করোনাভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম রোগী শনাক্ত হয় চীনের উহানে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর। মাত্র দুই মাসের মাথায় তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, মহামারীতে রূপ নেয়। এপ্রিল-মে নাগাদ বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪০০ কোটি মানুষ একযোগে ঘরবন্দি হয়ে পড়ে। মানবজাতিকে এই দুর্দশা থেকে মুক্তি দিতে দিনরাত পরিশ্রম করে চলেন অণুজীববিজ্ঞানী, চিকিৎসাবিদ ও গবেষকরা। তাদের মূল লক্ষ্য হলো ভাইরাসটির জীবন-রহস্য সম্পর্কে জানা এবং সেই অনুযায়ী প্রতিরোধ, প্রতিকার এবং কার্যকর টিকা আবিষ্কার করা। ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভাইরাসটি জিনোম সিকোয়েন্স হয়েছে, সে পথ ধরে তৈরি হচ্ছে টিকাও। ভাইরাসটির জীবন-রহস্য উদঘাটনের এই কৃতিত্ব বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদেরও।
জিনোম সিকোয়েন্স কী?
ইংরেজি শব্দ জিনোমের বাংলা অর্থ দাঁড়ায় বংশাণুসমগ্র। কোনো জীব প্রজাতির প্রতিটি স্বতন্ত্র জীব যেসব বংশগতিমূলক তথ্য (বংশাণু বা জিন) বহন করে, তাদের সমষ্টি বা সামগ্রিক অনুক্রমকে বংশাণুসমগ্র বলে। অর্থাৎ কোনো জীবের বংশাণুসমগ্রে ওই জীবের বংশগতিমূলক সব তথ্য সংকেতায়িত থাকে। জিনোম সিকোয়েন্স উদঘাটনকে সহজভাবে বললে এভাবে বলা যায়, কোনো ভাইরাসের উৎস, গতি, প্রকৃতি ও বিস্তার সঠিকভাবে জানা। যেকোনো মহামারী নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে ওই ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স জানা খুবই জরুরি। যত দ্রুত এটা জানা সম্ভব হবে, তত দ্রুত এটা প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
করোনার প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানীরা এই ভাইরাসের জিনোম উদঘাটনের কাজে লেগে যায়। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরাও চেষ্টা চালাতে থাকেন ভাইরাসের জিনোম উদঘাটনে। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিএইচআরএফ) আট সদস্যের একটি গবেষক দল গত মে মাসে বাংলাদেশে প্রথম করোনার জিনোম সিকোয়েন্সের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করে। ওই দলের নেতৃত্বে ছিলেন সিএইচআরএফের নির্বাহী পরিচালক ডা. সমীর কুমার সাহা ও সংস্থাটির গবেষক ডা. সেঁজুতি সাহা। সম্পর্কে তারা বাবা ও মেয়ে। এরপর জুলাইয়ে ১৭১টি করোনাভাইরাসের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্সের কথা জানায় বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) জিনোমিক রিসার্চ সেন্টারের একদল বিজ্ঞানী।
বিসিএসআইআর ও সিএইচআরএফ ছাড়াও গত বছরের জুনে দেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে করোনাভাইরাসের তিনটি নমুনার জীবন-রহস্য উন্মোচন করে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। ডিসেম্বরে করোনার জীবন-রহস্য উন্মোচন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক দল গবেষক।
বাবা-মেয়ের সাফল্য
করোনাভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সে বাংলাদেশে প্রথম আশার আলো দেখান বাংলাদেশি অণুজীববিজ্ঞনী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. সমীর কুমার সাহা ও তার মেয়ে বিজ্ঞানী ডা. সেঁজুতি সাহা। তারা গণমাধ্যমকে জানান, করোনাভাইরাসের জিনোম উদঘাটনে সাফল্য অর্জন করেছে সিএইচআরএফ। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সিএইচআরএফ ডেঙ্গু, ইনফ্লুয়েঞ্জা, সার্চসহ বিভিন্ন ভাইরাসের জীবন-রহস্য উন্মোচনে কাজ করে আসছে। সেই সঙ্গে সংগঠনটি স্বেচ্ছা উদ্যোগে মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে। ডা. সেঁজুতি সাহার নেতৃত্বে সিএইচআরএফের আট সদস্যের একটি গবেষক জিনোম সিকোয়েন্সের ম্যাপিংয়ের কাজ করে।
সমীর কুমার সাহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ কাজ করার জন্য যেসব জিনিসপত্র প্রয়োজন ছিল তার অনেক কিছুই আমাদের সামর্থ্যরে বাইরে ছিল। আমরা খুবই হালকা যন্ত্রপাতি দিয়ে করোনার জিনোম সিকোয়েন্স করেছি। ভাইরাসের মিউটেশন হবে এটা খুবই স্বাভাবিক। আমরা গবেষণায় দেখেছি, আমাদের দেশে মিউটেশন খুবই ধীরগতির, মাসে দুবার হয়। এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। যুক্তরাজ্যে ভাইরাসের নতুন ধরন নিয়ে আমাদের দেশেও যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে তা পুরোপুরি সঠিক নয়। এ পর্যন্ত আমাদের দেশ থেকে ৭০০টি নমুনার সম্পূর্ণ সিকোয়েন্স জিআইএসএআইডির ওয়েবসাইটে জমা দেওয়া হয়েছে। ফলে করোনার যে ভ্যাকসিন আসবে, সেটাকে ভাইরাস দুর্বল করতে পারবে না।’
বর্তমানে সিএইচআরএফ দেশে করোনাভাইরাসের পরিবর্তন ও গতিপ্রকৃতি নজরদারিতে একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে। দেশে এ ভাইরাসটির নতুন কোনো ধরনের প্রবর্তন ও প্রাদুর্ভাব বুঝতে এবং অন্য প্রকরণগুলোর গতিপ্রকৃতির ওপর নজরদারিতে সহায়তার লক্ষ্যে বাংলাদেশের গবেষকদের জন্য সিএইচআরএফ নেক্সটস্ট্রেইন ওয়েবসাইটে বাংলাদেশকেন্দ্রিক একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশন।
বিসিএসআইআর করোনার জিনোম গবেষণা
দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর এর পূর্ণাঙ্গ জীবন-রহস্য উদঘাটনের নামে বিসিএসআইআরের জিনোমিক রিসার্চ সেন্টার। সেন্টারের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সেলিম খান এ কাজে নেতৃত্ব দেন। দেশের আট বিভাগ থেকে সংক্রমণ হার ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে মোট ৩০০ করোনাভাইরাস নমুনার সিকোয়েন্সিং সম্পন্ন করার জন্য জিনোমিক রিসার্চ সেন্টার কাজ শুরু করে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার বাংলাদেশ (এনআইএলএমআরসি)-এর সার্বিক সহযোগিতায় সারা দেশ থেকে নমুনা ও রোগীদের মেডিকেল ইতিহাস সংগ্রহ করা হয়। আট বিভাগ থেকে নমুনা সংগ্রহের হার ছিল ঢাকা ৮০টি, চট্টগ্রাম ৬০টি, সিলেট ২০টি, রংপুর ৩২টি, খুলনা ৩৪টি, ময়মনসিংহ ২৪, বরিশাল ২২টি ও রাজশাহী ৩৮টিসহ মোট ৩১০টি।
বিসিএসআইআর করোনার জিনগত বৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ করার জন্য ৪১০টি নমুনার সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স করে। এদের মধ্যে ৩০২টি জিনোম সিকোয়েন্সিং ডেটা পাওয়া যায়। এগুলো বিশ্লেষণ করা হয়। এসব নমুনা সংগ্রহ করা হয় ৭ মে থেকে ২১ অক্টোবরের মধ্যে। জিনোমিক রিসার্চ ল্যাবরেটরি বিসিএসআইআরের করোনাভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং তথ্য বিশ্বের সংশ্লিষ্ট সব বিজ্ঞানীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করে। এ জন্য তারা উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম জার্মানির গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডেটায় (জিআইএসএআইডি) তাৎক্ষণিকভাবে জমা দেওয়া হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের সব টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা কভিড ভাইরাসের নতুন নতুন পরিবর্তনের খোঁজে জিআইএসএআইডির তথ্যের দিকে নজর রাখেন। বিসিএসআইআর তাদের সিকোয়েন্সকৃত সব ভাইরাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশ্বের অগ্রগামী ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী ৫২টি প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে দেয়।
জিনোম রিসার্চ ল্যাবরেটরির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সেলিম খান দেশ রূপান্তরকে জানান, এ পর্যন্ত ৩০২টি কভিড-১৯ ভাইরাসের জিনোম বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, নিউক্লিওটাইড পর্যায়ে মোট ৭৩৭টি সাইটে মিউটেশন (ভাইরাসের পরিবর্তিত অবস্থা) হয়। এর মধ্যে ৩৫৮ অ্যামিনো এসিড প্রতিস্থাপন ঘটে। সারা বিশ্বে নমুনা প্রতি মিউটেশন হার ৭ দশমিক ২৩, যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১২ দশমিক ৬ লক্ষ করা যায়। অর্থাৎ অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে কভিড-১৯ ভাইরাসটি অনেক দ্রুতগতিতে রূপ বদলেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্বে ছয় ধরনের কভিড-১৯ ভাইরাস বিচরণ করলেও বর্তমানে বাংলাদেশে চার ধরনের কভিড-১৯ ভাইরাসের বিচরণ লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশের কভিড-১৯ ভাইরাসের জিনোম ডেটাও আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে কাজ করে যাওয়া বিজ্ঞানীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন বাংলাদেশের জনগণের ওপরও শতভাগ কার্যকরী হবে।
ড. সেলিম খান আরও জানান, করোনায় আক্রান্ত রোগীর দীর্ঘ দিন অসুস্থতার কারণ উদঘাটনের জন্য ৩০২টি নমুনার মধ্যে ১০২টি নমুনার স্বল্প মেয়াদি সিকোয়েন্স করা হয়। এর দ্বারা আক্রান্ত রোগীর কভিড-১৯ ভাইরাসের পাশাপাশি অন্যান্য প্যাথজেনেরসহ আক্রান্ত লক্ষ্য করা যায়। আক্রান্ত রোগীর নিউমোনিয়াসহ ফুসফুসে রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি দেখা যায়। এসব ডেটার বিষয়ে মেলবোর্ন ও নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বিসিএসআইআর একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। প্রতিষ্ঠান দুটির বায়োইনফরমেটিক্স গবেষক দল বাংলাদেশের জনসাধারণের ওপর কভিড-১৯সহ আক্রান্ত প্যাথজেনের প্রভাববিষয়ক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় যুক্ত আছেন। জিনোমিক গবেষণাগারের গবেষণালব্ধ ফলাফল ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রি-প্রিন্ট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। আমেরিকান সোসাইটি অব মাইক্রোবায়োলজির পিয়ার রিভিউ জার্নাল মাইক্রোবায়োলজি রিসোর্স অ্যানাউন্সমেন্টেও প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া তিনটি রিসার্চ পেপার আন্তর্জাতিক জার্নালে শিগগিরই প্রকাশিত হওয়ার জন্য জমা দেওয়া হয়েছে।
লেখক : সাংবাদিক