সারা দেশে ‘সুষ্ঠু’ নির্বাচন করে বিজয়ী মেয়রদের জন্য আলাদা শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন নোয়াখালীর বসুরহাট পৌরসভা নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত মেয়র আবদুল কাদের মির্জা। গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে দেওয়া টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেছেন, ‘ভোট চুরি করে নির্বাচিত’ মেয়রদের সঙ্গে তিনি শপথ নেবেন না।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই কাদের মির্জা সাম্প্রতিক বিভিন্ন বক্তব্যের জন্য সারা দেশে এখন আলোচনার কেন্দ্রে। ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে নির্বাচনপরবর্তী সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গতকাল ঢাকায় আসেন দ্বিতীয় ধাপের পৌরসভা নির্বাচনে বসুরহাট পৌরসভা থেকে নির্বাচিত কাদের মির্জা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমি মেয়র নির্বাচিত হই। আমি কেন ভোটচোরদের সঙ্গে শপথ নেব?’ আমি ভোট চুরি করে নির্বাচিতদের সঙ্গে শপথ গ্রহণ করতে পারব না। আমিসহ সারা দেশে যারা সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন তাদেরকে আলাদা শপথ গ্রহণ করাতে হবে।’ দুই-এক দিনের মধ্যে এ দাবি নিয়ে প্রকাশ্যে আসবেন বলেও জানান কাদের মির্জা।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে সাক্ষাতে কী কথা হলো জানতে চাইলে কাদের মির্জা বলেন, ‘তেমন কিছুই নয়।’ আপনাকে ‘অবস্থান’ থেকে সরে আসার কোনো অনুরোধ করেছেন কি না এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শুধু শান্ত থাকতে বলেছেন তিনি। নোয়াখালীর অপরাজনীতি নিয়ে কথা বলতে গেলেই ওবায়দুল কাদের বলেন, সবকিছুই নেত্রী (শেখ হাসিনা) জানেন। তার টেবিলে সবই আছে। আপাতত শান্ত হও তোমরা।’
শান্ত থাকবেন কি-না জানতে চাইলে কাদের মির্জা বলেন, ‘একরামকে (একরামুল করিম চৌধুরী) বহিষ্কার করার দাবি জানিয়েছি। এ জন্য এক মাস দেখব। তারপর আন্দোলনের ঘোষণা দেব।’ প্রসঙ্গত, একরামুল করিম চৌধুরী নোয়াখালী সদর আসনের আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সাংসদ।
কাদের মির্জা আরও বলেন, ‘বিভিন্ন আয়োজনে আমার কথা আমি বলেই যাব। সামনে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। তাই শান্ত থাকার একটা নির্দেশনা রয়েছে। নির্বাচনের ভেতর দিয়েই আন্দোলনও চলবে।’
আপনার বক্তব্যে প্রতিনিয়ত দল ও সরকার সমালোচিত হচ্ছে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা এমনটাই মনে করছেন। আপনি কী মনে করেনÑ এ প্রশ্নের জবাবে কাদের মির্জা বলেন, ‘শোনেন কিছু সত্য কথা বলতেই হবে। কোথাও কোনো অনিয়ম হলে আমি বলবই। তাতে কার কী হলো সেটা দেখতে যাব না আমি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগকে বিএনপি-জামায়াতের আচরণ করতে আমি দেব না। আমি আমার জায়গা থেকে লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যাব। এ দেশে যতদিন পর্যন্ত ফেয়ার নির্বাচন না হচ্ছে ততদিন আমি বলেই যাব। জেল-জুলুম, বহিষ্কার ও হুমকি-ধমকি আমাকে দমাতে পারবে না। সত্য আমি বলেই যাব। আর আওয়ামী লীগের কোনো নেতা যদি আমাকে হুমকি দেয় তাহলে আমি মনে করব দলটির নেতারা অযোগ্য। এ দেশ কি এভাবে চলবে?’
শুধু নোয়াখালীর বসুরহাটেই নয়, দেশের যে প্রান্তেই অনিয়ম হবে তা নিয়ে কথা বলবেন জানিয়ে কাদের মির্জা দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, ‘আমি থামব না। মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে কেন রাজনীতি করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যতদিন অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট, অপরাজনীতি ও ভোট চুরি অব্যাহত থাকবে ততদিন আমার মুখ বন্ধ হবে না। তবে এখন এক দাবি, সেটা হলো নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরীর পদ থেকে বহিষ্কার চাই। তাকে দল থেকে সরাতেই হবে, কোনো অবস্থাতেই আওয়ামী লীগে থাকতে পারবে না একরাম।’
কাদের মির্জা বলেন, ‘নোয়াখালীতে একরাম অপরাজনীতির চারণভূমি বানিয়েছে। টেন্ডারবাজি, অস্ত্রবাজি, চাকরি-বাণিজ্য সব অপকর্ম সে করেই যাচ্ছে। তাই তার বহিষ্কার নোয়াখালীর মানুষের গণদাবি হয়ে উঠেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একরাম নোয়াখালীতে ২৪ জন মায়ের বুক খালি করেছে। তাকে আওয়ামী লীগ থেকে সরাতেই হবে। একরাম সরে গেলেই আমি সত্য বলা থেকে সরে আসব সেটাও নয়। যতদিন দেশে অনিয়ম চলবে, সাহস করে সত্য কথা বলব। বিবেকের তাড়নায় বলেই যাব সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখান থেকে সরব না।’
ভাই ওবায়দুল কাদের সঙ্গে কাদের মির্জার সৌজন্য সাক্ষাতের সময় উপস্থিত এক আওয়ামী লীগ নেতা জানান, বৈঠকে ওবায়দুল কাদের দলীয় নেতাদের উদ্দেশ করে বলেন, গত কয়েক দিন যেসব অনাকাক্সিক্ষত বিষয়ে কথা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব বিষয় জানেন এবং বোঝেন। উনার ঊর্ধ্বে কেউ নন, তিনি যেকোনো সময়, যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। আপনারা যারা তৃণমূলে রাজনীতি করেন, তারা নেত্রীর প্রতি শতভাগ আস্থা ও ভালোবাসা রেখে কাজ করেন। কোনো গুজবে বিভ্রান্ত হবেন না। কোনো জনপ্রতিনিধি বা অন্য কেউ যদি কিছু বলে সেটার বিষয়ে আমি কাউকে প্রতিবাদ করতে দেই না। আপনারা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিলেন, সেই বিষয়ে আমি নিষেধ করেছি। নোয়াখালী শহরে প্রতিবাদ সভা আহ্বান করা হয়েছিল, সেখানে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছিলÑ আজকের পর থেকে আপনারা কোনো অবাস্তব কথা বলবেন না। গঠনমূলক কথা বলবেন। কারও বিরুদ্ধে, কারও সমালোচনা করবেন না। যদি কেউ করেন, সেইসব বিষয়ে নেত্রী ওয়াকিবহাল, তিনিই ব্যবস্থা নেবেন।
ওই আওয়ামী লীগ নেতা আরও বলেন, ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘কেউ যদি আমার বিরুদ্ধে কিছু বলেন, তাহলে এই বিষয়ে সবাই জানেন। আমি রাজনীতির এই পর্যায়ে কীভাবে উঠে এসেছি তা দেশের মানুষ জানেন। আমি হঠাৎ করে রাজনীতিতে উঠে আসিনি। মুক্তিযুদ্ধে বসুরহাটের মুজিব বাহিনীর কমান্ডার ছিলাম। সুতরাং এই বিষয়ে কাদা ছোড়াছুড়ির কিছুই নেই। আজকে বঙ্গবন্ধুকন্যা আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন, এইজন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আপনারা এমন কিছু বলবেন না, যাতে নোয়াখালীর বদনাম হয়। নেত্রী সবার ঊর্ধ্বে , তিনি যে সিদ্ধান্ত দেবেন সেটাই চূড়ান্ত।’