সঞ্চয়পত্রে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াল ৬ মাসেই

সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই (জুলাই-ডিসেম্বর) গোটা অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার বেশি ঋণ করেছে সরকার। ফলে অর্থবছরের বাকি সময়ে এ খাতের ঋণ বেড়ে গিয়ে সরকারের সুদব্যয় বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্য থেকে জানা যায়, গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে সঞ্চয়পত্রসহ সব ধরনের জাতীয় সঞ্চয় স্কিম থেকে সরকারের নিট ঋণ এসেছে ২০ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। যা ২০২০-২১ অর্থবছরের পুরো সময়ের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেশি।

ঘাটতি বাজেট অর্থায়নের লক্ষ্যে চলতি অর্থবছরের পুরো সময় জুড়ে সঞ্চয়পত্র থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার।

তবে ব্যাংকে আমানতের সুদ কমে আসায় নানা শর্ত আরোপের মধ্যেও সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বাড়ছে বলে মনে করছেন সঞ্চয় অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয় ৫৪ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা। এই সময়ে সরকার পুরনো সঞ্চয়পত্রের মূল ও মুনাফা বাবদ পরিশোধ করেছে ৩৪ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা। ফলে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে এ খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়ায় ২০ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।

বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকঋণ ছাড়াও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ করে থাকে সরকার। তবে সামাজিক সুরক্ষার কথা বিবেচনায় নিয়ে সঞ্চয়পত্রে তুলনামূলক বেশি মুনাফা দেওয়া হয়। প্রতি মাসের বিক্রি থেকে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর নিট ঋণ হিসাব করা হয়। এই অর্থ সরকার রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়।

২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ৩৪ হাজার ২২১ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। এ থেকে সরকারের নিট ঋণ হয় ৫ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা। ওই অর্থবছরের পুরো সময়ে নিট ঋণ হয়েছিল ১৪ হাজার ৪২৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, গেল ডিসেম্বরে ৮ হাজার ২৩৩ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। ওই মাসে সঞ্চয়পত্রের মূল ও মুনাফা পরিশোধের পর সরকারের নিট ঋণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা।

সঞ্চয়পত্র বিক্রির লাগাম টানতে ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে এ খাতের বিনিয়োগে একের পর এক কড়াকড়ি আরোপ করতে থাকে সরকার। ৫০ হাজার টাকার বেশি বিনিয়োগে ব্যাংক লেনদেন ও কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হয়।

এ ছাড়া ৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে ১০ শতাংশ উৎসে কর, মোট বিনিয়োগের সময়সীমা একক নামে ৫০ লাখ টাকা এবং যৌথ নামে ১ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ সীমা কমিয়ে একক নামে ১০ লাখ এবং যৌথ নামে ২০ লাখ টাকা করা হয়। তবে পেনশনার সঞ্চয়পত্রে উৎসে কর বা অন্যান্য বিনিয়োগসীমা প্রযোজ্য হবে না।

সম্প্রতি বিদেশি মুদ্রায় বিনিয়োগের জন্য তিন ধরনের বন্ডের মোট বিনিয়োগসীমা কমিয়ে এক কোটি টাকা করে সরকার।

ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ কমাতে গত বছরের এপ্রিল থেকে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে বাড়তি মুনাফার আশায় অনেকেই সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকছে। কেননা, বর্তমানে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ থেকে ১০ শতাশের বেশি মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এত অল্প সুদে ব্যাংকে আমানত রেখে পোষায় না বলেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ছে। তাছাড়া আমাদের পুঁজিবাজারের উন্নয়ন সেভাবে হয়নি। অন্যান্য দেশে অর্থনীতি বাড়তে থাকলে পুঁজিবাজার অর্থায়নের বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়। আমাদের দেশে এর উল্টো। এখানে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে চায় সবাই। পরে খেলাপি হয়। বিশ্বের কোনো দেশেই এমন ব্যাংকনির্ভর শিল্প খাত গড়ে উঠতে দেখা যায় না।’

পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, জুলাই-ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে পরিবার সঞ্চয়পত্র, ২০ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা। তিন মাস অন্তর মুনাফাভিক্তিক সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ১৫ হাজার ৫৯ কোটি টাকা। এ ছাড়া পেনশনার সঞ্চয়পত্র ও পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা।

বাজেট ঘাটতি মেটাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ছিল সরকারের। বিক্রি কমায় বছরের মাঝামাঝিতে এসে সেই লক্ষ্য কমিয়ে ১১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।

তবে জুন মাসে বিক্রি অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ ওই অর্থবছর শেষে ১৪ হাজার ৪২৮ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে ৫২ হাজার ৪১৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ঋণ এসেছিল সরকারের, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।