নিয়ম না মেনে করোনা পরীক্ষার অভিযোগ মেডিনোভার বিরুদ্ধে

মিথ্যা তথ্য দিয়ে অনুমোদন নেওয়াসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিসেসের বিরুদ্ধে নিয়ম না মেনে করোনাভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষা করার অভিযোগ উঠেছে। এ পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানটির একাধিক স্বাস্থ্যকর্মী এ অভিযোগ করেছেন। তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, করোনা পরীক্ষার ল্যাব পরিচালনার জন্য একজন চিকিৎসকসহ ১১ জন টেকনোলজিস্ট দেখিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে অনুমোদন নেওয়া হলেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল মাত্র পাঁচজন টেকনোলজিস্ট। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন পেতে একজন চিকিৎসকের নাম উল্লেখ করা হলেও তাকে কখনই প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়নি। গত আগস্টে পরীক্ষা শুরুর পর ডিসেম্বরে পাঁচ টেকনোলজিস্টের মধ্যে তিনজনকে ছাঁটাই করা হয়। এখন মাত্র দুজন টেকনোলজিস্ট দিয়েই চলছে করোনা শনাক্তের কাজ। এমনকি পরীক্ষায় যে আরটি-পিসিআর মেশিন ব্যবহারের কথা ছিল তাও মানা হচ্ছে না। ফলে এখান থেকে করোনা শনাক্তের সঠিক ফল পাওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে মেডিনোভা কর্র্তৃপক্ষ।

মেডিনোভার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল-ক্লিনিক) ডা. ফরিদ হোসেন মিয়া গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওই প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে। গত সপ্তাহে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তদন্তের রিপোর্ট এলে বিস্তারিত বলা যাবে।’

মেডিনোভার কর্মীরা জানান, বিদেশগামী যাত্রীদের করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য পিসিআর ল্যাব চালু করতে গত আগস্টে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন পায় প্রতিষ্ঠানটি। তবে চিকিৎসকসহ ১২ জন টেকনোলজিস্ট দেখিয়ে অনুমোদন নেওয়া হলেও পাঁচজন টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে তিনজনকে আবার জানুয়ারিতে বাদ দেওয়া হয়। এমনকি তাদের বেতনও পরিশোধ করা হয়নি।  

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, লাইটসাইক্লার-৯৬ মডেলের আরটি-পিসিআর মেশিনে করোনা টেস্ট করে মেডিনোভা। এটি এখনো ডায়াগনস্টিক্যালি অনুমোদন না হওয়ায় কেবল গবেষণার কাজে ব্যবহৃত হয়। ফলে এখানে করোনা শনাক্তের পরীক্ষায় সঠিক রেজাল্ট পাওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, করোনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে সর্বনি¤œ দুটি জিন টেস্ট করে তার ভিত্তিতে রেজাল্ট দিতে হয়। কিন্তু মেডিনোভা কর্র্তৃপক্ষ বলছে, একটি জিন পরীক্ষায় নেগেটিভ এলে অপরটি করার দরকার নেই। যদিও অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুটি জিন পরীক্ষা করে রিপোর্ট দেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিসের মিরপুর শাখার ব্যবস্থাপক (অ্যাডমিন) টি এম জুলফিকার (সাবু) দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ম মেনেই করোনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। এখানে ডিজি হেলথ থেকে লোকজন এসেছে। কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি।

মিথ্যা তথ্য দিয়ে করোনা টেস্টের অনুমোদন : মিথ্যা তথ্য দিয়ে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার অনুমোদন নিয়েছে মেডিনোভার মিরপুর ব্রাঞ্চ। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা জানিয়েছেন, এক চিকিৎসকসহ ১১ জন টেকনোলজিস্ট দেখিয়ে অনুমোদন নেওয়া হলেও বর্তমানে কাজ চালানো হচ্ছে দুজনকে দিয়ে। তাদের মধ্যে কোনো মেডিকেল টেকনোলজিস্টও নেই। এমনকি তাদের একজন আবার পিসিআর ল্যাব এবং সাধারণ ল্যাবে একই সঙ্গে কাজ করেন।

মেডিনোভার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে কোনো নিয়মই মানছে না কর্র্তৃপক্ষ। এ ক্ষেত্রে ভাইরোলজিস্ট থাকার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি কোনো ভাইরোলজিস্ট নিয়োগ দেয়নি। নমুনা পরীক্ষায় ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করলেও টেকনোলজিস্টদের কোনো ধরনের কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা নেই। শুধু করোনা ইউনিটে নয়, জেনারেল মলিকুলার ল্যাবেও নেই কোনো কনসালট্যান্ট বা বায়োটেকনোলজিস্ট। অথচ সেখানে ডিএনএ এবং আরএনএ নিয়ে কাজ করতে গেলে বায়োটেকনোলজিস্ট প্রয়োজন।

বেতন পরিশোধ না করে ছাঁটাই : বেতন-ভাতা পরিশোধ না করে এবং কারণ দর্শানোর নোটিস ছাড়াই মেডিনোভা মেডিকেলের বিরুদ্ধে করোনা ল্যাবের তিন টেকনোলজিস্টকে ছাঁটাই করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ছাঁটাই হওয়া এক টেকনোলজিস্ট নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিয়োগের সময় ৫০ হাজার টাকা বেতন ধরা হয়। কিন্তু কাজ শুরুর পর মাসে বেতন দেওয়া হয় ৪০ হাজার টাকা। পাঁচ মাসে ১০ হাজার করে টাকা কেটে নেওয়া হয়। বেতন ঠিক করার দাবি জানালে অ্যাডমিন ম্যানেজার বিনা বেতনে ছুটিতে থাকার নির্দেশ দেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘করোনা পরীক্ষার অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলায় কর্র্তৃপক্ষ আমাদের বিনা বেতনে বাধ্যতামূলক ছুটি দিয়েছে। যে দুজনকে দিয়ে ল্যাব চালানো হচ্ছে তারা অনভিজ্ঞ। তারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মাইক্রোবায়োলজি এবং বায়োকেমিস্ট্রি বিষয়ে পাস করেছেন। পিসিআর মেশিনের জটিল এবং স্পর্শকাতর অনেক বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই।’

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে মেডিনোভার মিরপুর শাখার ম্যানেজার (অ্যাডমিন) টি এম জুলফিকার (সাবু) বলেন, ‘যাদের ছাঁটাই করা হয়েছে তারা অনিয়মিত ছিল। এছাড়া বেশি বেতন আদায়ের জন্য প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন সময় চাপ দেয়। করোনা রোগী কম থাকায় তাদের দাবি মানা সম্ভব হয়নি। তবে তাদের ডিসেম্বরের বেতন বকেয়া থাকলেও আর কোনো বকেয়া নেই। বকেয়া নেওয়ার জন্য বারবার বলা হলেও তারা আসেননি।’