বাড়ছে ছিনতাই, দমনে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে গেছে। কৌশল বদলে পেশাদার ছিনতাইকারীরা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। সম্প্রতি এদের হাতে বেশ কয়েকজনের প্রাণ গেছে। এমন প্রেক্ষাপটে গত ১৬ জানুয়ারি থেকে ডিএমপির সব থানা এলাকায় টহল বাড়ানো হয়েছে।

পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তারের পর সহজেই জামিন পেয়ে যাওয়ায় পেশাদার ছিনতাইকারী ও চোর-ডাকাতদের থামানো সম্ভব হচ্ছে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ না করায় পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। অভিনব পন্থায় সুযোগ পেলেই তারা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এমনকি অনেকে ছিনতাইয়ের অপরাধে ৮-১০ বার গ্রেপ্তারের পর জেল থেকে বেরিয়ে ফের একই অপরাধে যুক্ত হচ্ছে।

গত বছর ৯ ডিসেম্বর রাতে রাজধানীর উত্তরার আবদুল্লাহপুরে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন আশুলিয়া ক্লাসিক পরিবহনের একটি বাসের যাত্রী জিসান হাবিব (১৮) ও রুহুল আমিন (১৭)। বাসটি আবদুল্লাহপুর পৌঁছলে জানালা দিয়ে রুহুল আমিনের হাতে থাকা মুঠোফোন ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। জিসান ও রুহুল দ্রুত বাস থেকে নেমে এক ছিনতাইকারীকে জাপটে ধরেন। কিন্তু এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে সে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা দুজনকে উদ্ধার করে শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জিসানকে মৃত ঘোষণা করেন। একই রাতে রাজধানীর কলাবাগান বাসস্ট্যান্ড থেকে জয়-ই মামুন (৪০) নামে অচেতন এক ব্যক্তিকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে মামুন প্রাণ হারিয়েছেন বলে ধারণা পুলিশের।

৭ ডিসেম্বর রাত ১১টার দিকে রাজধানীর মগবাজার রেললাইন ধরে বাসায় ফিরছিলেন এক সংবাদকর্মী। হঠাৎ পেছন থেকে এসে চোখে মরিচের গুঁড়ো ছিটিয়ে কাছে থাকা ১৫ হাজার টাকা নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। পকেটে থাকা মুঠোফোন নেওয়ার চেষ্টা করলে শেষ পর্যন্ত বাধার কারণে পারেনি বলে জানান ওই সাংবাদিক। সর্বশেষ গত ২৩ জানুয়ারি রাজধানীর হাইকোর্টসংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ মাঠের পাশের সড়ক থেকে মো. হামিদুল ইসলাম (৫৫) নামে এক কেব্ল ব্যবসায়ীকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তাকে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় রাজধানীর উত্তর মুগদা ও কামরাঙ্গীরচর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের রমনা বিভাগের একটি দল পাঁচ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে। এ অভিযানে থাকা ডিবির রমনা জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মিশু বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হামিদুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত চক্রের জাহিদ ও সোহেলকে ছিনতাইয়ের ঘটনায় কিছুদিন আগেও একবার গ্রেপ্তার করেছিলাম। পরে তারা জামিনে বেরিয়ে ফের একই অপরাধমূলক কাজ করছে। এদের বেশিরভাগই পেশাদার ছিনতাইকারী।’

ডিএমপির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীতে ছিনতাই, চুরি ও ডাকাতি নিয়ন্ত্রণে গত ১৬ জানুয়ারি থেকে সবকটি থানা এলাকায় বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে ডিএমপি। এরই অংশ হিসেবে গত মঙ্গলবার থেকে দুদিনের অভিযানে ডিবির একাধিক টিম ৩০ এবং রামপুরা থানা পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করে।

পুলিশের ভাষ্য, গ্রেপ্তাররা পেশাদার অপরাধী। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে ছিনতাই, চুরি ও ডাকাতির ঘটনায় ১০টির বেশি মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তার করে এদের কারাগারে পাঠানো হলেও জামিনে বেরিয়ে ফের ছিনতাই শুরু করে। করোনাকালে ছিনতাই বেড়ে যাওয়ায় ডিএমপির ৫০টি থানা এলাকার টহল বাড়ানো হয়েছে। গত ১৬ জানুয়ারি থেকে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এরপরও সুযোগ পেলেই অভিনব কায়দায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে।

ডিবির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রেপ্তারের পর সহজেই জামিন পেয়ে যাওয়ায় পেশাদার ছিনতাইকারী, ডাকাত ও চোরদের থামানো সম্ভব হচ্ছে না। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে তারা অভিনব সব পন্থা অবলম্বন করছে। ব্যবসায়ী হামিদুল হত্যার তদন্তে দেখা গেছে এ ছিনতাইয়ে অংশ নেওয়া চক্রের সদস্য রিকশাচালক শাকিল একজন পেশাদার ছিনতাইকারী। শারীরিক প্রতিবন্ধী (এক হাত কাটা) হওয়ায় ট্রাফিক পুলিশের সহানুভূতি নিয়ে সে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাত। গভীর রাত পর্যন্ত রিকশায় চক্রের অন্য সদস্যদের নিয়ে ওতপেতে ছিনতাই করত। হামিদুলকেও তারা রক্তাক্ত করে। আহত অবস্থায় প্রায় ৩০ মিনিট তিনি ঈদগাহের সামনে ফুটপাতে পড়েছিলেন। শাকিলদের ভয়ে কেউই তাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেনি। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়।’

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, ‘রাজধানীতে ছিনতাই বেড়ে যাওয়ার পেছনে করোনা মহামারীর একটি প্রভাব রয়েছে। তাদের দমনে গত ১৬ জানুয়ারি থেকে ডিএমপির সব থানা এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে। এরপরও কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটছে। অভিযোগ এলে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি।’