চাহিদা ও উৎপাদন বেড়েছে মাস্কের

মানসম্মত মাস্ক উৎপাদনে নীতিমালা চান ভোক্তারা

বিশ্বজুড়ে করোনা সুরক্ষাসামগ্রীর অন্যতম হচ্ছে মাস্ক। এই মাস্ক একসময় শুধু আমদানিনির্ভর ছিল, বর্তমানে সেটি তৈরি হচ্ছে দেশেই। ব্যক্তিপর্যায়ে ছোট-বড় কারখানায় মাস্ক তৈরি হচ্ছে। এমনকি করোনা প্রতিরোধে কার্যকর কেএন-৯৫ মাস্কও তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশে। পুরান ঢাকার মিটফোর্ড, কেরানীগঞ্জ, কামরাঙ্গীরচর, সিদ্দিকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হচ্ছে সার্জিক্যাল মাস্ক, কাপড়ের মাস্কসহ বিভিন্ন ধরনের মাস্ক। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় মাস্কের দামও এসেছে হাতের নাগালে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনা সংক্রমণের আগে দেশে নামে মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সার্জিক্যাল মাস্ক তৈরি করত। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য কাপড়ের মাস্কও তৈরি করত কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান। করোনার আগে থেকেই সার্জিক্যাল মাস্ক তৈরি করত আরএফএল গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গেটওয়েল লিমিটেড। আরএফএলের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল জানান, তাদের প্রতিষ্ঠান সার্জিক্যাল মাস্ক উৎপাদন শুরু করে ২০১৫ সালে। করোনা সংক্রমণ শুরুর আগে গেটওয়েল দৈনিক ১৫ হাজার মাস্ক তৈরি করত। তাদের মূল ক্রেতা ছিলেন বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসাকর্মীরা। এখন তারা দৈনিক প্রায় তিন লাখ পিস মাস্ক উৎপাদন করছে। আর তাদের প্রধান ক্রেতাসাধারণ মানুষ।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে তিন ধরনের কাপড়ের মাস্ক তৈরি হয়। নন ওভেন ফেব্রিকসের তৈরি মাস্ক, ওভেন কাপড় (শার্টের কাপড় বলে পরিচিত) ও নিট কাপড়ের মাস্ক (গেঞ্জির কাপড় বলে পরিচিত)। কিছু কিছু ক্ষেত্রে গামছার তৈরি কাপড়ের মাস্কও বাজারে বিক্রি হয়। রাজধানীর বাবুবাজার, বিএমএ মার্কেটসহ বিভিন্ন মার্কেটে অন্তত ৩০ ধরনের মাস্ক পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে এন-৯৫ ও কেএন-৯৫ আমদানি করা। অন্যগুলো দেশেই উৎপাদন হচ্ছে। দেশে নন-ওভেন ফেব্রিকসের পাতলা সার্জিক্যাল মাস্ক, মেল্টব্লোন কাপড়ের মাস্ক, কেএন-৯৫ মাস্ক, এন-৯৫ মাস্ক, এন-৯৫থ্রি এম মাস্ক, নিঞ্জা মাস্ক, পিপি ওভেন ফেব্রিকসের মাস্ক, ওভেন কাপড়ের মাস্ক, নিট কাপড়ের মাস্ক, ডেনিম (জিন্স) কাপড়ের মাস্ক এবং সোয়েটারের কাপড়ের মাস্ক বিক্রি হতে দেখা যায়। দেশের বিভিন্ন পোশাকের ব্র্যান্ডের দোকানেও এখন দেদার মাস্ক বিক্রি হয়।

উৎপাদকরা জানান, সার্জিক্যাল মাস্কের নন-ওভেন কাপড় মূলত চীন থেকে আমদানি করা হয়। এখন ছোট ছোট কারখানায় প্রচুর মাস্ক উৎপাদিত হচ্ছে। তৈরি পোশাক উৎপাদনকারীরা করোনাকালে মাস্ক তৈরি শুরু করেছেন।

দেশে প্রথমবারের মতো কেএন-৯৫ উৎপাদন শুরু করেছে চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জেএমআই গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে মাস্কটি তৈরি করা হয়েছে। জেএমআই গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান জেএমআই হসপিটাল রিক্যুইজিট ম্যানুফেকচারিং লিমিটেড এই মাস্ক উৎপাদন করছে। যদিও গত বছরের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নকল মাস্ক সরবরাহের অভিযোগে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রতিষ্ঠানটির মালিককেও গ্রেপ্তার করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এই অভিযোগে এখনো মামলা চলছে।

মাস্ক উৎপাদন বিষয়ে জেএমআই গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কেএন-৯৫ মাস্কে তিন স্তরের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ফিল্টার পেপারসহ পাঁচটি সুরক্ষা স্তর রয়েছে। ইতিমধ্যে দেশ-বিদেশের পরীক্ষাগারে মাস্কের মান ও যোগ্যতা পরীক্ষা করা হয়েছে। বর্তমানে আমদানি করা চীনা কেএন-৯৫ মাস্ক দেশের বাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩০০ টাকায়। একই মানের মাস্ক জেএমআই বিক্রি করবে ১০০ টাকায়।’

জেএমআই গ্রুপের চেয়ারম্যান জাবেদ ইকবাল পাঠান বলেন, গত বছরের এপ্রিলের পর দেশে যখন করোনা রোগী শনাক্ত ও মৃত্যুর হার বাড়তে শুরু করে, তখন আন্তর্জাতিক মানের মাস্কসহ নানা সরঞ্জাম তৈরি করে আমরা সরকারকে সহায়তা দিই, যা ওই দুঃসময়ে দেশের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দেওয়া সম্ভব ছিল না। এ ছাড়া করোনাভাইরাস মোকাবিলায় চীনকে বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসাসামগ্রী দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। সেখানে ১০ লাখ হ্যান্ড গ্লাভস সরবরাহ করা হয়, যা উৎপাদন করেছে জেএমআই। আমরা জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি সামনে রেখে মাস্ক উৎপাদন করছি। আশা করছি আমাদের মানসম্মত মাস্ক ব্যবহারে সর্বস্তরের মানুষ করোনা সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকবে।

রাজধানীর বাবুবাজারে দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতুর নিচে মাস্কের পাইকারি হাট বসে। ঢাকাসহ দেশের জেলায় জেলায় যেসব মাস্ক সরবরাহ হয়, তার বড় অংশ সরবরাহ হয় এই বাবুবাজার থেকে। এখানে দাম বাড়লে-কমলে সারা দেশের খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়ে। এখান থেকে সারা দেশে মাস্ক নিয়ে যান পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা। অনেকে ব্যক্তি উদ্যোগে এখান থেকে মাস্ক কিনে ফার্মেসি ও দোকানে দোকানে দেন। তাদের চেষ্টায় অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, এখন বিড়ি-সিগারেটের দোকানেও মাস্ক পাওয়া যায়। এসব দোকানে মাস্কের বিক্রিও প্রচুর।

বাবুবাজারের ব্যবসায়ী আহসান আলী দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, শীতে ঠাণ্ডাজনিত রোগের প্রকোপ বেড়েছে। তার সঙ্গে বেড়েছে সর্দি-কাশি-জ্বরের মতো অসুখগুলো। আর এগুলো যেহেতু করোনার লক্ষণ, তাই মানুষের মধ্যে নতুন করে ভীতি ছড়াচ্ছে। এই অবস্থায় মাস্কের চাহিদাও বেড়েছে।

অনেকে বলছেন এখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। করোনা শুরুর পর গত আগস্ট সেপ্টেম্বর মাসে মাস্কের চাহিদা কিছুটা কমে যায়। আবার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু, আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা কিছুটা বাড়াতে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে। আর এতে বেড়েছে মাস্কের চাহিদা।

বাবুবাজারের মায়ের দোয়া স্টোরের মালিক আতাউর রহমান বলেন, সরকারিভাবে মাস্কের ব্যবহারের বিষয়ে নানামুখী প্রচার চালানো হচ্ছে। সরকারি অনেক দপ্তরে ‘নো মাস্ক নো এন্ট্রি’ এমন নীতি কার্যকর করা হয়েছে। এটা সঠিকভাবে মেনে চলার কারণে মাস্কের চাহিদা বেড়েছে। এ ছাড়া মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। পাবলিক ও প্রাইভেট যানবাহনে মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব কারণে দিনকে দিন মাস্কের চাহিদা বাড়ছে।

পাইকারি বাজারে প্রতিটি মাস্ক ১ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হয়। আর খুচরা বাজারে ২ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। বাবুবাজারের পাইকারি দোকানে সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক প্রতিটি ১ থেকে ৫ টাকা দরে বিক্রি হয়। একই মাস্ক ঢাকার খুচরা দোকানে ৫ থেকে ১০ টাকা দরে বিক্রি করেন বিক্রেতারা। নন-ওভেন ফেব্রিকসের বিভিন্ন মাস্ক প্রতিটি ২ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ৩ টাকা, নিঞ্জা মাস্ক ১৩ থেকে ১৪ টাকা, ওভেন কাপড়ের মাস্ক ৯ থেকে ১০ টাকা, নিট কাপড়ের মাস্ক ৮ থেকে ৯ টাকা এবং দেশে তৈরি কেএন-৯৫ মাস্ক ১৫ থেকে ২০ টাকা, বিদেশ থেকে আমদানি করা এন-৯৫ মাস্ক ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং এন-৯৫ থ্রিএম মাস্ক ২৮০ থেকে ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

ঢাকার ফুটপাতে ১০ থেকে ২০ টাকায় বিভিন্ন কাপড়ের মাস্ক পাওয়া যায়। অন্যদিকে অভিজাত বিপণিবিতানগুলোয় বিভিন্ন ধরনের মাস্ক বিক্রি হয় ৭০ থেকে ৩৫০ টাকায়। ক্ষুদ্র বস্তুকণা প্রতিরোধী আমদানি করা কেএন-৯৫ মাস্ক এবং এন-৯৫ মাস্ক প্রতিটি ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা দরেও বিক্রি করেন অনেকে।

ফ্যাশন ব্র্যান্ড ইয়েলো, আড়ং, দেশীদশ, দেশাল, ক্যাটসআইসহ আরও বেশ কিছু ফ্যাশন হাউজে মাস্ক বিক্রি হতে দেখা যায়। ইয়েলোর বসুন্ধরা সিটি, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন আউটলেটে বিশেষ ছাড়ে মাস্ক বিক্রি করতে দেখা যায়।

এদিকে দেশে কিছু মাস্ক আমদানি হলেও করোনায় বিশ্বব্যাপী চাহিদা তৈরি হয়েছে। এতে বাংলাদেশ থেকে মাস্ক রপ্তানি বেড়েছে। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর তথ্য মতে চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পাঁচ মাসে ২ কোটি ৬৯ লাখ ডলারের (২২৯ কোটি টাকা) মাস্ক রপ্তানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ২৭ লাখ ডলারের (২৩ কোটি টাকা) মাস্ক।

জানতে চাইলে বিজিএমইএর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, ‘বাংলাদেশ প্রত্যাশা অনুযায়ী পিপিই ও মাস্কের রপ্তানি বাজার ধরতে পারেনি। উদ্যোক্তারা প্রস্তুত হওয়ার আগেই ক্রয়াদেশ চীন, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কার মতো প্রতিযোগী দেশে চলে গেছে। সামনের দিনগুলোয় আমরা নতুন বাজার ধরার চেষ্টা করছি। আশা করছি আমরা সফল হব।’

এদিকে দেশে মাস্কের চাহিদা বাড়ায় বাজারে দেদার বিক্রি হচ্ছে নিম্নমানের মাস্ক। এসব মাস্ক কতটা করোনা প্রতিরোধী, সেই প্রশ্ন ঘুরেফিরে সামনে চলে আসছে। রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় বাসে হকারি হরে ৫টি মাস্ক ১০ টাকায় বিক্রি করেন মহসীন। তিনি জানান, প্রতি ৫০টির প্যাকেট ১০০ টাকায় কিনে আনেন বাবুবাজার থেকে। পরে সেটা বিক্রি করেন বাসে। মান কেমন জানতে চাইলে মহসীন কোনো জবাব দিতে পারেননি।

নয়া পল্টনের বাসিন্দা ও ইস্টার্ন ব্যাংকের কর্মকর্তা ফকরুল ইসলাম নয়ন বলেন, মহল্লার ফার্মেসি থেকে কেএন-৯৫ মাস্ক কেনেন প্রতিটি ৩৫ টাকা দরে। একবার পরার পরই মাস্কের ফিতা ছিঁড়ে যায়। কিন্তু আগে কেনা মাস্কগুলো মানসম্মত ছিল। প্রতিদিন ধুয়ে ৭-৮ দিন ব্যবহার করা যেত।

করোনায় চিকিৎসাসেবা দেন বাংলাদেশ মেডেকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শাফি উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমরা সাধারণত বাজার থেকে যে মাস্ক কিনে ব্যবহার করি এগুলো করোনা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। তা ছাড়া সর্বসাধারণ সঠিক নিয়মে মাস্ক ব্যবহার করেন না। আমাদের উচিত মানসম্মত মাস্ক সঠিক নিয়মে ব্যবহার করা। বিশেষ করে জনসমাগমস্থলে অবশ্যই মানসম্মত মাস্ক ব্যবহার করা জরুরি।’ দেশে মাস্ক পরার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তৈরি ও বিক্রিতে বাধ্যতামূলক কোনো নীতিমালা নেই। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) বাধ্যতামূলক মান সনদ নেওয়ার তালিকায় যে ১৮১টি পণ্য রয়েছে, সেখানে মাস্ক নেই।

লেখক : সাংবাদিক