বাণিজ্যিক ব্যাংক ও সরকারি সংস্থার জন্য আলাদা আলাদা আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির মাধ্যমে বিভিন্ন কোম্পানি জালিয়াতিতে জড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন কোম্পানি ব্যাংকঋণ পেতে বানোয়াট আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করছে। জালিয়াতিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিরীক্ষকও জড়িত রয়েছেন। আবার নিরীক্ষিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে জবাব চাওয়া হলে নিরীক্ষক তা অস্বীকারও করছেন। সম্প্রতি অলিম্পিক ফ্যাশন লিমিটেড ও সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস নামের দুটি প্রতিষ্ঠান বানোয়াট নিরীক্ষা প্রতিবেদন দিয়ে ব্যাংকঋণ নেওয়ার চেষ্টা করলেও ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) তদন্তে এই আর্থিক জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়েছে।
অলিম্পিক ফ্যাশন লিমিটেড একটি শতভাগ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা, যেটি ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর যাত্রা শুরু করে। এই কোম্পানিাট ব্যবসার শুরুর প্রথম বছরেই আর্থিক জালিয়াতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য কোম্পানিটি দুইটি ভিন্ন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দুটি ভিন্ন নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করেছে। যদিও এফআরসি তদন্ত শুরু করলে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান দুটি অলিম্পিক ফ্যাশনের আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করার কথা অস্বীকার করেছে।
আবার সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড আইএফআইসি ব্যাংকে ঋণ পেতে বিক্রি, মুনাফা, সম্পদ, ইক্যুইটি বাড়িয়ে দেখিয়েছে। এক্ষেত্রেও কোম্পানিটি আলাদা আলাদা নিরীক্ষক দিয়ে আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এ কোম্পানিটি আইএফআইসি ব্যাংকে দেওয়া নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ২০১৮-১৯ হিসাব বছরে বিক্রি দেখিয়েছে ৭৩৪ কোটি টাকা। অথচ এফআরসিতে দেওয়া নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বিক্রি দেখিয়েছে ৪৯৯ কোটি টাকা। আইএফআইসি ব্যাংকে সিলভার কম্পোজিট কর পূর্ববর্তী মুনাফা দেখিয়েছে ৭৭ কোটি টাকা, যা এফআরসিতে ১৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা দেখানো হয়। কোম্পানিটির মোট সম্পদের পরিমাণ এফআরসিতে দেখানো হয় ৯৬৯ কোটি টাকা, যা আইএফআইসি ব্যাংকে দাখিল করা নিরীক্ষিত প্রতিবেদনে ১ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা দেখানো হয়। একইভাবে ব্যাংকঋণ পেতে কোম্পানিটি ইক্যুইটির পরিমাণও বাড়িয়ে দেখিয়েছে। এফআরসি ধারণা করছে একই হিসাব বছরের জন্য দুটি ভিন্ন ভিন্ন আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করার পেছনে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্য রয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে চিঠি দিয়েছে এফআরসি।
নিরীক্ষিত প্রতিবেদনে অলিম্পিক ফ্যাশনের এই জালিয়াতির বিষয়ে গত ২১ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপকের কাছে চিঠি দিয়েছে এফআরসি। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক মো. সাঈদ আহমেদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, এ মতিন অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস এবং এবিএস চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস কর্তৃক প্রত্যায়িত অলিম্পিক ফ্যাশনের ৩০ জুন সমাপ্ত ২০১৯ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, দুটি নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন একই বছরের এবং দুজন ভিন্ন নিরীক্ষকের মাধ্যমে প্রত্যয়ন করা হয়েছে। অথচ দুটি প্রতিবেদনের আর্থিক তথ্য-উপাত্তে ব্যাপক গরমিল রয়েছে। এই গরমিলের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে চিঠিতে। তাতে দেখা যায়, এ মতিন অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস কর্তৃক প্রত্যায়িত আর্থিক প্রতিবেদনে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে কোম্পানিটির আয় দেখানো হয়েছে ১৯ লাখ টাকা। অথচ এবিএস চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস কর্তৃক প্রত্যায়িত একই অর্থবছরের আরেকটি আর্থিক প্রতিবেদনে আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৭২ লাখ টাকায়। একইভাবে এ মতিন অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস কর্তৃক প্রত্যায়িত আর্থিক প্রতিবেদনে মোট লোকসান ৪৫ লাখ, কর-পূর্ববর্তী লোকসান ১ কোটি ৪১ লাখ, মজুদ পণ্য ১ কোটি ৭০ লাখ, বিবিধ দেনাদার ১ কোটি ৭৬ লাখ, চলতি সম্পদ ৭ কোটি ৮৩ লাখ, মোট সম্পদ ২৬ কোটি ৯০ লাখ এবং মোট ইক্যুইটি ঋণাত্মক ৯৬ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে এবিএস চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস কর্তৃক প্রত্যায়িত আর্থিক প্রতিবেদনে মোট মুনাফা ১৬ লাখ, কর পূর্ববর্তী লোকসান ৫ লাখ, মজুদ পণ্য ১০ লাখ, বিবিধ দেনাদার ১ কোটি ১ লাখ, চলতি সম্পদ ৪ কোটি ৮৯ লাখ, মোট সম্পদ ২০ কোটি ৯ লাখ এবং মোট ইক্যুইটি ৩৯ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে।
দুটি নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে ব্যাপক পার্থক্য পরিলক্ষিত হওয়ার কারণে অলিম্পিক ফ্যাশনের কাছে নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী এবং নিরীক্ষক এ মতিন অ্যান্ড কোম্পানি ও এবিএস চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানির কাছে চিঠির মাধ্যমে নিরীক্ষা নথি তলব করে এফআরসি। চিঠির জবাবে দুই নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান অলিম্পিক ফ্যাশনের আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করার বিষয়টি অস্বীকার করে। এমনকি এফআরসি পক্ষ থেকে দুই প্রতিষ্ঠানের প্রত্যায়িত আর্থিক প্রতিবেদনের কপি পাঠানোর পর তারা কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করার বিষয়টি অস্বীকার করে।
অন্যদিকে অলিম্পিক ফ্যাশন এফআরসির কাছে এবিএস চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি কর্তৃক নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেয়। এফআরসির পক্ষ থেকে দুটি ভিন্ন ভিন্ন আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষার করার কারণ ও ব্যাখ্যা চাওয়া হলে কোম্পানিটি এফআরসিকে জানায়, প্রথমে এ মতিন অ্যান্ড কোম্পানিকে দিয়ে আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা করানো হয়। কিন্তু এই আর্থিক প্রতিবেদনে কিছু তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা উচিত ছিল যা করা হয়নি এবং এতে আর্থিক বিবরণীতে কিছু অসামঞ্জস্য দেখা দেয়। পরে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ আরও নির্ভুলভাবে নিরীক্ষা করার জন্য এবিএস চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানিকে নিয়োগ দেয় এবং তার নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন গ্রহণ করা হয়। মূলত এ কারণেই কোম্পানিট দুটি আর্থিক প্রতিবেদন হয়ে যায় বলে এফআরসিকে জানিয়েছে অলিম্পিক ফ্যাশন।
এফআরসির পক্ষ থেকে এবিএস চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানির প্রত্যায়িত আর্থিক প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অলিম্পিক ফ্যাশন জানায় এই নিরীক্ষকের মাধ্যমেই তারা চূড়ান্ত নিরীক্ষা কাজ করিয়েছেন যা প্রথমে এ মতিন অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের মাধ্যমে নিরীক্ষা করা হয়েছিল। যদিও কোম্পানিটি এফআরসিকে নিরীক্ষককে ফি প্রদানের রসিদ কিংবা যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) কাছে নিরীক্ষকের সম্মতিপত্র জমা দেওয়ার কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পাঠানো চিঠিতে এফআরসি জানিয়েছে, কোম্পানি ইচ্ছাকৃতভাবে দুজন নিরীক্ষকের মাধ্যমে দুইটি ভিন্ন ভিন্ন আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করেছে যা তারা লিখিতভাবে স্বীকার করেছে। দুটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনের মধ্যে এ মতিন অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস কর্তৃক প্রত্যায়িত নিরীক্ষা প্রতিবেদনটির তারিখ ২০১৯ সালে ২৪ অক্টোবর আর এবিএস চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস কর্তৃক প্রত্যায়িত নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তারিখ ২০১৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। এতে প্রমাণ হয় যে দুজন নিরীক্ষকের মাধ্যমে দুটি নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরির কারণ সম্পর্কে কোম্পানির দেওয়া ব্যাখ্যা সঠিক নয়। তাছাড়া আপাত দৃষ্টিতে এক্ষেত্রে দুজন নিরীক্ষক জড়িত রয়েছেন বলে মনে হলেও সেটি প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত কোম্পানি দাখিল করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে জানিয়েছে এফআরসি।