রসিকে দুর্নীতি

হোতাদের আড়াল করতে ফাঁসানো হচ্ছে আরেকজনকে!

রংপুর সিটি করপোরেশনের (রসিক) প্রয়াত সাবেক মেয়র শরফুদ্দিন আহাম্মেদ ঝন্টুর মেয়াদ শেষের দিকে তড়িঘড়ি করে দরপত্র আর কোটেশনের নামে ৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনার হোতাদের আড়াল করতে নিরপরাধ এক ব্যক্তিকে ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে। প্রতিকার চেয়ে ও প্রকৃত দুর্নীতিবাজকে আইনের আওতায় নিয়ে আসার দাবিতে মামলা পুনঃতদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরাবর আবেদন জানিয়েছেন ভুক্তভোগী রসিকের সাবেক ক্যামেরাম্যান কাম জনসংযোগ সহকারী গোলজার রহমান আদর। গত মঙ্গলবার দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বরাবর এ আবেদনপত্র পাঠানো হয়।

আবেদন সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগীর মূল দায়িত্ব ছিল রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়রের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ছবি তুলে সংরক্ষণ করা এবং তার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের খবর স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশ করা। পাশাপাশি তাকে ‘তথ্য কর্মকর্তা’ হিসেবেও দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর বাইরে তার কোনো দায়িত্ব ছিল না। কিন্তু মেয়র, নির্বাহী প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাঝেমধ্যে তাকে দিয়ে পত্রিকায় টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের জন্য দিয়ে বিজ্ঞপ্তির ফটোকপিটিতে স্বাক্ষরসহ ‘বুঝিয়া পাইলাম’ লিখিয়ে নিতেন। পরে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিসহ পত্রিকার কপিটিও তার থেকে বুঝে নিতেন। তাই কোনো টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না হওয়ার ক্ষেত্রে তার কোনো দায় নেই।

আদর আবেদনে দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে সরকারি কাজে নিয়োজিত থেকে দায়িত্বে অবহেলা, প্রতারণা ও জালিয়াতির যে মামলাটি করা হয়েছে সেটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। কারণ আলোচ্য মামলায় যেসব টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি ও পত্রিকার নাম উল্লেখ করা হয়েছে সেসবের কোনোটাই তাকে দেওয়া হয়নি এবং জানানোও হয়নি। তিনি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কোনোভাবেই জড়িত ছিলেন না। তাছাড়া সেটা তার দায়িত্বের মধ্যেও পড়ে না। ঠিকাদারি কাজের বিল দেওয়া থেকে শুরু করে বিল উত্তোলন পর্যন্ত পুরো কাজটি সম্পন্ন করে প্রকৌশল বিভাগ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ ঘটনায় প্রকৃতপক্ষে যারা জড়িত, অজ্ঞাত কারণে তাদের কাউকেই এ মামলায় আসামি করা হয়নি। অথচ বাস্তবিক অর্থে তার কোনোরকম সংশ্লিষ্টতা বা কোনো ধরনের দায়িত্বের এখতিয়ার না থাকা সত্ত্বেও তার নামে দায়িত্ব অবহেলার মামলা করা হয়েছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন মেয়র প্রয়াত শরফুদ্দিন আহাম্মেদ ঝন্টুর আমলের শেষের দিকে প্রায় ৩০ কোটি টাকার ৪৯টি প্যাকেজের দরপত্র ও ১৮টি কোটেশন আহ্বানের নামে পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করে প্রায় ৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এমদাদ হোসেন ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তার হোসেন আজাদের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে ২০১৮ সালের আগস্টের শেষে পত্রপত্রিকায় দুর্নীতির প্রতিবেদন প্রকাশ হলে বিষয়টি নিয়ে তুমুল আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়। তীব্র ক্ষোভের মুখে বিষয়টি আমলে নিয়ে দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয় রংপুরের সহকারী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলমকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তাকে রসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এমদাদ হোসেন ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক আকতার হোসেন আজাদের বিরুদ্ধে ৪৯টি প্যাকেজের দরপত্র ও ১৮টি প্যাকেজের কোটেশন পছন্দের ঠিকাদারকে পাইয়ে দিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎসহ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ বিষয়ে অনুসন্ধানপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। অনুসন্ধানের স্বার্থে তদন্ত কর্মকর্তা ২০১৯ সালের ৪ মার্চ ভুক্তভোগী গোলজার রহমান আদরকে সাক্ষীর জবানবন্দি দেওয়ার জন্য চিঠি পাঠালে একই মাসের ১০ তারিখে সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়।

কিন্তু রহস্যজনকভাবে তদন্ত কর্মকর্তা দুদক রংপুরের সহকারী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলমকে তদন্ত কাজ থেকে সরিয়ে দিয়ে উপসহকারী পরিচালক নূর আলমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

অভিযোগ আছে, মূল অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হওয়ায় মোটা অঙ্কের লেনদেনের মাধ্যমে তাদের বাঁচাতে তৎকালীন রংপুর দুদকের উপপরিচালক ফানাহ ফিল্লাহর যোগসাজশে জাহাঙ্গীর আলমকে বাদ দিয়ে নূর আলমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে সাক্ষীকেই আসামি করে উল্টো সরকারি কাজে নিয়োজিত থেকে দায়িত্ব অবহেলা ও প্রতারণার মামলা করেন তদন্ত কর্মকর্তা নূর আলম।

২০১৯ সালের জুনের ২৭ তারিখে করা মামলায় সাক্ষীর বিরুদ্ধে টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি পত্রিকায় প্রকাশ না করার দায়িত্ব অবহেলা, প্রতারণা ও জালিয়াতির মিথ্যা ও মনগড়া অভিযোগ আনা হয়।

সমন্বিত জেলা কার্যালয় রংপুরের দুর্নীতি দমন কমিশনের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, মামলার বিষয়টি আমার নলেজে আছে। তবে মামলাটি এখন দেখি না।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের দুর্নীতি দমন কমিশনের রংপুরের উপসহকারী পরিচালক নুর আলম বলেন, মামলাটি তদন্তাধীন। তবে অতি উৎসাহী হয়ে কেউ তাকে ফাঁসিয়েছে কি না এমন প্রশ্নের সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।