নৈতিক অবক্ষয়ের দায় পরিবার ও সমাজেরও

মানুষ কখনো অপরাধী হয়ে জন্ম নেয় না। প্রকৃত শিক্ষার অভাবে পরবর্তী সময়ে মানুষ অপরাধী হয়ে ওঠে। তাই তো বলা হয়, সন্তান জন্ম দেওয়া খুব সহজ; কিন্তু তাদের মানুষ করা কঠিন। এই কঠিন কাজ যথাযথভাবে করা যায়নি বলেই, আমাদের পরিবার ও সমাজ দিন দিন ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। বর্তমানে নৈতিক অবক্ষয়ের যে চিত্র, সেজন্য দেশের রাজনীতি-অর্থনীতির বাস্তবতার পাশাপাশি পরিবারের অভিভাবক ও সমাজকেও দায় নিতে হবে। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মার কষ্ট পাওয়ার মূল কারণ, শিশু বয়সে সন্তানদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাদের ভুলভ্রান্তি। কোনো সুসন্তান মা-বাবাকে কষ্ট দেয় না, মৃত্যুর সময়ও না। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে তখন থেকে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তিনটি আমলের দরজা কখনো বন্ধ হয় না। ১. সদকায়ে জারিয়ার সওয়াব, ২. মানবসেবা এবং ৩. নেকসন্তানের দোয়া।’সহিহ মুসলিম

নেকসন্তান আল্লাহতায়ালার বিশেষ নেয়ামত। নেক সন্তান যেমন পরিবারের জন্য উপকারী তেমনি দেশ ও সমাজের জন্য। কারণ, সে সুশিক্ষার কারণে নিজে কোনো অন্যায়-অনাচার করে না, অন্যদের করতেও দেয় না। এর সুবিধা সমাজের সবাই ভোগ করে। সুতরাং সন্তানকে সৎ ও নৈতিকতা সম্পন্ন করে গড়ে তুলতে প্রত্যেক বাবা-মাকে চেষ্টা করতে হবে। সন্তানদের মধ্যে শিশু বয়স থেকে যদি সততার শিক্ষা প্রতিফলিত হয়, তাকে যথাযথভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা যায়, তাহলে সেই সন্তানরা হবে সমাজের আলো।

এবার একটু সমাজচিত্রের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। দেশ এখন উন্নয়নের পথে হাঁটছে। তবে এটাও ঠিক, সমাজে অস্থিরতা, অপরাধপ্রবণতাও লাগামহীনভাবে বাড়ছে। খবরের কাগজের পাতা ওল্টালেই নজরে পড়ছে ধর্ষণ, পাশবিক নির্যাতনের নানা ঘটনার খবর। পৈশাচিক কায়দায় খুন, শিশু নির্যাতন, সন্ত্রাসবাদ, মাদক, লুটপাট, দুর্নীতি, মারামারি আর হানাহানির খবর তো নিত্যদিনের পত্রিকার পাতা ভরে থাকছে। পারিবারিক কলহ, হিংসা-বিদ্বেষ এসবও অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। পারিবারিক কলহের কারণে পরিবারের সবার একসঙ্গে আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে। স্বামী-স্ত্রীর কলহে প্রাণ দিতে হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুকে। ধর্ষণ করে শিশু ও নারীদের নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে, যা বর্বর যুগকেও হার মানিয়েছে। দেশে কিশোর গ্যাং এখন বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। এক কথায়, দেশে নীতি-নৈতিকতার দুর্ভিক্ষ চরম আকার ধারণ করেছে। পুলিশের অপরাধ বিভাগের তথ্যানুযায়ী বছরে মোট হত্যাকা-ের প্রায় ৪০ শতাংশ সংঘটিত হয়, পারিবারিক কলহের কারণে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবক্ষয় একদিনে সৃষ্টি হয়নি। এগুলো রোধ করতে হলে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে মূলধারায় ফিরে আসতে হবে।

আসলে সবচেয়ে বড় উন্নয়ন হলো, মানুষের নৈতিক উন্নয়ন। অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রবৃদ্ধি দিয়ে নৈতিক উন্নয়নের মানদ- বিচার করা যায় না। এজন্য নৈতিক উন্নয়নের সব শাখা-প্রশাখায় সমানতালে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। এ দু’টো সমানভাবে এগোলেই বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রের মর্যাদা পাবে। দেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও চিকিৎসাসেবা সর্বজনীন হয়নি বলেই সর্বক্ষেত্রে সামাজিক বৈষম্য বিরাজমান। খাদ্যের মান ঠিক নেই, ভেজালসামগ্রী খেয়ে মানুষ দিন দিন পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। অনৈতিকতার থাবা সর্বস্তরে প্রসারিত। দেশে প্রতিদিন যেভাবে অনৈতিকতার হাত প্রসারিত হচ্ছে, তাতে স্বাভাবিক জীবনযাপন অনেকটাই অনিশ্চিত। শিক্ষিত লোকেরাই দেশ চালাচ্ছে, কিন্তু অনৈতিকতার মহামারী কমছে না কেন? এর উত্তর খুঁজতে হবে।

উন্নত বিশ্বের বহু দেশ অর্থনৈতিক উন্নতির চেয়ে নাগরিকদের নৈতিক মূল্যবোধের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এ বিষয়ে জাতিসংঘ ধারাবাহিকভাবে ‘ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট’ প্রকাশ করে। প্রায় দেড় শতাধিক দেশের ওপর জরিপ করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। রিপোর্টে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ পেছনে। মানবিক মূল্যবোধের এমন আকাল কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বাংলাদেশকে একটি কল্যাণময় রাষ্ট্রে পরিণত করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এ ব্যর্থতা থেকে যত দ্রুত সম্ভব বের হয়ে আসতে হবে। জাতির মনে মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। আর এ জন্য ধর্মীয় শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। নৈতিক অবক্ষয় ঠেকানো না গেলে যত উন্নয়ন করা হোক না কেন, তা দিয়ে সুস্থধারার জাতি বিনির্মাণ কখনোই সম্ভব নয়।

লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক