করোনাভাইরাসের সৃষ্ট মহামারীর বছরেও দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। ২০২০ সালে কোম্পানিটি ২৬ লাখ নতুন গ্রাহকও পেয়েছে। যদিও এ সময়টাতে গ্রামীণফোনের রেভিনিউ আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে। তবে আয়কর পরিশোধের পরিমাণ কিছুটা কম হওয়ায় ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে নিট মুনাফা প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে।
২০২০ সালের আর্থিক প্রতিবেদন বিষয়ে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গ্রামীণফোন জানিয়েছে, ২০২০ সালে ভয়েস কল ও ইন্টারনেট সেবা থেকে ১৩ হাজার ৯৬১ কোটি রেভিনিউ হয়েছে। এটি আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ কম। ২০১৯ সালে গ্রামীণফোনের রেভিনিউ হয়েছিল ১৪ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা।
গ্রামীণফোনের প্রকাশিত নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, মহামারীর বছরে রেভিনিউ কমে যাওয়ায় কোম্পানির পরিচালন মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ কমে যায়। ২০২০ সালে কোম্পানির পরিচালন মুনাফা হয় ৬ হাজার ৩৪৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৬ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। সর্বশেষ হিসাব বছরে কোম্পানির বিক্রয়, বিপণন ও কমিশন ব্যয় কমছে ১৭১ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির সুদ বাবদ ব্যয়ও কমেছে।
২০১৯ সালে গ্রামীণফোনের সুদ বাবদ ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ২৫২ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যা ২০২০ সালে ৩৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা নেমে এসেছে। এ সময়ে কর-পূর্ববর্তী মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ২৮০ কোটি টাকায়, যা আগের বছরে ছিল ৬ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা। সর্বশেষ হিসাব বছরে গ্রামীণফোন কর পরিশোধ করেছে ২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ১২ দশমিক ৮ শতাংশ কম। কর পরিশোধের পর ২০২০ সালে কোম্পানির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা, যা আগের বছরে ছিল ৩ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা।
মহামারীর বছরে প্রতিষ্ঠানটি ২৬ লাখ নতুন গ্রাহক অর্জনে সফল হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। ২০২০ সাল শেষে মোট গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৯০ লাখ, যার মধ্যে ৪ কোটি ১৩ লাখ বা ৫২ দশমিক ২ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী।
গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমান বলেন, ‘২০২০ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে আমরা ১৪ হাজারের বেশি নেটওয়ার্ক সাইটকে ফোরজিতে রূপান্তর করতে সফল হয়েছি। একই সঙ্গে গ্রাহক পর্যায়ে ফোরজির ব্যবহার ৬৫ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময়ে ১ কোটি ৯৮ লাখ নতুন গ্রাহক ফোরজিতে যোগ দিয়েছে, যা ২০২১ সালে প্রবেশের মুহূর্তে এটি একটি বিশাল মাইলস্টোন। ২০২০ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) অর্থনৈতিক গতি প্রত্যাশার চেয়ে কম হওয়ায় আমাদের কভিড-১৯ মহামারীর কঠিন চ্যালেঞ্জের বছরটির ব্যবসায়িক কার্যক্রমে সার্বিকভাবে প্রভাব ফেলেছে। তবে এ সময়ে পারস্পরিক সহযোগিতা ও আলোচনার মাধ্যমে আমরা বেশ কিছু রেগুলেটরি বিষয় সমাধান করতে পেরেছি। এ সময়ে নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক ও ডিস্ট্রিবিউশন কার্যক্রম সচল রাখতে সক্ষম হয়েছি এবং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য চতুর্থ প্রান্তিক থেকে আমাদের টাওয়ার কো-পার্টনারের সঙ্গে কাজ শুরু করেছি।’
আজমান বলেন, ‘যেহেতু কভিড-১৯-এর অনিশ্চয়তা এখনো বিদ্যমান, আমাদের প্রযুক্তি ও ডিজিটাল দক্ষতা দিয়ে এই মহামারী মোকাবিলায় গ্রাহকদের জন্য নতুন নতুন উদ্ভাবন ও সেবা নিয়ে আসতে আমরা বদ্ধপরিকর। আমরা অর্থবহ আলোচনায় বিশ্বাস করি যা সেবার মান উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
গ্রামীণফোনের সিএফও ইয়েন্স বেকার বলেন, গ্রামীণফোন ২০২০ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও চতুর্থ প্রান্তিকে কার্যকরী ব্যবসায়িক পরিকল্পনার মাধ্যমে আমরা ১৪ লাখ নতুন গ্রাহক নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছি। চতুর্থ প্রান্তিকে ২৯ দশমিক ৭ শতাংশ মার্জিন নিয়ে কর-পরবর্তী মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ৩৩ কোটি টাকা। ২০২০ সালে আগের বছরের তুলনায় ইন্টারনেট থেকে অর্জিত রাজস্ব বেড়েছে ১৪ শতাংশ এবং ইন্টারনেট ব্যবহার বেড়েছে ৬০ দশমিক ৬ শতাংশ। তিনি আরও বলেন, পরিচালনা পর্ষদ আমাদের সম্মানিত শেয়ারহোল্ডারদের জন্য শেয়ারপ্রতি ১৪ টাকা ৫০ পয়সা চূড়ান্ত লভ্যাংশ সুপারিশ করেছেন।
২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় গ্রামীণফোনের পরিচালনা পর্ষদ ২০২০ সালের জন্য ১৩০ শতাংশ অন্তর্বর্তী নগদ লভ্যাংশসহ মোট ২৭৫ শতাংশ লভ্যাংশ সুপারিশ করেছে। এ জন্য ১৭ ফেব্রুয়ারি রেকর্ড তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ১৯ এপ্রিল বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) অনুষ্ঠিত হবে।
চতুর্থ প্রান্তিকে গ্রামীণফোন ৩৯৫ কোটি টাকা (লাইসেন্স ও লিজ ফি বাদে) নেটওয়ার্ক কাভারেজ উন্নয়নে বিনিয়োগ করেছে। গ্রামীণফোনের মোট নেটওয়ার্ক সাইটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৫৪৭। প্রতিষ্ঠানটি কর, ভ্যাট, ডিউটি, ফি, ফোরজি লাইসেন্স এবং তরঙ্গ বরাদ্দ ফি বাবদ ৯ হাজার ৮২২ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে।