স্থানীয় সরকার নির্বাচন

বিদ্রোহের ৩ কারণ খুঁজে পেয়েছে আওয়ামী লীগ

বহিষ্কারের ভয়ভীতিসহ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবার কঠোর অবস্থান জানান দিলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী শেষমেশ থাকছেই। বিভিন্নভাবে হুঁশিয়ারির পরও দমন করতে না পারার পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদ্রোহী প্রার্থী ভোটে জিতেও আসছেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে ঘটছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাও। এ পরিস্থিতিতে নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী থেকে যাওয়ার তিন কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে দলটির স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের সভায়। সেগুলো হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে ভোটের ব্যাপারে মানুষের অনভ্যস্ততা, বিভিন্নভাবে দলে ঢুকে পড়া অনুপ্রবেশকারীদের বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া ও বিদ্রোহে উসকানি দেওয়া এবং দলের স্থানীয় কিছু নেতার আবেগ। এ তিনটি কারণেই মূলত বিদ্রোহ নির্মূল সম্ভব হচ্ছে না বলে গত শনিবার গণভবনে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের সভার আলোচনায় উঠে এসেছে। ওই সভায় উপস্থিত বোর্ডের একাধিক সদস্য দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

অবশ্য দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের বক্তব্য ভিন্ন। স্থানীয় রাজনীতির মোড়লরা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত আমলে না নেওয়ার কারণেই ভোটের মাঠে বিদ্রোহী প্রার্থীরা শেষমেশ থেকে যায় বলে মনে করছেন তারা।

চলমান স্থানীয় সরকার নির্বাচনের অংশ হিসেবে এ পর্যন্ত তিন ধাপে অনুষ্ঠিত পৌরসভার ভোটে আওয়ামী লীগের ২১ জন বিদ্রোহী মেয়র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। এর মধ্যে প্রথম ধাপে গত ২৮ ডিসেম্বর ২৪টি পৌরসভার নির্বাচনে সাতটিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। তার মধ্যে জয় পান দুজন বিদ্রোহী। পরে গত ১৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ধাপের পৌর নির্বাচনে ৬১টি পৌরসভার ২১টিতেই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা নিজ দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে লড়েন। যার মধ্যে পাঁচজন জয়লাভও করেন। আর সর্বশেষ তৃতীয় ধাপে গত শনিবার অনুষ্ঠিত ৬২ পৌরসভার নির্বাচনে ১৪টি পৌরসভায়ই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা জিতেছেন। এছাড়া তিন ধাপের পৌর নির্বাচনেই কাউন্সিলর পদেও আওয়ামী লীগের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদ্রোহী প্রার্থী জয় ছিনিয়ে নেন। এর বাইরে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনেও ৫৫টি ওয়ার্ডে (সাধারণ ও সংরক্ষিত) আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে জয়ী হন দলটির আট বিদ্রোহী প্রার্থী। পৌর নির্বাচনের আসন্ন ধাপগুলোতে এ ধরনের বিজয়ী বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পরাজয় এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর বিজয়কে আমরা এখনো সহনীয়ভাবেই নিয়েছি। তবে দলীয় শৃঙ্খলা ভেঙে যাচ্ছে বলে বিষয়টি নিয়ে আমরা কিছুটা উদ্বিগ্ন। গত শনিবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডে বিদ্রোহী প্রার্থীর ব্যাপারে আমরা আলোচনা করেছি।’

মনোনয়ন বোর্ডের ওই সভায় বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারার পেছনে মূলত তিনটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এ সদস্য জানান, পৌরসভা নির্বাচনগুলোতে বিদ্রোহী প্রার্থীর ব্যাপারে কঠোর অবস্থান থাকলেও তিনটি কারণকে আমলে নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নিজেই কারণগুলো চিহ্নিত করেছেন। পাশাপাশি বিদ্রোহীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা ও মদদদাতাদের ব্যাপারেও এবার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা।

নির্বাচন মানেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী জিতবে এমন একটি ধারণা এখন সর্বত্র। তাই নির্বাচনী মাঠ গোছানোর আগে আওয়ামী লীগের পদপ্রত্যাশী নেতারা মনোনয়ন নিশ্চিত করতে দেনদরবার করেন বেশি। এমন পরিস্থিতিতে গাইবান্ধা জেলার চারটি পৌরসভার তিনটিতেই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতা মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। বাকি একটি সুন্দরগঞ্জ পৌরসভায় জাতীয় পার্টির নেতা মেয়র নির্বাচিত হন। নোয়াখালীর চৌমুহনী পৌরসভায়ও বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড কি তাহলে অজনপ্রিয় প্রার্থীকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়? এ প্রসঙ্গে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খায়রুল আনম সেলিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পৌরসভা নির্বাচনে কেন্দ্র থেকে পাস করে আসা নৌকার প্রার্থী হয়তো তৃণমূল নেতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই বিদ্রোহী প্রার্থীর দিকে ঝোঁকে ভোটাররা। আমি মনে করি সারা দেশে যেসব পৌরসভায় বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন, তাদের বেশিরভাগই জনপ্রিয় বলেই হয়েছেন।’

তৃণমূলের নেতাদের এমন মতের বিষয়ে জানতে চাইলে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান বলেন, ‘আমরা মনে করি না মনোনয়ন বোর্ডের সিদ্ধান্ত ভুল। বোর্ড মনোনীত ৮০ ভাগ প্রার্থীই বিজয়ী হয়ে আসছেন। তবে আমরা যেসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রার্থী চূড়ান্ত করি সেসব তথ্য কিছু ক্ষেত্রে আমাদের কাছে ভুলভাবে আসতে পারে। ফলে কম জনপ্রিয় নেতা মনোনয়ন পেয়ে যান। আর নেতাকর্মীদের কাছে জনপ্রিয় বিদ্রোহী প্রার্থীই গ্রহণযোগ্য হয় এবং ওই প্রার্থী জিতেও যান।’

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ড সুনির্দিষ্ট কিছু তথ্যের ভিত্তিতে নির্বাচনে একজনকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়। এটা সত্য যে, ওই তথ্যে অনেক সময় গরমিল থাকে। তথ্য বিভ্রাটের কারণে কিছু কম জনপ্রিয় নেতা মনোনয়ন পেয়ে যান। কেন অমুক লোক পেল তা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। দেখা যায় অধিকতর যোগ্য একজন নির্বাচন করার প্রত্যাশায় দীর্ঘদিন বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিতে থাকেন। ফলে ক্ষুব্ধ মনোনয়নবঞ্চিত ওই নেতা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে যান। তবে স্থানীয় কিছু ইন্ধনও কাজ করে এ ক্ষেত্রে।’

গাইবান্ধা জেলার চারটি পৌরসভার তিনটিতে বিদ্রোহী প্রার্থী ও একটিতে জাতীয় পার্টি প্রার্থীর বিজয়কে ওই জেলার সাংগঠনিক দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা। সেখানকার একটি পৌরসভায়ও নৌকার মনোনীত প্রার্থী না জেতার বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গাইবান্ধার চারটি পৌরসভায়ই দলীয় মেয়র প্রার্থী হেরে যাওয়ার ঘটনায় সাংগঠনিক দুর্বল চিত্র ফুটে উঠে। আমাদের কাছে তথ্য এসেছে স্থানীয় এমপির বিরুদ্ধাচারণ এর পেছনের কারণ। তাই গত শনিবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের সভায় বিদ্রোহীদের মদদদাতাদের ব্যাপারেও ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। শিগগিরই অভিযুক্ত সাংসদ ও স্থানীয় দায়িত্বশীল নেতাদের কাছে এর জবাব চাওয়া হবে।’