শত শত লাশ দাফন করেছি

কোনো মৃত ব্যক্তি জানাজা ও দাফন থেকে বঞ্চিত হবে না

করোনাকালে মানুষ চিনেছি। বিপদে কাছের মানুষ কাছের থাকে না। আবার দূরের মানুষ যে কোনোদিন চিনেও না সে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। আমার সঙ্গে যে স্বেচ্ছাসেবীরা দাফন কাজে অংশগ্রহণ করেছিল, তাদের সবাই একসময় করোনাতে আক্রান্ত হয়। তখন আমি আমার জায়গা থেকে সর্বোচ্চটুকু করেছি আমার এই সাহসী স্বেচ্ছাসেবীদের জন্য। এই বিশ্ব থেকে করোনা একদিন চলে যাবে। তবে আমাদের এই অভিজ্ঞতাগুলো সামনের জন্য কাজে লাগবে। আমরা মাস্তুল ফাউন্ডেশন থেকে সবসময় দাফনের কাজটি চালিয়ে যাব। সুবিধাবঞ্চিত গরিব দুস্থ মানুষদের জন্য আমরা এই দাফন ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসটি দিতে চাই বিনামূল্যে।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর চলমান করোনা মহামারীই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় দুর্যোগ, সংকটের ঘটনা। আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, তাই অংশগ্রহণও করতে পারিনি। তবে করোনাকালের ভয়াবহতা দেখেছি। করোনা নিয়ন্ত্রণে আনতে গত বছরের ২৫ মার্চের পর থেকে সারা দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। অঘোষিত এই লকডাউনে সারা দেশ কার্যত থমকে যায়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিম্ন আয়ের মানুষ। এই শ্রেণি দিন এনে দিন খায়।

প্রথম দিকে আমরা কেবল নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছিলাম। মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষের কাছে আমরা খাবার পৌঁছে দিয়েছি। তবে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল করোনায় মৃতদের দাফন করা। এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক মৃত ব্যক্তির দাফন করেছি আমরা।

মাস্তুল ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু ২০১২ সালের ১৯ অক্টোবর। তখন আমি ছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবরে যখন আড্ডা দিতাম, তখন দেখতাম পথশিশুরা ভিক্ষাবৃত্তি করছে। আমি সেই সময় গিটার বাজাতাম এবং গান করতাম। ওরা আমার গান শোনার জন্য চারপাশে ঘিরে বসত। গান শেষে আমি ও বন্ধুরা ওদের সঙ্গে গল্প করতাম।

একদিন জানতে চাইলাম, তোমাদের পড়াশোনা করতে ইচ্ছে করে না? একটি ছেলে বলে উঠল, ভাইয়া পেটে তো খাওনই জুটে না, পড়াশোনা করার টাকা কে দিব? তখন এই শিশুরা আমার কাছে আবেদন করে ভাইয়া কিছু বই ও রংপেন্সিল দিবেন আমাগো। তাইলে আমরা পড়া শিখতাম। আমি কথা দিলাম, বই-খাতা নিয়ে আসব। তারা সেদিন অনেক খুশি মনে বিদায় নিয়েছিল।

পরে আমি ৫-৬ জনের জন্য বই, খাতা ও রংপেন্সিল কিনে তাদের বাসায় গেলাম। গিয়ে রীতিমতো বিব্রতকর অবস্থা। ওরা ২০-২৫ জন আমার গিফটের জন্য অপেক্ষা করছে। ঠিক তখন এই লজ্জিত মনে আমি জীবনের লক্ষ্য ঠিক করলাম, এই বাচ্চাদের জন্য কাজ করব। তাদের শিক্ষার জন্য কাজ করে যাব।

এই লজ্জাই আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে। ঠিক কয়েক সপ্তাহ পরে আমি সব বাচ্চাকেই গিফট দেই এবং তাদের জন্য একটি পথশিশু স্কুল প্রতিষ্ঠা করি। রবীন্দ্র সরোবরেই তাদের পাঠশালার স্থান নির্ধারিত হয়, যেখানে আমার সঙ্গে ওদের পরিচয়। এখন আমাদের ২২টি স্কুলে ১১০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। সুবিধাবঞ্চিত গরিব শিক্ষার্থীদের স্কুলব্যাগ, জুতা, মোজা, বই, খাতাসহ সব শিক্ষার উপকরণ দিয়ে সহায়তা করছি। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্য, পুষ্টিকর খাবার, শিশু অধিকার, মৌলিক চাহিদা নিশ্চয়তা করছি।

মার্চে করোনা শুরু হলে আমাদের শিক্ষার্থীদের পরিবারের অনেকে করোনা আক্রান্ত হয়। এদের কয়েকজন মারা যায়। এটা করোনার প্রথম দিককার কথা। তখন করোনা নিয়ে ভীতিকর অবস্থা চলছে। কেউ করোনায় মৃতদের দাফন করতে চাইছে না। এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে আমার এক শিক্ষার্থী ফোন দিয়ে বলল ‘স্যার আমার বাপে মারা গেছে, তার দাফনের ব্যবস্থা করেন, দয়া করেন আমাদের। কেউ কবর দিতে চাইছে না।’

ওই ফোনটি ছিল বেদনাময়। একজন মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে অথচ তার দাফন হচ্ছে না। এর থেকে কষ্টকর আর কী থাকতে পারে। বিষয়টি নিয়ে আমরা স্বেচ্ছাসেবীরা আলোচনা করলাম। আমরা ভাবলাম, কাল তো আমাদেরও কেউ মারা যেতে পারে। তখনো তো একই অবস্থা হবে। আর সবাইকেই তো মরতে হবেই একদিন।

সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরাই ওই মৃতদেহটি দাফন করব। সাহস করে মাঠে নেমেই পড়লাম। অনেকেই আমাদের ভয় দেখাতে থাকল। তারা বলল, আমাদের জন্য আমাদের পরিবার আক্রান্ত হতে পারে। কিন্তু আমরা আমাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকলাম। পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থে বাসা ছেড়ে অফিসেই আস্তানা গাড়লাম। আসার সময় সবাই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আসলাম। বিশেষ করে মাস্ক, পিপিইসহ অন্যান্য সুরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ করলাম। ওই সময়ে এগুলো সংগ্রহ করাও ছিল কঠিন কাজ। সবাই পরিবার থেকে সহায়তা পেয়েছি। যদিও সবার পরিবারই আমাদের নিয়ে শঙ্কায় ছিল।

নতুন এক যুদ্ধে নেমেছি। কিন্তু সমস্যা হলো, কীভাবে গোসল করাতে হয়? কীভাবে কাফনের কাপড় পরাতে হয়? কীভাবে জানাজার নামাজ পড়াতে হয়? কীভাবে দাফন দিতে হয়? কিছুই তখন জানি না। আল্লাহর নাম নিয়ে যখন কাজ শুরু করলাম, তখন সব নিজের আয়ত্তে আনলাম। একটা দাফন করার পরই আরেকটা দাফনের জন্য আমাদের কাছে অনুরোধ এলো। পরে দেখি প্রতিদিনই ঢাকার একেক প্রান্ত থেকে কল আসা শুরু করল, যেভাবে তারা অনুরোধ করছিল, না করতে পারিনি। ভাবলাম, নিজের পরিবারের সঙ্গে এমন হলে আমি কি পিছিয়ে থাকতে পারতাম।

অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে আমরা দাফন সম্পন্ন করতাম। এতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন ছিল। প্রথম কয়েক দিন এই খরচ বহন করার পর আমরা অর্থ-সংকটে পড়লাম। চিন্তা করলাম অনুদান সংগ্রহ করব। এ জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে আমরা সাহায্যের আবেদন শুরু করি। অনেকেই সাড়া দিল। আমাদের কার্যক্রম সম্পর্কে ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান অবগত হলেন। তিনি আমাদের জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স কিনে দেন। শুভাকাক্সক্ষীদের অনুদান ও সাকিব আল হাসানের দেওয়া অ্যাম্বুলেন্স পেয়ে আমাদের কাজের গতি আরও বেড়ে গেল। আগে প্রতিদিন একটি মৃতদেহ দাফন করতাম। এখন আমরা ২-৩টি করে দাফন করা শুরু করলাম।

করোনায় মৃতদের দাফন করতে গিয়ে আমাদের অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। একবার দাফনের জন্য ঢাকার বাইরে যাই। স্থানীয়রা আমাদের দাফন তো করতে দিলই না, উল্টো দৌড়ানি দিয়ে এলাকা ছাড়া করল। পরে অন্যত্র ওই মৃতদেহ দাফন করি। বিভিন্ন সময়ে দাফনের জন্য দূরে কোথাও গেলে সঙ্গে করে খাবার নিয়ে যেতে হতো। কারণ, আমাদের কাছে কেউ খাবার বিক্রি করত না। সবাই আমাদের দেখে দূর থেকে তাকিয়ে থাকত। মনে হতো আমরা ভিনগ্রহের প্রাণী। একবার খাবার ফুরিয়ে গেলে একটি দোকানে গেলাম খাবার কিনতে। দোকানদার ভয়ে দোকান বন্ধ করে দিল। অনেক আকুতি-মিনতি করে খাবার দিতে রাজি করালাম। দোকানদার দূর থেকে ছুড়ে মেরে আমাদের খাবার দিল। জীবনে এতটা অবহেলিত হব, কখনো কল্পনাই করিনি।

সবচেয়ে কষ্ট পেয়েছি মৃত ব্যক্তির গোসল করানো নিয়ে। ঢাকায় যেই জায়গাগুলোতে লাশ গোসল করায়, তারা করোনার ভয়ে বন্ধ রেখেছিল। আমরা বিভিন্ন গ্যারেজে, ফাঁকা গলিতে কষ্ট করে লাশ গোসল করিয়েছি। ছোট একটা জায়গার জন্য অনেকের পা ধরেছি, তবুও মৃত ব্যক্তির গোসলের জন্য একটু জায়গা মিলেনি। আমাদের অফিসটি ছিল ভাড়াবাসায়। বাড়িওয়ালা স্থানীয়দের চাপে অফিস ছাড়ার নির্দেশ দিলেন। এ যেন বিপদের ওপর মহাবিপদ। স্বেচ্ছাসেবীদের একজন বলল, ‘ভাইয়া বাসা থেকে বাইর কইরা দিছে, আপনাদের সঙ্গে দাফনের কাজ করি বলে। এই অফিস ছিল আশ্রয়স্থল। এখন আমরা কোথায় যাব?’ একবার রাজধানীর এক অভিজাত এলাকা থেকে লাশ দাফনের জন্য ফোন এলো। সেখানে যাওয়ার পর মৃত ব্যক্তির ছেলে বলল ‘ভাই, তাড়াতাড়ি লাশটা নিয়ে যান।’ আমি বললাম ‘ভাই, আপনার বাবার লাশ, আপনিও আসেন আমাদের সঙ্গে।’ ছেলেটি এলো না।

এত কিছুর পরেও আমরা দমে থাকিনি। কেউ না কেউ আমাদের পাশে ঠিকই দাঁড়িয়েছে। তখন মনে হয়েছে, মানবতা এখনো বেঁচে আছে।

একবার একটি দাফনের জন্য যাই। গিয়ে দেখি বৃদ্ধ মা তার মৃত সন্তানের পাশে বসে কাঁদছেন। আমরা অনুরোধ করলাম আপনি এখান থেকে যান। বয়স্কদের করোনার ঝুঁকি বেশি। তিনি বললেন, ‘এখন আমার যাওয়ার সময়। অথচ আমি না মইরা আমাদের সন্তানকে আল্লাহ নিয়ে গেলেন।’ সেদিন আমরা সবাই কেঁদেছিলাম। তবে শেষ কাঁদা। এত কষ্ট যেন আর আমাদের সহ্য হয় না।

এরপর শত শত লাশ দাফন করেছি, এখন আর কান্না আসে না। তবে কাজগুলো করে যেতে চাই। মাস্তুল ফাউন্ডেশনে শুরু থেকে কাজ করে যে দোয়া পাইছি, তার থেকে লাখো গুণ দোয়া পাইছি এই করোনাকালে। এটাই আমার জীবনের অনেক বড় প্রাপ্তি।

করোনাকালে মানুষ চিনেছি। বিপদে কাছের মানুষ কাছের থাকে না। আবার দূরের মানুষ যে কোনোদিন চিনেও না সে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। আমার সঙ্গে যে স্বেচ্ছাসেবীরা দাফন কাজে অংশগ্রহণ করেছিল, তাদের সবাই একসময় করোনাতে আক্রান্ত হয়। তখন আমি আমার জায়গা থেকে সর্বোচ্চটুকু করেছি আমার এই সাহসী স্বেচ্ছাসেবীদের জন্য। এই বিশ্ব থেকে করোনা একদিন চলে যাবে। তবে আমাদের এই অভিজ্ঞতাগুলো সামনের জন্য কাজে লাগবে। আমরা মাস্তুল ফাউন্ডেশন থেকে সবসময় দাফনের কাজটি চালিয়ে যাব। সুবিধাবঞ্চিত গরিব দুস্থ মানুষদের জন্য আমরা এই দাফন ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসটি দিতে চাই বিনামূল্যে।

বর্তমানে সাধারণ মৃত ব্যক্তিদেরও দাফনের কাজটি আমরা করছি। গরিব অসহায় ও দুস্থ পরিবার থেকে কল এলে আমরা দাফন ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসটি বিনামূল্যে দিয়ে যাচ্ছি। এর পাশাপাশি আমরা অক্সিজেন সার্ভিসটিও দিয়ে যাচ্ছি। বর্তমানে একটি জায়গার খোঁজ করছি, যেখানে আমরা একটি মৃত ব্যক্তির জন্য গোসলখানা স্থাপন করব। এখানে মৃত ব্যক্তিদের বিনামূল্যে গোসল করানো হবে। শপথ একটাই ‘কোনো মৃত ব্যক্তি গোসল, জানাজা ও দাফন থেকে বঞ্চিত হবে না।’

লেখক : মাস্তুল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা