ভরসার নাম মুশফিকুর রহিম

প্রতি ক্রিকেট দলেই এমন একজন ব্যাটসম্যান থাকেন, যার ওপর চোখ বুজে ভরসা করা যায়। কোনো অঘটন না ঘটলে তিনিই অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখান দলকে। বিপদে হয়ে ওঠেন দলের কা-ারি। অধিনায়কের ব্যাটন হাতে থাকুক বা না থাকুক দলের ওপর আসা সব ঝড় বুক চিতিয়ে সামলানোর দায়িত্ব থাকে তার ওপর। আর এ দায়িত্ব হাসিমুখেই মেনে নেন সেই ক্রিকেটার। ভারতে যেমন বিরাট কোহলি, অস্ট্রেলিয়ার স্টিভেন স্মিথ, পাকিস্তানের বাবর আজম, ইংল্যান্ডের জো রুট; তেমনি বাংলাদেশের মুশফিকুর রহিম।

২০০৫-এর মে’তে লর্ডসে টেস্ট অভিষেক মুশফিকের। ক্রিকেটের মক্কায় খেলাটির কুলীন ফরম্যাটের শুরু পাওয়া ভাগ্যবানদের একজন তিনি। নামি ক্রিকেটারদের মধ্যে রাহুল দ্রাবিড়, সৌরভ গাঙ্গুলি, জেমস অ্যান্ডারসন, কেভিন পিটারসেন ও স্টিভেন স্মিথদেরও লর্ডস দিয়েই টেস্ট ক্যারিয়ার শুরু। বাংলাদেশ ক্রিকেটের আস্থা, নির্ভরতার প্রতীক মুশফিক এখন তাদের কাতারে। শুধু অভিষেক ম্যাচেই মিল নয়, ওই তারকাদের মতো নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন দেশের এই ব্যাটিংস্তম্ভ। তাই মুশফিকের অপর নাম মিস্টার ডিপেনডেবলও।

বাংলাদেশ ক্রিকেটারদের মধ্যে সবচেয়ে পরিশ্রমী ক্রিকেটার মুশফিক। ধৈর্য, একাগ্রতা, অধ্যবসায় তার মূল শক্তি। ২০০৫-এ অভিষেকের পর শুরুতেই সাফল্য ছিল না তার। ব্যাটিং স্কিলে নিখুঁত হলেও রান আসছিল না। প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির জন্য ৫ বছর অপেক্ষা করতে হয় মুশিকে। তার আগে ৩২ ইনিংসে ৭২৩ রান করেছেন ২২.৫৯ গড়ে। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে ভারতের বিপক্ষে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ স্টেডিয়ামে প্রথম সেঞ্চুরি করেন মুশি। ওই সেঞ্চুরি যেন তাকে পরিণত করে দেয়।

টেস্টে বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বল খেলার ও বেশি সময় উইকেটে থাকার কৃতিত্ব কিন্তু মুশফিকেরই। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২০১৮ সালে নিজের টেস্ট সর্বোচ্চ ২১৯ (অপরাজিত) রানের ইনিংসে খেলেছেন ৪২১ বল। একাগ্রতা, অধ্যবসায় ও ধৈর্য দিয়েই নিজেকে তুলে নিয়েছেন সাধারণ ব্যাটসম্যানের কাতার থেকে অসাধারণে। তাই ভারতের বিপক্ষে অভিষেক সেঞ্চুরির পরের ৯৮ ইনিংসে ৩৬৯০ রান করেছেন ৩৭.৬৫ গড়ে। এই সময়ে করা ছয় সেঞ্চুরির (অভিষেকটি বাদে) তিনটিই ডাবল।

সব মিলিয়ে ৭০ টেস্টের ১৩০ ইনিংসে রান তার ৪৪১৩। বাংলাদেশিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি টেস্ট রান তারই। ৭ সেঞ্চুরি ও ২১ হাফসেঞ্চুরি তার নামের পাশে। সবচেয়ে বেশি ১০ বার নটআউট থেকেছেন মুশফিক। খালেদ মাসুদও একই সংখ্যকবার নটআউট ছিলেন। মুশফিকের তিন ডাবল সেঞ্চুরির দুটিই এসেছে তার প্রিয় ৫ নম্বর পজিশনে ব্যাটিংয়ে নেমে। শুধু শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিটি করেছিলেন ৬ নম্বরে নেমে।

মুশফিক ব্যাটসম্যান হিসেবে কতটা পরিণত হয়ে উঠেছেন তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ গত বছরের ভারত সফর। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন সিরিজও বলা যায় ওই সফরকে। ওই সিরিজে প্রতি ইনিংসেই রান পেয়েছেন তিনি। ভারতের ভয়ংকর পেসারদের সামলে চার ইনিংসের মধ্যে তিনবারই দলের সর্বোচ্চ স্কোরার মুশি ৪৩, ৬৪, ০ ও ৭৪। এর আগে ২০১৭ সালে ভারতের মাটিতে একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে সেঞ্চুরি করেন।

দেশের বাইরে বরাবরই মুশফিককে দলের হাল ধরতে হয়। তাই বিদেশে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান স্কোরারও তিনি। ২৯ ম্যাচের ৫৭ ইনিংসে ১৯৫৫ করেছেন। ৪ সেঞ্চুরি ও ৮ হাফসেঞ্চুরিতে সর্বোচ্চ ২০০। দেশে ও বিদেশে ডাবল সেঞ্চুরি করা একমাত্র বাংলাদেশি মুশফিক দেশের মাটিতে ৪১ টেস্টের ৭৩ ইনিংসে ২৪৫৮ রান করেন। এর মধ্যে ৩ সেঞ্চুরি ও ১৩ হাফসেঞ্চুরি আছে।

ক্যারিয়ারে ৩৪ ম্যাচ টেস্টে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেন মুশি। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে নেতৃত্বের চাপ তাকে কাবু করতে পারেনি। ব্যাটসম্যান হিসেবে মুশফিক যেমন ছিলেন, নেতৃত্বেও তেমনি সাবলীল। বরং নেতা হিসেবে রান বেশি তার। অধিনায়ক হিসেবে ৩৪ ম্যাচে ৬১ ইনিংসে ২৩২১ রান করেছেন ৪ সেঞ্চুরি, ১২ হাফসেঞ্চুরিতে। বিপরীতে ব্যাটসম্যান হিসেবে ৩৬ টেস্টে ৬৪ ইনিংসে ২০৯২ করেছেন ৩ সেঞ্চুরি, ৯ হাফসেঞ্চুরিতে।

বাংলাদেশের সর্বশেষ টেস্টে গত বছর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২০৩ রানের হার মানা ইনিংসে ম্যাচসেরা হয়েছিলেন মুশফিক। আজ থেকে শুরু চট্টগ্রাম টেস্টে সেখান থেকেই শুরু করবেন তিনি।