থাকতেন। এবার বড় করে বৈঠক হবে। মিয়ানমারের নেপিদোতে যে ডিজি আছেন এবং বেইজিংয়ে ফরেন মিনিস্ট্রিতে যে যে ডিজি আছেন, উনারাও সংযুক্ত হবেন। দুই দেশের ডিজিদের মধ্যে একটা হটলাইন চালু হবে।
ছয় দফায় মোট ৮ লাখ জন রোহিঙ্গার তালিকা মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করেছে বাংলাদেশ সরকার, যার মধ্যে ৪২ হাজারের ভেরিফিকেশন করেছে মিয়ানমার।
এ বিষয়ে মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘ভেরিফিকেশনের যে ইস্যুটা আছে, সেটা যাতে আরও ত্বরান্বিত হয়, সেটা বলেছি। এটা সাইড বাই সাইড চলতে থাকে।’
রাখাইনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গঠনমূলক অংশগ্রহণে চীনের দিক থেকে বক্তব্য এলেও মিয়ানমার এ বিষয়ে কিছু উল্লেখ করেনি বলে জানান পররাষ্ট্র সচিব।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে সেনা অভিযান শুরুর পর কয়েক মাসের মধ্যে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। আগে থেকে বাংলাদেশে ছিল আরও চার লাখ রোহিঙ্গা। সব মিলিয়ে সরকারি হিসাবেই সাড়ে এগারো লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে রয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর থাকা-খাওয়া ও নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশ সংকটে পড়তে পারে বলে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে ২০১৭ সালের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে পড়ে। সেই চাপের মুখে বাংলাদেশের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে একটি সমঝোতা চুক্তি করে তারা। চুক্তি করলেও সেই প্রত্যাবাসন এখনো শুরু হয়নি। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর। চুক্তি অনুযায়ী তিন মাসের মধ্যে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন শুরুর কথা। কিন্তু গত তিন বছরেও শুরু হয়নি সে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া। এ যাবৎ একজন রোহিঙ্গাও ফেরত নেয়নি মিয়ানমার সরকার।
২০১৯ সালে দুই দফা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাখাইন রাজ্যের পরিবেশ নিয়ে শঙ্কার কথা তুলে ধরে ফিরতে রাজি হননি রোহিঙ্গারা। তারা যেন নিরাপত্তা, মর্যাদা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে স্বভূমিতে ফিরতে পারেন সেই বন্দোবস্ত করতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে। এর মধ্যে গত বছর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর জন্য মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে আহ্বান জানিয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।
প্রসঙ্গত, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনী নতুন করে অভিযান শুরুর পর গত ২৫ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। জাতিসংঘ রাখাইনের ওই সেনা অভিযানকে চিহ্নিত করেছে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ হিসেবে। গত কয়েক দশক ধরে আরও প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসে। ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ১৩ বছরে ২ লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত যায়। এরপর থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বন্ধ রয়েছে।
জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ
রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত নিতে নেপিদোতে স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তির পর বিদায়ী বছরের ২৩ নভেম্বর তিন বছর পার হয়েছে। কিন্তু এখনো শুরু করা যায়নি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন। কারণ হিসেবে বাংলাদেশ স্বীকার করছে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ওপর আর আস্থা রাখা যাচ্ছে না। উপায় আন্তর্জাতিক চাপ বাড়িয়ে বহুপক্ষীয় উদ্যোগ। তবে সেখানেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা হতাশাজনক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ শুরুর পর ওই বছরই ২৩ নভেম্বর নেপিদোতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে চুক্তি হয়। কিন্তু কাগজে-কলমে করা চুক্তির বাস্তব কার্যকারিতা আসেনি এখনো। চুক্তি অনুযায়ী তিন মাসের মধ্যে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন শুরুর কথা। এ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে, তালিকাও প্রস্তুত করে দিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ফল শূন্য।
২০১৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সরকারের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থো মিয়ানমারের ৬ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালি উর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, চীনের মধ্যস্থতায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে আশা দেখা যাচ্ছে। চীন পাশে থাকলে সমাধান সহজ হবে। তবে পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। এই কূটনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, নানা কারণে মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক রয়েছে। এক্ষেত্রে ভারতের সমর্থনও আদায় করতে হবে।