দেশে করোনাকালে সার্বিক দারিদ্র্যের হার বেড়ে হয়েছে ৪২ শতাংশ, যা ২০১৮ সালে ছিল ২১.৬ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে ছিল ২৪.৩ শতাংশ। এর মধ্যে চরম দারিদ্র্যের হার বেড়ে হয়েছে ২৮.৫ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে ছিল জাতীয়ভাবে ১২.৯ শতাংশ, ২০১৮ সালে ছিল ৯.৪ শতাংশ। এছাড়া করোনার প্রভাবে ব্যাপক হারে বৈষম্যও বেড়েছে। গতকাল শনিবার প্রকাশিত ‘দারিদ্র্য ও জীবিকার ওপর কভিড-১৯ মহামারীর প্রভাব : সানেমের দেশব্যাপী জরিপের ফলাফলে এই তথ্য উঠে এসেছে। এ উপলক্ষে এক ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওয়েবিনারে জরিপের ফল উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। ওয়েবিনারে আলোচক হিসেবে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান এবং অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। ওয়েবিনারে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ৭০ জন অংশগ্রহণ করেন।
জরিপের ফল উপস্থাপনের সময় ড. সেলিম রায়হান বলেন, এই জরিপের মূল উদ্দেশ্য ছিল কভিড পূর্ববর্তী সময়ের সঙ্গে কভিড-পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও কর্মসংস্থানের স্বরূপ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া। ২০১৮ সালে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সঙ্গে সানেমের করা জরিপের মধ্যে থেকে ৫৫৭৭টি খানার ওপর এই জরিপটি ফোনকলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। দেশব্যাপী এই জরিপটি ২০২০ সালের ২ নভেম্বর থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত হয়।
জরিপে পাওয়া গিয়েছে যে, করোনাকালে সার্বিক দারিদ্র্যের হার বেড়ে হয়েছে ৪২ শতাংশ, ২০১৮ সালে জিইডি-সানেমের জরিপে যা ছিল ২১.৬ শতাংশ এবং ২০১৬ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা জরিপ অনুসারে ২৪.৩ শতাংশ। বিবিএসের খানা জরিপ অনুসারে ২০১৬ সালে গ্রামাঞ্চলের সার্বিক দারিদ্র্য ছিল ২৬.৪ শতাংশ, ২০১৮ সালের জিইডি সানেম জরিপ অনুসারে যা ছিল ২৪.৫ শতাংশ, করোনাকালে ২০২০ সালে এই হার বেড়ে হয়েছে ৪৫.৩ শতাংশ। শহরাঞ্চলে সার্বিক দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালে ছিল ১৮.৯ শতাংশ, ২০১৮ সালে ছিল ১৬.৩ শতাংশ আর করোনাকালে ২০২০ সালে এই হার বেড়ে হয়েছে ৩৫.৪ শতাংশ।
চরম দারিদ্র্যের হারের ক্ষেত্রে ২০১৬ সালে বিবিএসের খানা জরিপ অনুসারে এই হার ছিল জাতীয়ভাবে ১২.৯ শতাংশ, ২০১৮ সালে জিইডি-সানেম জরিপ অনুসারে ৯.৪ শতাংশ, তবে ২০২০ সালে মহামারীর প্রভাবে এই হার বেড়ে হয়েছে ২৮.৫ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে চরম দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালে ছিল ১৪.৯ শতাংশ, ২০১৮ সালে ১১.২ শতাংশ এবং মহামারীর সময়ে ২০২০ সালে গ্রামাঞ্চলে চরম দারিদ্র্যের হার বেড়ে হয়েছে ৩৩.২ শতাংশ। শহরাঞ্চলে চরম দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালে ছিল ৭.৬ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৬.১ শতাংশ কিন্তু ২০২০ সালে বেড়ে হয়েছে ১৯ শতাংশ।
প্রাক-কভিড এবং কভিড পরবর্তী পরিস্থিতিতে জাতীয় পর্যায়ে অসমতার তুলনা করার জন্য গিনি সহগ ব্যবহার করা হয়েছে। গিনি সহগ ২০১৬ সালের ০.৩২ থেকে কমে ২০১৮ সালে ০.৩১ এবং ২০২০-এ আবার বেড়ে ০.৩২-এ পরিণত হয়েছে।
ড. এম এম আকাশ বলেন, কভিডের কারণে যে ক্ষতি হলো এটি কি স্বল্পমেয়াদি, নাকি এত বছরের অগ্রগতির ওপরে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ল, সেটি ব্যাখ্যার বিষয়। দেশের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে পুনরুদ্ধারের জন্য শিক্ষা খাতকে যত দ্রুত সম্ভব চালু করতে হবে, স্বাস্থ্য খাতে ভর্তুকি দিতে হবে, কর্মসংস্থানের পরিবর্তনগুলো স্বীকার করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, মধ্যম থেকে দীর্ঘমেয়াদি পর্যায়ে দারিদ্র্যের ওপর প্রভাব পড়ছে এবং কভিড-১৯ এর পূর্বের দারিদ্র্যবিষয়ক অর্জনগুলো কভিড-১৯ এর প্রভাবে উলটে যাবে, সেই ধারণাটি আরও জোরাল হয়েছে এই সমীক্ষার মাধ্যমে। স্বাভাবিক সময়েও আয় বৈষম্য, সম্পদ বৈষম্য ও ভোগ বৈষম্য বজায় ছিল, অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল অসম।
ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দারিদ্র্যের ভৌগোলিক আওতা ছড়িয়ে পড়েছে, গ্রামেও যে হারে দারিদ্র্য বেড়েছে শহরেও সেই একই হারে বেড়েছে। আবার যেখানে আগে দারিদ্র্য কম ছিল সেখানেও ব্যাপক বেড়েছে, যেখানে বেশি ছিল সেখানেও ব্যাপক বেড়েছে। দারিদ্র্যের বহুমুখী ধারণা, যেমন শিক্ষা চিকিৎসায় প্রভাব, সে বিষয়গুলোও উঠে এসেছে।