ফিলিস্তিন : চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে বাইডেনকে

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার দোস্ত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’ প্রকাশ করার এক বছর পূর্ণ হলো। তাদের ওই পরিকল্পনায় ইসরায়েলের দৃশ্যকল্পটা এরকম : অবিভক্ত জেরুজালেম এর রাজধানী। ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিনি অঞ্চলের ওপর তার সার্বভৌমত্ব আর ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদি বসতির বিস্তৃত নেটওয়ার্কের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।

প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনাটি ছিল ইসরায়েলকে সন্তুষ্ট আর ট্রাম্পের রক্ষণশীল সমর্থকদের খুশি করার জন্য ট্রাম্পের সহযোগীদের তৈরি করা এক ন্যক্কারজনক উদ্যোগ। কথিত ওই ‘চুক্তি’ মোটেও কোনো চুক্তি ছিল না। যেহেতু তা অন্যতম সংশ্লিষ্ট পক্ষ ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে করা হয়নি।

সম্পূর্ণ দূরদৃষ্টিহীন ওই পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। দীর্ঘকালীন মার্কিন নীতি ও আদর্শ থেকে বড় বিচ্যুতি ঘটেছে এতে। আর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ওয়াশিংটনের যেটুকু উপযুক্ততা ছিল বারোটা বাজিয়েছে তারও। ইসরায়েলের সামরিক দখলদারিকে সমর্থন ও এর অবৈধ বসতিগুলোকে বৈধতা দেওয়ার পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের আহত করা আর তাদের স্বাধীনতার সংগ্রামকে কলঙ্কিত করার বিষয়ে ট্রাম্পের যে রেকর্ড তার সঙ্গে অবশ্য এটি সামঞ্জস্যপূর্ণই। ২০১৭ সালে ট্রাম্প প্রশাসন জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এটি মার্কিন দূতাবাস তেলআবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তরিত করে। পরের বছরই ওয়াশিংটন ডিসিতে ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার (পিএলও) প্রতিনিধি অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অজুহাতে জাতিসংঘের লাখ লাখ ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুকে সাহায্য দেওয়া সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ-কে দেওয়া সহায়তা স্থগিত করে এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল (ইউএনএইচআরসি) এবং শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএসসিও) ত্যাগ করে। হায়, এইসব কাজ চলার সময় কংগ্রেস মূলত নীরবই ছিল। আরবসহ বিশ্বের অনেক দেশও তা-ই করেছে। অনেকে ফিলিস্তিনের বিষয়ে ট্রাম্পের আচরণ ও কার্যকলাপকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করলেও প্রতিশোধের ভয়ে তাকে থামাতে কিছু করতে পারেনি। প্রতিহিংসাপূর্ণ ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসে এর নীতির প্রতি সমর্থন না দেওয়াদের নাম কালো তালিকায় ওঠানোর অনেক আগেই জাতিসংঘে ইসরায়েল সংক্রান্ত নীতির বিরোধিতাকারী দেশগুলোকে চিহ্নিত করে শাস্তি দিয়েছে। ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের ওপর ক্রমাগত আক্রমণ চালিয়ে গেলেও ট্রাম্প প্রশাসন সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সুদান ও মরক্কোর সরকারের উচ্চাভিলাষ বা দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক দেশটির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য চাপ দিয়েছে।

একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা যে আরবদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পূর্বশর্ত সেই দীঘ প্রচলিত ধারণাটিকে উল্টে দেওয়াটা আরব শাসকদের চরম দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে। শান্তি প্রক্রিয়াকে তা কার্যত অপ্রয়োজনীয় করে তুলেছে। ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে লেনদেনে ইসরায়েল যদি তার ইচ্ছামতো শর্ত নির্ধারণ করতে পারে তবে তারা কেন আলোচনা করবে? গা-জোয়ারিকেই যখন আরও ছাড় দিয়ে পুরস্কৃত করা হয় তখন আপসের দরকার কী? সুতরাং শান্তি প্রক্রিয়াকে মৃত বলে ঘোষণা করা হলো। আরও একবার! আরও একবার কারণ, ক্লিনটনের ২০০০ সালের ক্যাম্প ডেভিড শীর্ষ সম্মেলন শান্তি প্রক্রিয়া রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ায় মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল একে। এছাড়া জর্জ ডব্লিউ বুশের রোডম্যাপ আলোচনা চাঙ্গা করতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং ওবামা প্রশাসন প্রায় হাল ছেড়ে দেওয়ার পরও একই অবস্থা হয়েছিল। ওইসব ‘মৃত্যুর’ পর প্রতিটি শোকবাণীর পর গাজার বিরুদ্ধে দুটি বড় অভিযানসহ ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে হতাশাজনিত সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিশোধ নেওয়া বা কোনো ইঙ্গিত দেওয়া যে কারণেই ওই অভিযান চালানো হোক না কেন, ইসরায়েলি আগ্রাসন বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে। প্রাণ যায় হাজারো মানুষের। তবুও ইসরায়েলকে সম্ভাব্য ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক ও বেসামরিক কর্তৃত্ব আরও জাঁকিয়ে বসার সুযোগ দিতে না চাইলে কূটনৈতিক উপায় অব্যাহত রাখার বিকল্প নেই। যদিও তা কার্যত দুই রাষ্ট্র সমাধানের মৃত্যু ঘটিয়েছে। শান্তি প্রক্রিয়া মৃত। তবু বলব, শান্তি প্রক্রিয়া দীর্ঘজীবী হোক। কারণ, শান্তির কাফেলাকে চাঙ্গা করার পালা এখন বাইডেনের।

বাইডেনের প্রশাসন পিএলওর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি, পূর্ব জেরুজালেমে মার্কিন কনস্যুলেট পুনরায় চালু ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে (পিএ) দেওয়া আর্থিক সহায়তা আবার চালু করার মাধ্যমে ট্রাম্পের দোষত্রুটির কিছুটা হলেও সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই পদক্ষেপটি প্রশংসনীয়। এবং নিশ্চয়ই ইসরায়েল ছাড়া সর্বত্র সাধুবাদ পাবে। ইসরায়েলের নেতানিয়াহু নেতৃত্বাধীন সরকার ট্রাম্পের সব নীতি ও আদর্শকে গ্রহণ করে চলেছে এবং পক্ষান্তরে বিরোধিতা করে যাচ্ছে বাইডেনের সবকিছু। এই কারণেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য এই দুর্নীতিবাজ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে ত্যাগ করা উচিত, যাকে ঘুষ, জালিয়াতি এবং বিশ্বাস লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তিনি ট্রাম্পের মতোই ব্যক্তিগত লাভ এবং মর্যাদার লোভে নিখুঁতভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন।

নেতানিয়াহু নির্বাচনের সময় কার্যত ট্রাম্পের পক্ষই নিয়েছিলেন। বিক্ষুব্ধ ট্রাম্প সমর্থকরা ওয়াশিংটনে কংগ্রেস ভবন আক্রমণ করারও অনেক সময় পর্যন্ত তার অফিশিয়াল টুইটার অ্যাকাউন্টে ট্রাম্পের সঙ্গে যৌথ ছবি রেখেছিলেন নেতানিয়াহু।

বাইডেন নিশ্চয়ই মনে রেখেছেন যে নেতানিয়াহু কীভাবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি প্রশ্নে রূঢ়ভাবে এবং সমস্ত প্রটোকলের বিরুদ্ধে গিয়ে কংগ্রেসকে ওবামা প্রশাসনের বিরুদ্ধে উসকে দিয়েছিলেন। নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্টের অভিষেকের আগে আগে নেতানিয়াহু যে নতুন বসতি সম্প্রসারণের উসকানিমূলক ঘোষণা দিয়েছেন অবৈধ বসতির বিরুদ্ধে সরব হয়ে তার জবাবও দিতে হবে বাইডেনকে। অতীতে তিনি যেমনটা করেছেন। বাইডেন যদি সত্যিকার অর্থে মার্কিন কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে চান, তবে তাকে অবশ্যই ইসরায়েলকে দেওয়া আর্থিক ও সামরিক সহায়তাকে তার ওপর প্রভাব খাটানোর জন্য ব্যবহার করতে হবে। ওই সহায়তা যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া মোট বিদেশি সামরিক সহায়তার অর্ধেকেরও বেশি। এটাই ইসরায়েলকে তার দখলদারি অবসান করতে বাধ্য করার একমাত্র কার্যকর উপায়। তাই এটাই ক্ষোভের সঞ্চার করে যে বাইডেন দৃশ্যত মনে করেন যে এই পদক্ষেপটি ইসরায়েলে ক্ষোভের সঞ্চার করবে।

যদি বাইডেন ইসরায়েলের ওপর ওয়াশিংটনের প্রভাব ব্যবহার করতে অস্বীকার করেন তবে দেশটি তার দখলদারি আরও বৃদ্ধি করবে এবং ডানপন্থার পথে বেশি করে হাঁটবে। তা বড় ধরনের সহিংসতা ছাড়া কোনো প্রকারের সমাধানকে অসম্ভব করে তুলবে। ইসরায়েলের জন্য ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সামরিক সহায়তা দেশটিকে সুরক্ষা দেয় আর নমনীয় রাখে এই ভানটি চালিয়ে যাওয়া বাইডেনকে বন্ধ করতে হবে। কারণ রেকর্ড বলছে, এটি কেবল দেশটির দখলদারিকেই সুরক্ষিত করে আর অবস্থানকে করে তোলে কঠোরতর।

লেখক : আলজাজিরার জ্যেষ্ঠ রাজনীতি বিষয়ক বিশ্লেষক

আলজাজিরা অনলাইন থেকে ভাষান্তর আবু ইউসুফ