আ.লীগের ভয় বিদ্রোহী প্রার্থী বিএনপির শঙ্কা হয়রানির

আর মাত্র দুই দিন বাকি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের। কিন্তু ভোট নিয়ে নির্ভার হতে পারছে না আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি কেউই। দলের মধ্যে দৃশ্যমান বিরোধ না থাকলেও দলীয় অন্তঃকোন্দলের প্রভাব ভোটে পড়ে কি না এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় নৌকার লোকজন। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন ও প্রশাসনের হয়রানি এবং ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) কারচুপির শঙ্কা বিএনপির। 

আগামী ২৭ জানুয়ারি সামনে রেখে পুরো বন্দরনগরী এখন ভোটের আমেজে। পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গেছে নগরীর সড়ক ও অলিগলি। নানা রঙে-ঢঙে চলছে বিভিন্ন প্রার্থীর পক্ষে প্রচার। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই মেয়র প্রার্থীর পক্ষে ঢাকা থেকে এসে প্রচারে অংশ নিচ্ছেন দলের বিভিন্ন স্তরের কেন্দ্রীয় নেতারাও। আওয়ামী লীগ মেয়রপ্রার্থী রেজাউল করিম ও বিএনপিপ্রার্থী শাহাদাত হোসেন দু’জনই গতকাল দিনভর বিরামহীনভাবে গণসংযোগ করেছেন নগরীর বিভিন্ন এলাকায়। নিজেদের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে ভোট ও দোয়া চেয়েছেন ভোটারদের কাছে।

আসন্ন সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীকে বিজয়ী করতে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ একাট্টা হলেও পুরোপুরি নির্ভার হতে পারছেন না দলের নেতাকর্মীরা। নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩৩টি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীপ্রার্থী থাকায় নির্বাচনী সংঘাতে নৌকার বিজয় নিয়ে ‘শঙ্কা’ দেখা দিয়েছে।

তাদের আশঙ্কা, বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীরা নিজেদের বিজয় ধরে রাখতে বিএনপি বা জামায়াতপন্থি সমর্থকদের সঙ্গে গোপন আঁতাত করছেন। এতে হয়তো অনেক ভোট নৌকার বিপক্ষে পড়তে পারেযদিও আওয়ামী লীগ নেতারা বিষয়টিকে উড়িয়ে দিচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চসিক নির্বাচনে নগরীর ৪১টি সাধারণ ওয়ার্ড ও ১৪টি সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে মোট ২২৩ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ৫৫টি কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে ৩৩টি ওয়ার্ডে অর্ধ-শতাধিক প্রার্থী নির্বাচন করছেন। এরমধ্যে ১১ জন সদ্য সাবেক কাউন্সিলর রয়েছেন।

এসব বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে প্রয়াত সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী এবং মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী রয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মো. খোরশেদ আলম সুজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুনেন, আওয়ামী লীগের কর্মীরা জাতে মাতাল, তালে ঠিক। শেখ হাসিনা যেখানে আওয়ামী লীগ সেখানে। নির্বাচনে বিদ্রোহীরা, বিদ্রোহীই। ওরা দলের কেউ নয়। ৪১ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে কেন্দ্র থেকে যাদের সমর্থন দেওয়া হয়েছে, তারাই আমাদের প্রার্থী। দলীয় নেতাকর্মীরাও যারা দলের সমর্থন পেয়েছে, তাদের পক্ষে কাজ করবে।’

আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীরা গোপনে অন্যদলের (জামায়াত/বিএনপি) সমর্থন পেতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে। এক্ষেত্রে কাউন্সিলর পদে বিদ্রোহীদের ভোট দিতে গিয়ে সমর্থক বা অন্যরা নৌকার বিপক্ষে ভোট দেবে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে খোরশেদ আলম সুজন বলেন, ‘এসব প্রশ্নই ওঠে না। যারা আওয়ামী লীগ করে তারা কখনো নৌকা ছাড়া অন্য কাউকে ভোট দেবে না। তাছাড়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে রেজাউল করিমকে বিজয়ী করতে প্রস্তুত রয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রেজাউল ভাইকে, নগরের ভোটাররাই নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে বিজয়ী করবেন। চট্টগ্রামের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে হলে রেজাউল ভাইকে ভোট দেওয়া যুক্তিযুক্ত। কেননা, সরকারি দলের প্রতিনিধিরাই পারবে নগরীর উন্নয়ন করতে। তাই জনগণ উন্নয়নের পক্ষেই ভোট দেবেন। এছাড়াও আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আমরা জিতবই। বিদ্রোহীপ্রার্থীদের বারবার বলার পরও তারা সরেনি। তবে এ নিয়ে রেজাউল ভাইয়ের ভোটে কোনো সমস্যা হবে না। আমরা সবাই নৌকার বিজয়ে একাট্টা।’

 এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়রপ্রার্থী ও মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক এম রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে যেভাবে উন্নয়নযজ্ঞ চলছে, সেখানে নৌকার বিজয় অবশ্যম্ভাবী। গণসংযোগে ভোটারদের ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। সম্মানিত ভোটাররা ২৭ তারিখ সারাদিন নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আমাকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করবেন। বিজয়ী হলে আমি চট্টগ্রাম নগরীর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে আরও বেগবান করব।

এদিকে নির্বাচনী প্রচারের শুরু থেকেই পুরোদমে মাঠে রয়েছেন বিএনপির মেয়রপ্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন। সঙ্গে সার্বক্ষণিকভাবে ছায়ার মতো আছেন মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর। ঢাকা থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, কেন্দ্রীয় সদস্য হাবিবউন নবী সোহেল, নাজিম উদ্দিন আলম, যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাহ উদ্দিন টুকু, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমানসহ বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা এসে ধানের শীষের পক্ষে প্রচারে অংশ নিয়েছেন।

তবে দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম মহানগরীতে বিএনপির নেতৃত্ব দিয়ে আসা দলের প্রভাবশালী নেতাদের নির্বাচনী প্রচারে অনুপস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। ধানের শীষের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট করা হয়েছিল বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানকে। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারের পুরো সময় তিনি অবস্থান করছেন ঢাকায়। তার এ অনুপস্থিতির কারণে নগর বিএনপির সদস্য সচিব আবুল হাশেম বক্করকে দেওয়া হয়েছে প্রধান নির্বাচনী এজেন্টের দায়িত্ব। দলের আরেক প্রভাবশালী নেতা কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মেয়র মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন দুই সপ্তাহ আগে কারাগার থেকে জামিনে বের হলেও এর পর তিনি আর চট্টগ্রাম আসেননি। প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারী দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রামে অবস্থান করে সার্বিক পরিস্থিতি মনিটরিং করলেও কোথাও নির্বাচনী গণসংযোগে যাচ্ছেন না। কেবল একটি সংবাদ সম্মেলন ও ইশতেহার ঘোষণাকালে ডা. শাহাদাতের পাশে দেখা গেছে তাকে।

দলের নেতারা বলছেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে আবদুল্লাহ আল নোমান ও মীর মো. নাসির উদ্দিন ঢাকায় রয়েছেন। আর আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরাসরি গণসংযোগে অংশ না নিলেও সার্বক্ষণিকভাবে নির্বাচনী কার্যক্রম মনিটরিং করছেন এবং মূলত তার পরামর্শ অনুযায়ী সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে।

নির্বাচনী প্রচারে ধানের শীষের প্রার্থীর শঙ্কা নেতাকর্মীদের পুলিশের হয়রানি ও ইভিএম নিয়ে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন সংঘটিত নির্বাচনী সংঘর্ষের ঘটনায় ধানের শীষের কর্মীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব মামলা ও হয়রানি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত। নির্বাচন কমিশনে এ নিয়ে অভিযোগও দেওয়া হয়েছে তার পক্ষ থেকে।

এ বিষয়ে ডা. শাহাদাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের কিছু অতি উৎসাহী কর্মকর্তার কারণে নির্বাচনী পরিবেশটা দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একটু আগে আমি গণসংযোগ শেষ করে আসার পরপরই বকশির হাট এলাকায় আমার বেশ ক’জন কর্মীকে আটক করে নিয়ে গেছে। গত সাত দিনে বিভিন্ন থানায় ৬-৭টি মামলা দেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৫-২০ জনকে। এখন প্রতি রাতে নেতাকর্মীদের বাসায় তল্লাশির নামে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় কিছু চিহ্নিত ক্যাডারদের সঙ্গে নিয়ে পুলিশ আমাদের কর্মীদের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, এবারও তারা পরিবেশ ঘোলাটে করে ২০১৮ সালের মতো ভোট ডাকাতির পাঁয়তারা করছে।’

ইভিএম নিয়েও শঙ্কার কথা জানিয়ে ডা. শাহাদাত বলেন, ইভিএমে তারা যেকোনো ধরনের ম্যাকানিজম করতে পারে। তাই আমার দাবি হচ্ছেইভিএমের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া কাউকে ভোটকক্ষে প্রবেশ করতে না দেওয়া।

একই ধরনের শঙ্কার কথা জানালেন, মহানগর যুবদলের সভাপতি ও ডা. শাহাদাতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য মোশাররফ হোসেন দীপ্তি। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই আমাদের নেতাকর্মীদের হয়রানি বেড়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনী প্রচার চালাতে গিয়ে আমাদের কর্মীরা হামলার শিকার হলেও উল্টো তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। এ অবস্থায় নির্বাচনের দিন আদৌ আমাদের এজেন্ট, নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার মতো পরিবেশ থাকবে কি না তা নিয়ে আমরা শঙ্কার মধ্যে রয়েছি।

২০১৫ সালের ২৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচনে ভোটের দিন অধিকাংশ কেন্দ্র দখলে নেওয়ার অভিযোগ এনে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিলেন বিএনপির মেয়রপ্রার্থী।