বাংলাদেশ পুলিশের প্রশংসনীয় বিভিন্ন কাজের চেয়ে নেতিবাচক সমালোচনাই বেশি লক্ষ করা যায়। পুলিশের সেই ভাবমূর্তির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে করোনায় মানবিক আচরণের মধ্য দিয়ে। করোনার প্রভাব সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশও এক চরম সংকটের মধ্যে পড়ে। আর এ সময় সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায় বাংলাদেশ পুলিশ।
দেশে করোনার শুরুতেই সরকার ঘোষিত লকডাউন বাস্তবায়নে মাঠে নেমে কাজ করেছে পুলিশ। সাধারণ মানুষকে ঘরে রাখতে যেমন হতে হয়েছে কঠোর, তেমনি মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজেন পাশে দাঁড়িয়েছে আক্রান্ত হওয়ার বা মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে। করোনার শুরু থেকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম না থাকলেও মানুষের পাশে দাঁড়াতে নির্ভীক ছিল তারা। মানবিক এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সংক্রমণের শিকার হয়েছেন হাজার হাজার পুলিশ কর্মকর্তা ও তাদের স্বজনরা। মারাও গেছেন অনেকে। করোনাকালে পুলিশের এ ভূমিকা দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে।
করোনাকালে পুলিশকে দেখা গেছে রোগীদের বাঁচাতে রক্ত দিচ্ছে, খাবার পৌঁছে দিচ্ছে ভবঘুরে-ফুটপাতে-গরিবের কাছে, গর্ভবতীদের নিজেদের গাড়ি করে পৌঁছে দিচ্ছে হাসপাতালে, গরিব ও পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়িতে গিয়ে দিয়ে আসছে চাল-ডাল। করোনা প্রাদুর্ভাবের প্রথম দিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ৫০টি থানায় প্রতিদিন গরিব ও দুস্থদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে সাধারণ থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল দিয়ে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাকহানাদার বাহিনীকে মোকাবিলা করেছে। একইভাবে করোনাকালে দেশের মানুষকে বাঁচাতে জীবনবাজি রেখে কাজ করে যাচ্ছে।
করোনাকালে পুলিশের ভূমিকা উল্লেখ করে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে আইজিপি বেনজীর আহমেদ বলেন, দেশে করোনা সংক্রমণের প্রথম দিন থেকেই কোনো ধরনের ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রীর জন্য অপেক্ষা না করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা জনগণের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। ফলে অনেক পুলিশ সদস্য নিজের অজান্তেই করোনা আক্রান্ত হয়েছেন, জীবন দিয়েছেন। বর্তমান করোনাকালে পুলিশ যেভাবে জনগণের কাছে গিয়েছে, তাদের পাশে থেকেছে, তাদের সুরক্ষা দিয়েছেতা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। শুধু বাংলাদেশ থেকে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশের প্রশংসা করছে। পুলিশ প্রধান হিসেবে এ জন্য আমি অত্যন্ত গর্বিত।
আইজিপি আরও বলেন, করোনায় পুলিশ শুধু কোয়ারেন্টাইন, লকডাউনই বাস্তবায়ন করেনি; অসহায় মানুষের বাসায় খাবার পৌঁছে দিয়েছে, অসুস্থ ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। করোনা আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেলে যখন স্বজনরা কেউ এগিয়ে আসেনি, তখন পুলিশ তাদের জানাজার আয়োজন, দাফন এবং সৎকারের ব্যবস্থা করেছে। এসব দায়িত্ব পুলিশের নয়, পুলিশকে এ দায়িত্ব দেওয়াও হয়নি। কিন্তু পুলিশ কেন এটা করেছে? পুলিশ কাজটি নিজেদের মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে করেছে। এজন্য পুলিশ আজ মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার বাংলাদেশ পুলিশের এ ভূমিকার প্রশংসা করেছেন।
করোনার সময় পুলিশের প্রশংসিত কর্মকান্ডের হাজারো উদাহরণ আছে। তার মধ্যে অন্যতম করোনা আক্রান্ত রোগীর লাশ দাফন। গত বছর ১২ আগস্ট রাতে নীলফামারীর ডোমারে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যান কলেজ শিক্ষক গোলাম মাওলা সাদিক (৫২)। তাকে দাফনে কেউ এগিয়ে আসছিল না। ঠিক সেসময় ডোমার থানা অফিসার ইনচার্জ মোস্তাফিজার রহমান জানাজা ও দাফনের ব্যবস্থা করেন।
এর কিছুদিন পর ঢাকার ধামরাইয়ে করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যান পাখি মন্ডল। কিন্তু তার মৃতদেহের কাছে ভয়ে কোনো স্বজন আসেননি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মৃতদেহ পড়ে থাকে। খবর পেয়ে ধামরাই থানা পুলিশ হাজির হয়। তাদের সহায়তায় কায়েতপাড়া শ্মশানে তাকে সৎকার করা হয়।
অন্তঃসত্ত্বা নারীর পাশে দাঁড়িয়েও ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে পুলিশ। পুরান ঢাকায় করোনা আক্রান্ত অন্তঃসত্ত্বা এক নারীকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে প্রশংসিত হয় পুলিশ। গত ১৭ মে ওই নারীর সন্তান জন্ম দেওয়ার সম্ভাব্য তারিখ ছিল। ৬ মে তার প্রসববেদনা শুরু হয়। করোনা মহামারীর উপসর্গ থাকায় হাসপাতালে যেতে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে গাড়ি না পেয়ে পুলিশের শরণাপন্ন হয়েছিল ওই নারীর পরিবার। গাড়ি না পেয়ে সে হাসপাতালে যেতে পারছিল না। পরে পুলিশ তাকে হাসপাতালে পৌঁছে দেয়।
শুধু তাই নয়, লকডাউন এলাকায় পাহারা বসানো, কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিদের নজরদারি করা, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীকে বাড়ি থেকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া, মারা যাওয়া ব্যক্তিদের দাফন বা সৎকারে সহায়তার কাজও করে যাচ্ছে পুলিশ। অভাবী মানুষের জন্য সরকারি ত্রাণ যাতে চুরি না হয় সেক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখছে পুলিশ। সব মিলিয়ে করোনার এই দুর্যোগে পুলিশের এক নতুন মানবিক ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে। পুলিশের মানবিক এসব কর্মকা- সর্বত্র প্রশংসিত হয়েছে।
সাধারণ মানুষও পুলিশের ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশংসা করছেন। তারা বলছেন, করোনাকালে পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যরা অনেক মানবিক আচরণ করেছেন, যা সর্বমহলে প্রশংসিত। আক্রান্তদের সহায়তা থেকে শুরু করে হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়ে সেবা দিয়েছে পুলিশ। অনেক আক্রান্ত পরিবারের ঘরে খাবার পৌঁছে দিয়েছে। সেই সঙ্গে লকডাউন চলাকালে ঘরে থাকার আহ্বান জানানোসহ যাদের ঘরে খাবার ছিল না তাদের নীরবে ঘরে খাবার পৌঁছে দিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ডিএমপির পক্ষ থেকে প্রত্যেক থানা এলাকায় রান্না করা খাবার অসহায় মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। মাস্কসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ ও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরের রাস্তায় জীবাণুনাশক পানি ছিটিয়েছে পুলিশ। লকডাউনের সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় কৃষকের পাকা ধান কেটে ঘরে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে পুলিশ। মহামারী চলাকালে অনেকেই সংক্রমণের ভয়ে আক্রান্তদের পাশে না গেলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুলিশ উপস্থিত হয়েছে।
‘মুজিববর্ষের অঙ্গীকার, পুলিশ হবে জনতার’এ স্লোগান সামনে রেখে অধিকতর জনকল্যাণমুখী সেবা প্রদানের লক্ষ্যে পুলিশ যখন এগিয়ে চলছিল, ঠিক তখনই জনবান্ধব পুলিশিং রূপ নেয় অপ্রতিরোধ্য মানবিক পুলিশিংয়ে। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে যখন দেশের প্রায় সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়, তখন অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় পুলিশ। সবকিছু উপেক্ষা করে নিজেদের বুক এগিয়ে দেয় করোনাযুদ্ধে জনগণকে রক্ষার দৃঢ় সংকল্পে।
শত প্রতিকূলতার মধ্যেও পুলিশকেই মাঠে থেকে কাজ করতে হচ্ছে। এই করোনাসংকটে যখন পাশে কেউ থাকে না, তখন পুলিশ সদস্যরা গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। স্বজনরা যেখানে রাস্তায় ফেলে গেছেন, পুলিশ সেখান থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠিয়েছেন। করোনায় মৃত্যুর পর লাশ দাফনের কাজটিও করতে হচ্ছে পুলিশকে। এ কারণে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত সবার আগে পুলিশকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
জনসচেতনতা সৃষ্টিতে শহর থেকে গ্রামে ছুটেছেন পুলিশের প্রতিটি সদস্য। করোনা প্রতিরোধে নানা ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখায় দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে প্রকৃত সেবক হিসেবে পরিণত হয়েছে পুলিশ।
পুলিশের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, মানবিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম, মানবপ্রেম আমাদের তাড়া করেছে। তাই আমরা মানবসেবায় অবিরাম ছুটে চলেছি। সেবা দিতে গিয়ে হাজার হাজার পুলিশ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। জীবন উৎসর্গ করেছেন অনেকে। কিন্তু তাতেও আমরা থেমে নেই। জীবনের শেষ অবধি পর্যন্ত দেশ ও জাতির সেবায় পুলিশ নিজেদের বিলিয়ে দেবে। দেশে করোনা পরিস্থিতিতে সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে লড়াই করছে পুলিশ।
তারা আরও বলছেন, করোনা দুর্যোগের সময় পুলিশের ভূমিকার কারণে একসময় যারা বাহিনীটির সমালোচনা করতেন তারাও আজ পক্ষে কথা বলছেন এবং প্রশংসা করছেন। মানুষ পুলিশকে সম্মান করছে, ভালোবাসছে। নিজ দায়িত্বের বাইরে ‘মানবিক পুলিশ’ হিসেবে মানুষের পাশে থেকে সেবা দিচ্ছে। জনগণকে সেবা দেওয়ায় সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন এবং ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছে পুলিশ। পুলিশ মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছে। শুধু বাংলাদেশ থেকে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুলিশের প্রশংসা করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার পুলিশের এ ভূমিকার প্রশংসা করেছেন।
পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মো. হাবিবুর রহমান বলেন, পুলিশ সর্বদা জনগণের পাশে থেকে সেবা দিয়েছে। দেশের যেকোনো দুর্যোগে পুলিশ সবার আগে সর্বদা এগিয়ে আসে। যেকোনো সেবায় জনগণের প্রধান ভরসাস্থল পুলিশ। মহামারী করোনায় সেটার চূড়ান্ত রূপ মানুষ দেখেছে। করোনায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুলিশ সদস্যরা কাজ করেছেন। পুলিশের এসব মানবিক কর্মকা- এখন মানুষের মুখে মুখে। জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে দেশের প্রতিটি পুলিশ সদস্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
করোনা মহামারীর সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশের অনেকেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। গত ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডিএমপিসহ দেশের বিভিন্ন ইউনিটে লকডাউনসহ বিভিন্ন সময় নিরাপত্তা দিতে গিয়ে পুলিশের বিভিন্ন পদমর্যাদার ১৮ হাজার ৮১১ জন সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন ৮২ জন। আক্রান্তদের মধ্যে অতিরিক্ত আইজিপি ৬ জন, ডিআইজি ১০, অতিরিক্ত ডিআইজি ১৯, পুলিশ সুপার ১১২, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ১৮৭, সহকারী পুলিশ সুপার ২২৮, ইন্সপেক্টর ৯৫৭, এসআই ৩০০৭, এএসআই ২৮৩৫, নায়েক ৫৫০, কনস্টেবল ৮ হাজার ৮২৩ ও অন্যান্য ২০৭৭ জন। মোট ১৮,৮১১ জন।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় লকডাউন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে গিয়ে নিজেরা আক্রান্ত হয়েছেন। ডিএমপি মোট আক্রান্ত ৩১৭৮ জন। সুস্থ হয়ে উঠেছেন ৩১১১ জন। মৃত্যুবরণ করেছেন ২৫ জন।
লেখক : সাংবাদিক