এ যেন হাসপাতাল নয়, রাজনৈতিক দাবি আদায়ের উন্মুক্ত মঞ্চ! সিঁড়ি, দেয়াল ও লিফটে ঝুলছে অসংখ্য পোস্টার। কর্র্তৃপক্ষের আদেশ উপেক্ষা করে জরুরি বিভাগের সামনে নার্সদের একটি অংশ দফায় দফায় বিক্ষোভ মিছিল করছে। দেওয়া হচ্ছে স্লোগান। এ চিত্র দেশের অন্যতম গুরত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসাকেন্দ্র জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর)। যা পঙ্গু হাসপাতাল নামেই বেশি পরিচিত।
নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের একাধিক বদলির আদেশ অমান্য, নোটিস বোর্ড ভেঙে নোটিস ছিঁড়ে ফেলা, নার্স সুপারিনটেনডেন্টের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া, পোস্টার সাঁটিয়ে কুৎসা রটনাসহ একটার পর একটা গুরুতর অনিয়ম করে চলেছে পঙ্গু হাসপাতালে কর্মরত নার্সদের একটি অংশ। গুরুতর অসুস্থ রোগীদের সামনে গত এক মাস ধরে এই বিশৃঙ্খলা চললেও হাসপাতাল প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো হাসপাতাল পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ওই সিন্ডিকেটের পক্ষ নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি গুরুতর অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে বদলির আদেশ পাওয়া সাতজন নার্সকে পুনর্বহাল করতে নার্সিং অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে অনুরোধও করা হয়েছে। উল্টো নার্সদের দুই সুপারিনটেনডেন্ট ও দুজন সুপারভাইজারকে বদলির অনুরোধ করেছে নিটোর কর্র্তৃপক্ষ। অথচ এই চারজন সিন্ডিকেটটির অপকর্মের প্রতিবাদ করায় গত এক মাস ধরে প্রায় জিম্মি হয়ে আছেন।
ঘটনার শুরু যেভাবে
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পঙ্গু হাসপাতালে প্রায় ৪০০ নার্স কর্মরত। তাদের দায়িত্বে রয়েছেন দুজন সুপারিনটেনডেন্ট (সেবা তত্ত্বাবধায়ক)। এছাড়া ১৮ জন নার্সিং সুপারভাইজার রয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী নার্সরা নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে। তাদের নিয়োগ, পদায়ন, বদলি সবকিছুই এই অধিদপ্তর থেকে পরিচালিত হয়। অপরদিকে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন।
নিটোরে কর্মরত একাধিক ব্যক্তি জানান,বহির্বিভাগের নার্স ইনচার্জ আলমগীর, আমিনুল হক, জরুরি বিভাগের ইনচার্জ আঁখি বেগম, ওটি (জরুরি বিভাগ) ইনচার্জ সাহিদা পারভীন, নার্সিং সুপারভাইজার শাহনাজ সরকার, সিডি ওয়ার্ডের হেলালউদ্দিন, ইআর ওয়ার্ডের এমএ কাউয়ুম, আই জে ওয়ার্ডের ইদ্রিস আলী, সুজন বৈদ্য, রওশন আরা বেগমসহ বেশ কয়েকজন ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে বিভিন্ন ওয়ার্ডের ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ নিয়ম অনুযায়ী দুই বছরের বেশি কেউ একই ওয়ার্ডে ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করতে পারেন না।
জানা যায়, দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করায় ওইসব ওয়ার্ড ইনচার্জরা হাসপাতালে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। সরকারি ওষুধ বিক্রি করে দেওয়া, রোগীদের কাছ থেকে টাকা আদায়সহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এমনকি কয়েকবার ধরা পড়লে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ লঘু শাস্তিও দিয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে গত ডিসেম্বরে নার্সিং অধিদপ্তরের এক আদেশে নার্সদের দায়িত্বে (অভ্যন্তরীণ) পরিবর্তন আনতে বলা হয়। সে অনুযায়ী গত ২৬ ডিসেম্বর ৩০০ নার্সের দায়িত্বে পরিবর্তন এনে বিজ্ঞপ্তি টাঙিয়ে দেন দুই সুপারিনটেনডেন্ট হোসনে আরা আক্তার ও রহিমা আক্তার। ওই বিজ্ঞপ্তিতে ১৮ জন নার্সিং সুপারভাইজারের স্বাক্ষরও রয়েছে। ওইদিন রাতেই নার্সদের ক্ষুব্ধ পক্ষটি মুখোশ পরে নোটিস বোর্ড ভেঙে নোটিস ছিঁড়ে ফেলে। পরদিন সকালে নার্সিং সুপারভাইজার হাসনা বেগম ও দুই সুপারিনটেনডেন্টের বিরুদ্ধে নানা কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে হাসপাতালের দেয়ালে দেয়ালে লিফলেট সাঁটিয়ে দেওয়া হয়। এতেই থেমে থাকেনি তারা। হাসপাতাল প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বদলির হুমকি দেওয়া হয় দুই সুপারকে। এছাড়া নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তদের পদে যোগদান করতে দেওয়া হয়নি। ক্ষুব্ধ পক্ষটির অভিযোগ আমলে নিয়ে হাসপাতাল প্রশাসন দুই সুপারিনটেনডেন্টকে শোকজ করে জানিয়ে দেয় তাদের অনুমতি ছাড়া নার্সদের কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না। অথচ এটি সুপারিনটেনডেন্টদেরই দায়িত্ব।
৭ জনকে বদলি, আদেশ অমান্য ও তদবির : জানা যায় নার্সদের রোস্টার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দুই সুপারের বিড়ম্বনাও শুরু হয়। তাদের সঙ্গে শক্ত সমর্থন থাকায় হাসনা বেগম নামে আরেক নার্স সুপারভাইজারও লক্ষ্যে পরিণত হন। একজন সুপারের কার্যালয়ের তালায় সুপার গ্লু আঠা লাগিয়ে দেওয়া হয়। তাদের নামে নানা কুৎসিত কথা লিখে হাসপাতালজুড়ে পোস্টার লাগানো হয়। এই পরিস্থিতিতে নার্সিং অধিদপ্তরের পরিচালক (শৃঙ্খলা) শোভা শাহনাজ ও উপ-পরিচালক (শৃঙ্খলা) শিরীন আক্তার ঘটনা তদন্ত করেন। তদন্তে ৭ জন সহকারী নার্সের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম পাওয়ায় গত ৭ জানুয়ারি তাদের দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বদলির আদেশ দেয় নার্সিং অধিদপ্তর।
এর মধ্যে মো. আলমগীরকে কক্সবাজারের রামু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, শাহনাজ সরকার ও আঁখি বেগমকে ফেনীর সোনাগাজী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, শাহনাজ সুলতানাকে ছাগলনাইয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, সাহিদা পারভীনকে পরশুরাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, শামীমা আক্তারকে নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং গাজী আমিনুল হককে নোয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে বদলি করা হয়। গত ১৩ জানুয়ারির মধ্যে তাদের নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়। কিন্তু তারা আদেশ অমান্য করে আরেক দফা হাঙ্গামা সৃষ্টি করে। আবারও নার্সিং সুপারদের বিরুদ্ধে মিছিল, সেøাগান ও মানহানিকর পোস্টার লাগায়। আদেশ পরিবর্তনে পরিচালক গণি মোল্লাহ, যুগ্ম পরিচালক তড়িৎ কুমার সাহা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাহফুজুল হক তালুকদার, স্বাচিপ নেতা ও হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মোনায়েম ও ডা. সবুরের দ্বারস্থ হয়। তারা আদেশ বাতিল করতে নার্সিং অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সিদ্দিকা আক্তারের কাছে অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি আদেশ বহাল রাখেন। এই অবস্থায় ওই সাতজন নার্স আদেশ স্থগিত করতে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের শরণাপন্ন হন। ট্রাইব্যুনাল ইতিমধ্যে ৫ জনের বদলি স্থগিত করেছে বলে জানা গেছে।
বদলি অথবা অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের বিষয়ে এই পক্ষটি কেন এত ক্ষুব্ধতা সাধারণ নার্সদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন এই প্রতিবেদক। যারা কথা বলেছেন তারা কেউই নাম প্রকাশ করতে চাননি। নার্সরা জানান, আলমগীর ও আমিনুল দীর্ঘদিন বহির্বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানেই প্রথম রোগীরা আসেন। আর রোগী আসা মাত্রই তাদের আয়ও শুরু হয়। দৈনিক তারা ৫-৭ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন। এছাড়া অন্যরাও নিজ নিজ ওয়ার্ডে দাপট খাটিয়ে নানা সুবিধা আদায় করেন। এই নার্সরা অবৈধ পন্থায় বিপুল সম্পদ গড়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন সাধারণ নার্সরা। চেষ্টা করেও অভিযুক্ত নার্সদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নার্সিং অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সিদ্দিকা আক্তার, পরিচালক (শৃঙ্খলা) শোভা শাহনাজ ও উপ-পরিচালক শিরীন আক্তারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তারা ধরেননি। অন্যদিকে শৃঙ্খলা অমান্যকারী নার্সদের প্রশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে পরিচালক আব্দুল গণি মোল্লাহর বক্তব্য জানতে গত বুধবার নিটোর হাসপাতালে যান এ প্রতিবেদক। এক ঘণ্টার বেশি সময় বসিয়ে রেখে পরে বক্তব্য না দিয়েই অফিস কক্ষ ত্যাগ করেন আব্দুল গণি। পরে মোবাইল ফোনে হাসপাতালটির যুগ্ম পরিচালক ডা. তড়িৎ কুমার সাহার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুরু থেকে বিষয়টা আমরা সিস্টেমে আনার চেষ্টা করেছি। যাদের বদলি করা হয়েছে তারা দক্ষ। হঠাৎ তাদের সরালে আমাদের কাজের ক্ষতি হতে পারে। এজন্য তাদের বদলির আদেশ আপাতত স্থগিত করতে আমরা নার্সিং ডিজির কাছে অনুরোধ করেছি।’
হাসপাতালে বিক্ষোভ ও পোস্টার লাগানোর ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘ক্ষুব্ধ নার্সরা দুদিন এগুলো করেছে কিন্তু আমরা বাধা দিয়েছি। বলেছি যা করবে শান্তিপূর্ণভাবে করতে হবে।’